এই উপমহাদেশের মানচিত্র নানাভাবে, কতবার এবং কতখানি যে বদলে গিয়েছে, তার হিসেব রাখা মুশকিল। এই অঞ্চলের মানচিত্র বদলের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে বঙ্গদেশ বা বাংলা। নবাবের আমলে বাংলা, বিহার (বর্তমান ঝাড়খণ্ড-সহ) ও উড়িষ্যা (বর্তমান ওড়িশা) একসঙ্গে উচ্চারিত হতো। পরবর্তীকালে বাকি দুটি অঞ্চলকে ভিন্ন প্রদেশের পরিচয় দিয়ে আলাদা করে দেওয়া হয়। এছাড়া একসময় বাংলার কিছু অঞ্চল আসামের (বর্তমান অসম-সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি) সঙ্গেও সংযুক্ত ছিল। একটা সময় কোচবিহার ছিল পৃথক অঞ্চল (দেশীয় রাজ্য)। পরে পশ্চিমবঙ্গের
একটি জেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ত্রিপুরাতেও একদা একটি রাজতন্ত্র ছিল। তার একাংশ কুমিল্লা জেলা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) জুড়ে দেওয়া হয়। পুরুলিয়া জেলার পশ্চিমবঙ্গভুক্তি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশশাসনের সুবিধার অজুহাতে
লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের ধুয়ো তোলেন। ১৯১১ সালে সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার বিনিময়ে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লি সরিয়ে নিয়ে যান। অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকতা বাংলাভাষী অধ্যুষিত এলাকা। ওই এলাকার প্রধান তিন জেলা হল—কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ। পূর্বতন কাছাড়ি রাজ্যের অংশ ছিল কাছাড় এবং সিলেট বা শ্রীহট্ট জেলার অংশ ছিল করিমগঞ্জ। দেশভাগের সময় মূলত দুটি রাজ্যের উপর কোপ পড়ে। পাঞ্জাব এবং বাংলা। এই দুটি প্রদেশকে আড়াআড়ি ভাগ করে দেওয়া হয়। পশ্চিমপাঞ্জাব এবং পশ্চিমবঙ্গ যথাক্রমে পাকিস্তান এবং ভারত পায়। অন্যদিকে, পূর্বপাঞ্জাব ও পূর্ববঙ্গ পায় যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তান।
এ তো গেল দেশভাগের সরাসরি সর্বনাশ। এর বাইরে, জীবিকাসহ নানা কারণে অসংখ্য বাঙালি বা বাংলাভাষী মানুষ ভারতসহ গোটা উপমহাদেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। আলোচনাটিকে ভারতে কেন্দ্রীভূত করা হলে আমরা দেখতে পাই যে, এখন বাংলাভাষী মানুষ সবচেয়ে বেশি পশ্চিমবঙ্গে। ২০১১ সালের জনগণনা থেকে দেখা যাচ্ছে—বাঙালিরা যথেষ্ট সংখ্যায় রয়েছেন অসম, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, বিহার, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ, মেঘালয়, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশে। বস্তুত কামরূপ থেকে কচ্ছ, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত একটিও অঞ্চল খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে বাংলাভাষী বা বাঙালি মানুষের বসতি নেই। পর্যটক এবং নানা ক্ষেত্রের পেশাজীবী/শ্রমিক হিসেবে বাঙালিদের বিচরণের নজির কমই পাওয়া যায়। বাঙালিরাই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাগোষ্ঠী। হলফ করেই বলা যায়, স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালিদের চেয়ে বেশি অবদান কোনও জাতির নেই। শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে জাতি আবহমানকাল থেকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে তারও এক ও অদ্বিতীয় নাম বাঙালি। সনাতন ভারতের ধর্ম আন্দোলনে যেসব মনীষী নানা সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদামা, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীঅরবিন্দ, মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, প্রভুপাদ, রানি রাসমণি, আনন্দময়ী মা প্রমুখ সকলেই বঙ্গসন্তান। বঙ্গসন্তান রাজা রামমোহন রায়কেই প্রথম আধুনিক ভারতীয় আখ্যা দেওয়া হয়। এশিয়া মহাদেশ থেকে প্রথম যিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তিনিও এক বঙ্গসন্তান—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে মহাগ্রন্থের জন্য শতবর্ষ আগেই তাঁকে এত বড় সম্মান দেওয়া হয় সেই গীতাঞ্জলি বাংলাভাষাতেই রচিত। ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন’ তাঁর লেখা। স্বাধীনতার মহামন্ত্র ‘বন্দেমাতরম’ ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা, তিনিও বাংলামায়ের গর্বের সন্তান। সশস্ত্র আন্দোলনের দিশা দেখিয়েছিল যে আজাদ হিন্দ ফৌজ, তার সর্বাধিনায়ক ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনিও যে বাংলাভাষী সে-কথা কে না জানে। ইংরেজ রাজশক্তির ভিত সত্যিই যদি কেউ নড়িয়ে দিয়ে থাকেন, সেই বাপের বেটার নাম নেতাজি, যিনি আজও আদি ও অকৃত্রিম, তাঁর কোনও শাখা নেই! যে দু’জন ভারতীয় অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন তাঁরাও আপাদমস্তক বাঙালি—অমর্ত্য সেন এবং অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।
কৃতী বঙ্গসন্তানের তালিকা দিতে হলে তার আকার মহাভারতের সমান হয়ে যেতে পারে! এতক্ষণ ধরে যাদের কথা বলা হল তাঁরা সকলেই বাংলাভাষায় কথা বলেছেন, বাংলাভাষাই তাঁদের প্রাণের ভাষা। শুধু ভারতেরই-বা কেন, বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষীদের দাপট প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। এরপরও শুনতে হল ‘বাংলা’ নামে কোনও ভাষাই নেই! সৌজন্যে মোদি-শাহের পার্টি। দিল্লি পুলিসের ‘বাংলাদেশি ভাষা’ মন্তব্যকে সরকারিভাবে সমর্থন করল বিজেপি। বিজেপির কেন্দ্রীয় আইটি সেলের প্রধান তথা দলীয় মুখপাত্র অমিত মালব্যের ‘জ্ঞানগর্ভ’ মন্তব্য শোনা গেল, দিল্লি পুলিসের ‘বাংলাদেশি ভাষা’ মন্তব্যই সঠিক। এই পার্টি এবং এই লোকটি কি ভুলে গেলেন, যে-ব্যক্তির ‘ফসল’ নিয়ে তাঁদের আজ এত রমরমা সেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়েরও মাতৃভাষার নাম বাংলা? এরপর বিজেপির ছোটবড় সকলের লাগাতার মূর্খামির জন্য করুণা ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই বাংলা ও বাঙালির।