সিনেমার সমালোচনা: ইক্কিস
সিনেমার সমালোচনা: ইক্কিস
অগস্ত্য নন্দা, ধর্মেন্দ্র, জয়দীপ আহলওয়াত, সিমর ভাটিয়া
যুদ্ধ আসলে কী? তাতে আদৌ কি কোনও দেশ জেতে? নাকি মৃত্যু হয় শুধু মানবতার? এই প্রশ্ন আজন্মকালের। কিন্তু তাতে যুদ্ধ থেমে থাকেনি। এই মুহূর্তেও বিশ্বের কোনও না কোনও প্রান্তে যুদ্ধ চলছে। মরছে মানুষ। আর এই আবহেই মানবতার জয়গান গায় শ্রীরাম রাঘবনের ছবি ‘ইক্কিস’। বলিউডি সিনেমার জন্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এমনিতেই বেশ নিরাপদ প্লট। বছরের পর বছর এই নিয়ে সিনেমা হয়েছে। বর্তমান সময়ে এদেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ যে পর্যায়ে গিয়েছে, তাতে ইক্কিসেও ভারতীয় সেনার বীরগাথা দেখাতেই পারতেন পরিচালক। কিন্তু সেই সহজ পথে হাঁটেননি তিনি। যুদ্ধ, বীরত্বের মতো বিষয়গুলিকে এড়িয়ে যাননি। কিন্তু সে সব মুখ্য নয়। একইসঙ্গে দেখিয়েছেন যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত মানুষদের আবেগ। তাই, এই ছবিতে এক সেনা সীমান্তের ওপারে গিয়ে বলে ওঠেন, ‘সবই তো এক। তফাত কিছুই দেখছি না।’
গল্পের প্রেক্ষাপট, ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ২১ বছরের জন্মদিন পালন করেই পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধে যোগ দিতে চলে যান পুনা হর্স রেজিমেন্টের সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অরুণ ক্ষেত্রপাল। আর ফেরেননি। ট্যাঙ্ক কমান্ডার হিসেবে বসানতারের যুদ্ধে একাই ধ্বংস করেন বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক। শেষ পর্যন্ত শহিদ হন অরুণ। এসবই বাস্তব ঘটনা। কিন্তু এই সিনেমা আমরা দেখি পাকিস্তানি সেনা ব্রিগেডিয়ার জান মহম্মদ নিসারের (জয়দীপ আহলওয়াত) চোখ দিয়ে। নিসারের ছোড়া গোলাতেই প্রাণ গিয়েছিল অরুণের। তার জন্য একটুও গর্বিত নন নিসার। বরং ৩০ বছর পর অরুণের বাবা এমএল ক্ষেত্রপালের (ধর্মেন্দ্র) কাছে ক্ষমা চাইতে চান তিনি। সিনিয়র ক্ষেত্রপালকে নিয়ে আসেন লাহোরের বাড়িতে। ছেলের ঘাতককে ক্ষমা করতে পারবেন ফৌজি বাবা? সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজেই এগিয়েছে ইক্কিসের গল্প।
ছবিতে অনেকটা অংশ জুড়ে রয়েছে বসানতারের ট্যাঙ্ক যুদ্ধ। কিন্তু তা উচ্চকিত নয়। বরং বারবার মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের মধ্যে জীবন কত অনিশ্চিত। ধূলি-ধূসরিত মাঠে যুদ্ধের দৃশ্যকে আরও রিয়ালিস্টিক করে তুলেছে অনিল মেহতার ক্যামেরা। অরুণের ভূমিকায় রয়েছেন অগস্ত্য নন্দা। অমিতাভ বচ্চনের নাতি হওয়ার সুবাদে ‘নেপো-কিড’ কটাক্ষ তাঁর দিকে ধেয়ে আসতেই পারত। কিন্তু অভিনয়ের জোরে সে সব ঝেড়ে ফেলতে পেরেছেন। ২১ বছর বয়সি যুবকের চপলতা, সঙ্গে সেনার অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ—দুটি বিষয়কেই নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অগস্ত্য। বিশেষ করে ট্যাঙ্ক যুদ্ধের সময় তাঁর অভিনয় দুর্দান্ত। জয়দীপের অভিনয় সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। স্বভাবে নম্র অথচ কর্তব্যে অবিচল পাক সেনা অফিসারের ভূমিকায় তাঁকে ছাড়া বোধহয় কাউকে মানাত না। তবে এসব গৌণ। ইক্কিস মানুষের মনে থেকে যাবে ধর্মেন্দ্রর শেষ সিনেমা হিসেবে। ‘মাচো হিরো’র আড়ালে যে একজন অভিনেতা লুকিয়ে থাকে, তা ফের মনে করিয়ে দিয়েছেন ধর্মেন্দ্র। ছেলেকে হারিয়ে শোকাতুর, আবার একইসঙ্গে ছেলের শৌর্যে গর্বিত তিনি। ছোট্ট চরিত্রে আছেন আরও এক প্রয়াত অভিনেতা আসরানিও। অল্প সময়ের জন্য স্ক্রিনে থাকলেও সিকান্দার খের, ভিভান শাহ, সুহাসিনী মুলে, দীপক দোবরিয়ালের অভিনয় মনে থাকবে। অগস্ত্যর প্রেমিকার ভূমিকায় সিমর ভাটিয়া প্রতিশ্রুতিময়।
কিছু খামতি অবশ্যই আছে। জয়দীপের চরিত্রকে ৩০ বছর আগে ও পরে একইরকম দেখতে লাগে। আইএসআই এজেন্টদেরও হাস্যকরভাবে দেখানো হয়েছে। তবে সে সব কিছুই ছবির মেজাজ নষ্ট করে না। বরং ইক্কিস মনে করিয়ে দেয়, ‘এভরি ওয়ার মুভি, গুড অর ব্যাড, ইজ অ্যান অ্যান্টি ওয়ার মুভি’। অর্থাৎ, যুদ্ধ নিয়ে যে কোনও সিনেমা, আদতে যুদ্ধ-বিরোধী সিনেমা।
শুভজিৎ অধিকারী