Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হায়, বিরোধীদের হাতে একজন মমতা নেই!

রথ চলে গেল। পুজোর সঙ্গেই ভোটের খুঁটিপুজোর আয়োজনও শুরু হওয়ার অপেক্ষা। না, ভুল হল—ঠিক ২২ দিন বাদেই, ২১ জুলাই তৃণমূলের ভোটযুদ্ধের ঢাকে কাঠি পড়ে যাবে একেবারে চেনা ছন্দে।

হায়, বিরোধীদের হাতে একজন মমতা নেই!
  • ২৯ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: রথ চলে গেল। পুজোর সঙ্গেই ভোটের খুঁটিপুজোর আয়োজনও শুরু হওয়ার অপেক্ষা। না, ভুল হল—ঠিক ২২ দিন বাদেই, ২১ জুলাই তৃণমূলের ভোটযুদ্ধের ঢাকে কাঠি পড়ে যাবে একেবারে চেনা ছন্দে। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণে কয়েক লক্ষ নেতা কর্মীর উপস্থিতিতে তৈরি হবে পাঁচবছর অন্তর রাজনৈতিক যুদ্ধের পটভূমি। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর নির্বাচন জিতে আসা যেকোনও শাসক দলের কাছেই চ্যালেঞ্জ বইকি। কিন্তু বাস্তবে এবারও সত্যি কি তেমন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সুযোগ আছে? নাকি একুশের চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি হবে রাম-বাম দুই শিবিরের। কথায় বলে, যত গর্জায় তত বর্ষায় না। বিরোধীরাও কেউ দুঃস্বপ্নেও পালাবদলের কথা ভাবছেন না। তাঁরাও দিনভর কুৎসা অপপ্রচারের বন্যা বইয়ে, চ্যানেলে চ্যানেলে সান্ধ্য মজলিশে শাসককে বিঁধে বাড়ি ফেরার পথে স্বীকার করছেন জননেত্রীর চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী পদের শপথগ্রহণ নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকতে গলা সপ্তমে তুলেও পাটিগণিতকে ভুল প্রমাণ করা বড় সহজ কাজ নয়! 

Advertisement

৩৪ বছরের একতরফা অত্যাচারের নামাবলি সিপিএমকে রিংয়ের বাইরে থেকে মূলমঞ্চে আসতে দিচ্ছে না কিছুতেই। সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম আছে, কথা বলার ঢংও আয়ত্তে, কিন্তু দিনের শেষে ইভিএমে জনসমর্থন সাড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশে বাঁধা। কোন অপকর্মের অভিশাপে বিমান বসুদের মানুষ প্রত্যাখ্যান করছে? সেই হতাশা ছেয়ে ফেলছে দলটাকে। ইস্যু আছে, মিছিলে লোক আছে, কিন্তু সব আসনে প্রার্থী দিলেও কতগুলিতে জামানত বাঁচবে তা নিয়েই চর্চায় ব্যস্ত আলিমুদ্দিন। মিছিল মিটিংয়ে ভিড় হলেও সাধারণ ভোটারের মধ্যে কোনও প্রভাব নেই। কংগ্রেসও একই পথের পথিক। তৃতীয় না চতুর্থ? ৩৪ বছরের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করা ক্ষমতা পাগল বাম রাজনৈতিক শক্তির আজ এমনই দুরবস্থা!
আর বিজেপি? অমিত শাহ নিজে বলেছেন, এবার কোনও টার্গেট বেঁধে দেবেন না। গতবারের বেইজ্জতির কথা মনে রেখে দু’শো আসনের কথা আর মুখেও আনছেন না তিনি। আপাতত গতবারের সাতাত্তর আসনের টার্গেটকেও দামি বাইনোকুলার দিয়ে দেখতে হচ্ছে। সেই হার্ডলটা পেরবে তো? আরএসএসের শিক্ষায় শিক্ষিত একটা শক্তিশালী মুখ ছাড়া মমতার মতো জননেত্রীর সঙ্গে লড়া যায়! যদি উত্তরবঙ্গের খাসতালুক কোচবিহার, জলপাইগুড়িতে এবার গেরুয়া ধাক্কা খায়। চা শ্রমিক, আদিবাসী, রাজবংশী এবং মতুয়ারা ঠকতে ঠকতে বেঁকে বসে সেক্ষেত্রে ৫০ আসন অতিক্রম করাও কঠিন হবে বিজেপি’র। ২০১১ থেকে ২০২৬, দেড় দশক রাজনীতির ময়দানে বড় কম সময় নয়। সবমিলিয়ে চারচারটে বিধানসভা ভোট। ইস্যু অনেক, বিতর্কও বহুমুখী। সিন্ডিকেটরাজ, খুন, ধর্ষণ, তোলাবাজি মিলেমিশে একটা নেতিবাচক প্রচারের বাড়বাড়ন্ত। কিন্তু এটাও ঠিক, রাজ্যের বিরোধী শক্তিকে বিশেষ করে ফাউ দলবদলুদের গড়পড়তা রাজ্যবাসী মমতার বিকল্প হিসেবে মেনে নিতে এখনও তৈরি নন। প্রত্যাখ্যানের এই অদ্ভুত টানাপোড়েনেই ধাক্কা খাচ্ছে বিরোধীরা। 
