পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ২০২৬-এর ভিত্তি ধরা হয়েছে ২০০২ সালের সংশোধিত ভোটার তালিকা। ভোটার তালিকার সংশোধন, পরিমার্জনা কোনও স্থায়ী প্রকল্প নয়, ভীষণভাবে ধারাবাহিক। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) তরফে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি দেশজুড়ে প্রতিবছরই হয়ে থাকে। কারণ সুবিশাল ভারতে লোকসভা, বিধানসভা, পুরসভা এবং পঞ্চায়েত মিলিয়ে নির্বাচন লেগেই থাকে। প্রতিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার অব্যবহিত পূর্বের সংশোধিত ভোটার তালিকা মেনে। পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন আগামী মাসকয়েকের ভিতরে। এজন্য অবশ্যই নতুন সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা জরুরি, আর এটাই নিয়ম। তাই এবারও যে ভোটার তালিকার সংশোধন, পরিমার্জনা হবে, এটা সবারই জানা ছিল।
কিন্তু এই কাজটি নিয়ে স্মরণকালের মধ্যে কোনওবার এত হইচই হয়নি। এবার সংশোধনীর কথাটির পূর্বে একটি ‘বিশেষ’ শব্দ সংযোজন করে হইচইয়ের মাত্রা বহুবর্ধিত করা হয়েছে। ইসিআই যেমন তেমন, বস্তুত শোর মাচিয়ে ছেড়েছে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি। মোদি-শাহদের পার্টির ভাবখানা এই, কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন করতে নামেনি, তারা ‘চোর’ ধরতে হাতা গোটাচ্ছে! প্রথমে প্রায় সকলকেই সন্দেহের তালিকায় বা অবৈধ/অপরাধী ভেবে নিয়ে আসরে নেমেছে ইসিআই। অথচ কমিশনের তরফে মুখে বলা হল, ভোটার তালিকা সংশোধন করার মূল লক্ষ্য, নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফেরানো। এজন্য গোড়ার গলদ দূর করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনও বুথের তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট এবং বিদেশিদের নাম থাকবে না। অর্থাৎ এই স্বচ্ছতার নীতিতে বাংলাসহ দেশজুড়ে একেবারে নিখাদ তালিকা উপহার দেবে কমিশন। এটা কাম্য, এবং প্রতিটি সুনাগরিকেরও চাহিদা অভিন্ন। আর এই মহৎ ‘অভিযানে’ নামার আগে জানিয়ে দেওয়া হল, ২০০২ তালিকায় যাঁর নিজের নাম আছে তাঁকে নিয়ে কোনও আপত্তি করা হবে না। তবে বৈধ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও কোনও কারণে যাঁর নাম ওই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তাঁর বাবা-মা কিংবা কোনও গ্রহণযোগ্য আত্মীয়ের নামের লিঙ্ক’ দিতে হবে। তাহলে কোনও আপত্তি উঠবে না। এছাড়া কম বয়স কিংবা অন্য একাধিক কারণেও এই ধরনের লিঙ্ক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এর বাইরেও যেসব বৈধ নাগরিক বাদ পড়েছেন তাঁদের ক্ষেত্রে দেখাতে হবে কিছু গ্রাহ্য নথি। তার একটি তালিকাও ইসিআই দিয়েছে। বলে রাখা দরকার, এই তালিকা একবারে পাওয়া যায়নি। তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন দল বিস্তর চেঁচামেচি করার পরই কমিশন নথির তালিকা বারবার বদল এবং অবশেষে একটু দীর্ঘ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর মাফিক খসড়া ভোটার তালিকা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। সন্দেহজনক ভোটারদের ‘পাশ/ফেল’ ঠিক করতে দিনকয়েক আগে শুনানিও আরম্ভ হয়েছে। আর এই দফাতেই গোল বেধেছে মারাত্মক। এসআইআর মারফত বিপুল সংখ্যক লোকের নাম বাদ দেওয়া হবে রটিয়ে দিয়ে প্রথমেই তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল গেরুয়া শিবির। এই অনৈতিক প্রচেষ্টায় একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়েছিল। এসআইআর পর্বে পশ্চিমবঙ্গে বেশ কয়েকজন আত্মঘাতী হয়েছেন অথবা শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গিয়েছেন। এই যে এতজন সহনাগরিককে দেশবাসী অকালে হারাল, অভিযোগ উঠেছে, তার জন্য দায়ী এসআইআর আতঙ্ক। এনিয়ে দেশজুড়ে বাদ-প্রতিবাদ, ধিক্কার কম হয়নি, এখনও জারি রয়েছে। তারপরেও বিবেকহীন কারবার থামেনি। দেখা যাচ্ছে, শুনানিতে এমন বহু ব্যক্তিকে তলব করা হয়েছে, যাঁদের কোনও ‘অপরাধ’ নেই; তাঁরা কোনওভাবেই ‘অবৈধ’ ভোটার নন। তাঁদেরই ভোটে রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্রে নির্বাচিত সরকার গদিয়ান। এই হয়রানির শিকার ২০০২ সালের তালিকাভুক্ত ভোটাররাও! তাঁদের নথি কিছু বিএলও যথাযথভাবে আপলোড না করাতেই এই বিপত্তি। ইসিআইয়ের ভাষায় এমন ‘নো-ম্যাপ ভোটার’ সংখ্যা আপাতত শুধু পশ্চিমবঙ্গেই সাড়ে চার লক্ষ! এর দায় ইসিআই ছাড়া আর কারও উপর বর্তায় না। নির্বাচন কমিশনার কি তা স্বীকার করেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাগাতার প্রতিবাদ এবং হুমকির সামনে অবশেষে নতজানু হয়েছে ‘মোদিবাবুর ফার্স্ট বয়’ কমিশন। অবশেষে ঘুরিয়ে নাক ধরার মতো করেই এত বড়ো ‘ভুল’ স্বীকার করেছে তারা। সোমবারই সাড়ে চার লক্ষ শুনানির ‘অবৈধ’ নোটিস তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। স্বভাবতই স্বস্তিতে এখন এই ভোটাররা। কিন্তু তাঁদের যে আতঙ্কের মধ্যে ফেলা হল তার জন্য কোন প্রায়শ্চিত্ত করবে এই সাংবিধানিক সংস্থা? নাগরিকের শান্তি বিঘ্ন করার যেকোনও প্রয়াস মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল নয় কি? আরও অসংখ্য ভোটারকে অকারণ হেনস্তার দায় মেনে যথোচিত প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত কমিশনের এবং এসআইআর ধুয়োর উদ্গাতা বিজেপির।