উজ্জ্বল পাল, পাত্রসায়র: চারশো বছর আগের কথা। তখন কলেরার মহামারিতে মানুষের মড়ক লাগত গ্রামের পর গ্রাম। সেই মহামারি থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে খচ্চরবাহিনীর পুজো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা। পটে আঁকা ছবিতে হবে পুজো। কিন্তু সেই ছবি আঁকবেন কে? রাজা নির্দেশ পাঠালেন পাত্রসায়রের বীরসিংহ গ্রামের কর্মকার পরিবারে। রাজ-আদেশ বলে কথা। অমান্য করার সাধ্যি নেই। পট আঁকতে এলেন পরিবারের এক সদস্য। ফুটিয়ে তুললেন খচ্চরবাহিনী। সেই পটে পুজো শুরু করলেন মল্লরাজারা। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ছবি আঁকার পরই মারা গেলেন ওই পটুয়া। তার পর থেকে কর্মকার পরিবারের আর কেউই খচ্চরবাহিনীর পট আঁকার দুঃসাহস দেখাননি। দ্বারকেশ্বর দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। রাজ-আদেশকে উপেক্ষাই করে গিয়েছেন। নষ্ট হয়ে গিয়েছে সেই প্রাচীন পটচিত্র।শেষে ২০১১ সালে মৃত্যুভয় জয় করে ফের খচ্চরবাহিনীর পটচিত্র আঁকতে এগিয়ে ওই পরিবারেরই এক বধূ কৃপাময়ী কর্মকার। টানা ১৪ বছর সেই পটচিত্রে পুজো হয়ে আসছে জামকুড়ির রাজবাড়িতে। নবমীর দিন গভীর রাতে পুজো হয় খচ্চরবাহিনীর।
কৃপাময়ীদেবী বলেন, ‘আমাদের পরিবার বংশানুক্রমে জামকুড়ির পুজোয় পট আঁকছেন। আমি এই পরিবারে আসার পর থেকে পট আঁকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। পুজোয় বড়োঠাকুরানি, মেজ ঠাকুরানি এবং ছোট ঠাকুরানির পট আঁকা হয়। কিন্তু রাজাদের নির্দেশ সত্ত্বেও মৃত্যুভয়ে খচ্চরবাহিনীর পট আমাদের পরিবারের কয়েকপুরুষ ধরে কেউ আঁকতে সাহস পাননি। তবে, মৃত্যুভয় জেনেও রাজপরিবারের নির্দেশ মেনে ২০১১সালে আমি খচ্চরবাহিনীর পট এঁকে দিয়েছি। সেই পটেই এখন পুজো হচ্ছে। আমি গর্বিত।’
একই সঙ্গে কৃপাময়ীদেবী এও বলেন, ‘আমার পরিবারের কেউ যদি সাহস দেখিয়ে খচ্চরবাহিনীর পট আঁকতেন। তাতে যদি তাঁর মৃত্যু হতো। সেটা আমি সহ্য করতে পারতাম না। সেজন্য আমি নিজেই এগিয়ে এসেছিলাম। তবে দেবীর অপার কৃপা। আমার আঁকা পটে তিনি পুজিতা হচ্ছেন। সেজন্যই বোধহয় আমাকে করুণা করেছেন।’
জামকুড়ির রাজপরিবারের এক সদস্য অনুপ সিংহদেব বলেন, ‘বহু বছর আগে খচ্চরবাহিনীর যে পট আঁকা হয়েছিল তাঁর ভয়ংকর রূপ ছিল। ভাঁজ করে রাখার কারনে তা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কর্মকার পরিবারের পূর্বপুরুষরা প্রতিবছর তিন ঠাকুরানির পট আঁকলেও খচ্চরবাহিনীর পট কেউ আঁকতে চাননি। তবে ওই পরিবারেরই বধূ কৃপাময়ীদেবী তা এঁকেছেন। নবমীর গভীর রাতে তাঁর পুজো হয়।’
পাত্রসায়র ব্লকের জঙ্গলঘেরা বীরসিংহ গ্রামে হাটতলার কাছেই কৃপাময়ীদেবীর বাড়ি। তিনি ছাড়াও বাড়িতে তাঁর স্বামী গোপাল কর্মকার, ছেলে অরূপ কর্মকার ও পুত্রবধূ বৃষ্টি কর্মকার রয়েছেন। তিনি বর্তমানে জামকুড়ির পুজোর পট ছাড়াও নিজের গ্রাম বীরসিংহ গ্রামে একটি পুজোয় পট আঁকেন। এছাড়াও গত বছর ওন্দার মাজডিহাতেও পট এঁকেছেন। এবারে তিনি কলকাতায় টালিগঞ্জের একটি পুজোর জন্য পট এঁকেছেন। সোমবার তিনি ওই পট নিয়ে বাসে করে কলকাতায় রওনা দেন।