বঙ্গে বিজেপির এই ছন্নছাড়া চেহারাই ক্রমাগত গুস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। এ রাজ্যে গেরুয়া শিবিরের সবচেয়ে সফল সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে শেষপর্যন্ত দলের বনাবনি হবে কি না তা ভগবানেরও অজানা। একুশের ভোটে যিনি জেলায় জেলায় ঘুরে ঘুরে যোগদান মেলা পরিচালনা করেছেন তাঁরই এমন বিয়োগান্ত পরিণতি! শেষে তিনি নতুন দল করবেন, বাধ্য হয়ে দল ছাড়বেন না অবহেলায় বসে যাবেন তা নিয়ে জল্পনার অন্ত নেই। নতুন বঙ্গ সভাপতি না মেলায় বালুরঘাটের নেতাকেই এখনও দক্ষিণবঙ্গও চষতে হচ্ছে, এটাই গেরুয়া শিবিরের নির্মম দেওয়াল লিখন। মন্দের ভালো আর কী! কারণ চড়া দাম দিয়ে আনা দলবদলুকে সবাই মেনে নিতে নারাজ। এতে দলের কোন্দলই শুধু বাড়ছে। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে ঠোকাঠুকিতে পুরনোরা আরও দূরে সরে যাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী দলে সঙ্ঘের ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া যেখানে কল্কে পাওয়া যায় না সেখানে বহু ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া কোনও দলবদলুকে মুখ করে রাজ্যে বিজেপি আবার চব্বিশের লোকসভার মতো একপেশে হারা খেলায় লড়বে? আপাতত এটাই কোটি টাকার প্রশ্ন। কিন্তু বিকল্পও যে অত্যন্ত সীমিত। মোদি ম্যাজিক কিন্তু ফিকে হতে শুরু করেছে। এই শেষ বেলায় ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি কোনও সুঠাম সুপুরুষ, চোস্ত বাংলা, ইংরাজি, হিন্দি বলা নিবেদিতপ্রাণ আরএসএস মুখ সামনে আসে কি না, তা দেখার জন্য পড়ে আছে সামনের ছয়-সাতমাস। গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে যাবে। ভারতীয় দলে যেমন বুমরা ছাড়া বোলার নেই, বঙ্গ বিজেপিতেও মাঠে ময়দানে ঝড় তোলার মতো আগমার্কা সঙ্ঘ ছাপ মারা বঙ্গীয় নেতা নেই। ভিন রাজ্য থেকে যতই ‘প্রভারীরা’ আসুন তাঁদের পর্দার আড়ালে সংগঠনের কাজ দেওয়া হচ্ছে। এতে আন্দোলন জমতে পারে? ‘লোকাল’ নেতৃত্বের উজ্জীবিত ভূমিকা কোথায়? স্থানীয় নেতৃত্বের অভাবে অমিত শাহদের প্ল্যান এবারও ফ্লপ শোয়ের দিকেই এগচ্ছে। তৃণমূলের খেয়ে পরে বড় হওয়া যে নেতাকে নিত্য হাঁকডাক করতে দেখা যাচ্ছে তিনি আবার সঙ্ঘের কাছে ষোলোআনা ব্রাত্য। গতবছরের ঢাকঢোল পিটিয়ে সদস্য সংগ্রহ অভিযানেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে রাজ্য শাখা কতটা দিশাহীন। অতীত দিনের বাঙালি সুপারস্টার মর্জি হলে সামনে আসেন। কাঁধ নাচিয়ে পুরনো সিনেমার ডায়লগ উপহার দেন, তারপর আবার কখন হারিয়ে যান। তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বাড়ে। অগত্যা ফাঁক ভরাতে বারে বারে আসতে বাধ্য হন মোদি, অমিত শাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। ঘণ্টাখানেকের ভোকাল টনিক। আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখানো। ব্যাস ধুলো উড়িয়ে দিল্লি ফিরে যাওয়া। কোচ অনেক, টাকার জোরে কৌশল তৈরির ওয়াররুমেরও শেষ নেই, কিন্তু মাঠে নেমে গোল করার স্ট্রাইকার কই! সম্প্রতি যেসব রাজ্যে বিজেপি নিরঙ্কুশভাবে জিতেছে সেখানেও মুখ্যমন্ত্রী খুঁজে পেতে কয়েক সপ্তাহ গড়িয়েছে। আর বাংলায়? এত নেচেকুঁদেও দুর্বল সংগঠনের মাথা ঘিরেই যদি রেষারেষি আর কোন্দল মূল চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আর যাই হোক হিন্দু –মুসলিম বিভাজনের তাস খেলে বাংলায় যুদ্ধজয় সম্ভব নয়। ‘দুনিয়ার হিন্দু এক হও’—এই অন্তঃসারশূন্য স্লোগান ছাড়া কিছুই দেওয়ার নেই বঙ্গ বিজেপির! শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, চৈতন্যদেবের বাংলায় এই একপেশে চাপিয়ে দেওয়া বক্তব্যের আদৌ কোনও তাৎপর্য থাকতে পারে?
