সংবাদদাতা, নবদ্বীপ: রথ এলেই ওঁদের মুখে ফুটে ওঠে চওড়া হাসি। রথের চাকার সঙ্গে ওঁদের জীবনের চাকাও গড়ায়। ওঁরা সকলেই রথের কারিগর। নবদ্বীপের রানিরচড়ার মিস্ত্রিপাড়া, চাকিপাড়া, বটতলা সহ আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকা মিলিয়ে চৈতন্যভূমে গড়ে উঠেছে আস্ত একটা রথের শিল্পতালুক। এখানে প্রায় ৪০টি পরিবার রথ তৈরি করেন। অনেকে বংশপরম্পরায় রথ বানাচ্ছেন। কেউ আবার ৪০-৫০ বছর ধরে এই কাজ করছেন।
রথের এক-দেড় মাস আগে থেকে ঘরে ঘরে কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে। কাঁঠাল, শাল, সেগুন, আকাশমণি, মেহগনি, কদম, গামারি, প্লাইউড দিয়ে তৈরি হচ্ছে এক ফুট থেকে শুরু করে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতার বিভিন্ন রথ। এখানকার শিল্পীরা বায়না অনুযায়ী অনেক বড় উচ্চতার রথও তৈরি করেন। একতলা রথ বিক্রি হয় ১০০-১৫০ টাকায়। মাঝারি উচ্চতার রথ ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। এরপর বড় রথ বিক্রি হয় ১০০০-১২০০ টাকায়। সুন্দর কারুকার্য করা রথ বিক্রি করে ৪০০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত দাম পান কারিগররা। রথগুলিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে তারমধ্যে পটচিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয় জগন্নাথদেব, ঘরের ছেলে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মূর্তি।
নবদ্বীপের প্রাণকেন্দ্র পোড়ামাতলায় রথের মেলা বসে। সেখানে কারিগররা রথগুলি বিক্রি করেন। বাইরে থেকে অনেকে এসে পাইকারি দরে রথ কিনে নিয়ে যান।
রানিরচড়ার বাসিন্দা লালমোহন দাস বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছি। আগে তাঁতের কাজ করতাম। পরবর্তীকালে তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারা বছরই কাঠের আসবাবপত্র তৈরি করে আসছি। এইসময় আমরা রথ তৈরি করি। এবার প্রায় চল্লিশটা রথ তৈরি করেছি।
রানিরচড়া মিস্ত্রিপাড়ার বাসিন্দা গৃহবধূ কল্পনা রায় বলেন, ৩৫ বছর হল এখানে আমার বিয়ে হয়েছে। তারপর থেকে পরিবারের রথ তৈরির কাজে হাত লাগাই। বাড়ির পুরুষরা বিভিন্ন টুকরো কাঠ দিয়ে রথ তৈরি করেন। আমরা বাড়ির মহিলারা সেগুলি রং করি। আমার মেয়ে রিয়া রথের বিভিন্ন ডিজাইন আরও ভালো জানে। বাবাকে সাহায্য করতে ও ক’দিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে এখানে এসেছে।
আর এক শিল্পী গণেশ রায় বলেন, এবছর প্রায় ১৫০ টি রথ তৈরি করেছি। আট বছর বয়স থেকে এই কাজ করছি। এখন আমার বয়স ৫২ বছর। অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেলেও, আমরা রথ তৈরির ক্ষেত্রে কোনও সরকারি সাহায্য পাই না। সাহায্য পেলে খুব ভালো হতো। ব্যবসার কাজে সুবিধা হতো। স্থানীয় বাসিন্দা তথা কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী দেবিকা দাস বলেন, বাবা হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে কাঠ কেটে রথ তৈরি করেন। আমি আর মা সেই রথগুলিতে লাল, হলুদ, সবুজ, বেগুনি রং করি। স্থানীয় কাউন্সিলার মিহিরকান্তি পাল বলেন, এই অঞ্চলের প্রায় ৪০টি পরিবার সারা বছর বিভিন্ন কাঠের সামগ্রী তৈরি করেন। ওঁরা রথ তৈরির কাজকে কুটিরশিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই শিল্পকে ওঁরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমরা ওঁদের পাশে আছি। • তৈরি হচ্ছে রথ। -নিজস্ব চিত্র