একটার পর একটা ইস্যু। কোন রাজ্যে খুন ধর্ষণ নেই বলুন তো! বাংলাকে অচল করার চেষ্টা। কিন্তু ভোটের ফল বেরলেই সব ফক্কা! আসন্ন বিধানসভা ভোটের ন’মাস আগে বাংলার নির্বাচনী রাজনীতির চিত্র সর্বতোভাবেই একমুখী। একুশের ফল যাই হোক একটা নাড়া অন্তত ছিল। ময়দানে লিগ শুরুর আগের মতো দলবদল ছিল। এবার তাও নেই। কেন? রাজনীতির কারবারিরা জেনে গিয়েছে, যাই ঘটে যাক না কেন, কালীঘাটের মহিলাই দাপিয়ে ফিরছেন ক্ষমতায়। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের ফলটা সবার যেন জানা হয়ে গিয়েছে ন’মাস আগেই। কালীঘাটের দোচালার অধিবাসী হাওয়াই চটি পরা সাড়ে চার দশকের নেত্রীর চতুর্থবার শপথ নেওয়ার আয়োজন সব অর্থেই পাকা। এনিয়ে বিরোধীদেরও বিন্দুমাত্র সংশয় আছে বলে মনে হয় না। 
ইদানীং অ্যান্টিবায়োটিক যেমন কাজ করে না রোগীর শরীরে, তেমনি অ্যান্টি ইনকামবেন্সিরও যেন কোনও স্থান নেই বঙ্গে। অস্বীকার করার উপায় নেই, সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি নিঃসন্দেহে একটা বড় ইস্যু। চাকরি হারিয়ে যাঁরা রাস্তায় তাঁদের সমবেদনা জানানোর ভাষা নেই। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও ঠিক ভুক্তভোগীরা সেভাবে কোনও বিরোধী পতাকার তলায় থেকে প্রতিবাদ জানাতে চাইছে না। বিরোধী নেতানেত্রীরা ঘোলাজলে মাছ ধরতে গেলেই গো ব্যাক, শেম শেম ধ্বনি উঠছে। বিরোধীদের এই সার্বিক প্রত্যাখ্যানই বলে দিচ্ছে, রাজ্যে কী বিজেপি, কী বাম-কংগ্রেস—কারও পায়ের তলার মাটি নেই। শিক্ষায় অরাজকতা, আর জি কর আন্দোলন থেকে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ দেওয়া নিয়ে টালবাহানা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। কারণ বিরোধীদের উপর চরম অনাস্থা। এর নিট ফল—একুশের ভরাডুবির পর চব্বিশের লোকসভা নির্বাচন এবং গত একবছরে পরপর ১১টি বিধানসভার উপনির্বাচনে ব্যবধান বাড়িয়ে শাসক দলের নিরঙ্কুশ জয় ও আধিপত্য বিস্তার। সর্বশেষ কালীগঞ্জের ফল আরও চমকে দিয়েছে এই কারণে যে, নদীয়ার মতো সীমান্ত জেলাতেও জয়ের ব্যবধান বাড়াতে সমর্থ হয়েছে তৃণমূল। এতকিছুর পরেও। জোড়াফুলের প্রার্থী ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ৫০ হাজার ৪৯ ভোটে জয়ী হয়েছেন। সীমান্ত জেলা নদীয়ায় তৃণমূলের এই ভোটবৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের কার্ড আর কাজ করছে না। ভোটার লিস্টে বিহারের মতো ব্যাপক ওলটপালট ছাড়া বাংলা দখল যে দুঃস্বপ্নই রয়ে যাবে তা প্রতিটি বিরোধী নেতানেত্রী বিলক্ষণ জানে।
সেই হতাশা থেকেই বিরোধীরা কেউ কেউ লিখছেন আজ যদি মমতা উল্টোদিকে থাকতেন কী করতেন? ঘুরিয়ে তাঁরা স্বীকার করে নিচ্ছেন, দেড় দশক মুখ্যমন্ত্রী থেকেও মমতা বিরোধী নেত্রীর ভূমিকাতেও এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ধারেকাছে কেউ নেই। এর দায় কার? এটাই তো তাঁর অকৃত্রিম ইউএসপি। আঁচরে কামড়ে তাঁর সমকক্ষ হওয়া বিরোধীদের অসাধ্য!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