Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলার রাজনীতির বিস্ময়কর একটি প্রবণতা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কয়েকটি নিয়ম আছে। ১৯৪৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়সীমায় এই বিস্ময়কর

বাংলার রাজনীতির বিস্ময়কর একটি প্রবণতা
  • ২৮ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কয়েকটি নিয়ম আছে। ১৯৪৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়সীমায় এই বিস্ময়কর প্রবণতাগুলি যেন রাজনৈতিক ফর্মুলা এবং নিশ্চিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। হয়তো কাকতালীয়। কিন্তু নিয়ম করে এসব এমনভাবে হয়ে চলেছে, যেন মনে হয়, এটাই মডেল এই রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির। 

Advertisement

সবথেকে চমকপ্রদ প্রথা হল, একটি দল ভেঙে নতুন দল আত্মপ্রকাশ করে রাজনীতির ময়দানে না নামলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটে জিতে সরকারে আসা যায় না। সাফল্যও পাওয়া যায় না। যতদিন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া অর্থাৎ সিপিআই অখণ্ড বামপন্থী দল হিসেবে ভারতে ছিল, ততদিন পর্যন্ত কংগ্রেসকে হারাতে পারেনি তারা এই রাজ্যে।  কিন্তু ১৯৬৪ সালে ঠিক যখন সিপিআই ভেঙে নতুন দল সিপিএমের জন্ম হল, তারপর থেকেই দেখা যাচ্ছে আসল দল সিপিআই ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। নতুন দল সিপিএম শক্তিশালী হয়েছে। সিপিএমের জন্মই হল ১৯৬৪ সালে। অথচ জন্মগ্রহণের মাত্র ৩ বছরের মধ্যেই তারা বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করে সরকার পর্যন্ত গঠন করে ফেলল। তিন বছরের পার্টি পেয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের সরকারে বড়সড় ভূমিকা। তারপর থেকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। ক্রমে উত্থানের ইতিহাস। 
ছয়েক দশকে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দল গঠন করলেন অজয় মুখোপাধ্যায়রা। নাম দিয়েছিলেন বাংলা কংগ্রেস। তৎক্ষণাৎ হাতে হাতে ফল। পরবর্তী নির্বাচনেই বাংলা কংগ্রেস সরকারে। সিপিএমের সঙ্গে জোটে। অজয় মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস ভেঙে নতুন দল বাংলা কংগ্রেস গঠনের প্রধান কারিগর। তিনিই হয়ে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। দাপুটে সব কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল চন্দ্র সেনদের বিস্মিত করে বাংলায় আত্মপ্রকাশ করল বাংলা কংগ্রেস সরাসরি সরকারি দল হিসেবেই। 
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গিয়ে বাংলা কংগ্রেস দুর্বল হয়ে যায় এবং আবার কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় ফের তাদের শক্তি ক্ষয় হয়ে গেল। আলাদা থাকলে হয়তো শক্তি বেঁচে থাকত। কারণ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাওয়ার পরও কিন্তু নতুন কমিউনিস্ট পার্টি সিপিএম আবার পুরনো দলে ফিরে যায়নি। নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। ফলও পেয়েছে হাতে হাতে। যদিও বাংলা কংগ্রেস শুধুই বাংলার একটি আঞ্চলিক দল। আর সিপিএমের বিভাজন জাতীয় স্তরে। কোনও তুলনা হয় না। কিন্তু ফর্মুলা হল, সিপিএম কিছু বছর পর সম্পূর্ণ একক ক্ষমতায় আবার সরকার গঠন করে ফেলল বাংলায়। 
ক্ষমতা দখল করা সিপিএমকে ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া কংগ্রেস আর বাংলায় হারাতে পারল না। সিপিএম কখন পরাস্ত হল? কার কাছে? যখন  ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস আবার ভেঙে নতুন একটি দল গঠন করা হল। তৃণমূল কংগ্রেস। কংগ্রেস যা পারেনি। কংগ্রেস ভেঙে আসা নতুন দল সেটা ১২ বছরের মধ্যে অনায়াসে পারল। 
২০১১ সালে সেই তৃণমূল কংগ্রেসই সরকার গঠন করল। অর্থাৎ কংগ্রেস ভেঙে বাংলা কংগ্রেস হওয়ার পর সেই দল সাফল্য পেল। আবার কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল হওয়ার পর এই দলও সাফল্য পেল। 
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, এটা যদি সত্যিই প্রবণতা অথবা মিরাকল হয়, তাহলে প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিরাও তো রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন বাংলায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে। তাঁরা পারলেন না কেন? প্রথমত তাঁদের সেই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল না। আর ছিল না একক গ্রহণযোগ্যতা। তবে সর্বোপরি তাঁরা দাঁতে দাঁত চেপে ওই পৃথক দল নিয়েই লড়াই চালু রাখতে চেষ্টা করেননি। সামান্য কিছু সময় পর আবার ফিরে গিয়েছেন কংগ্রেসে। সুতরাং দল ভেঙে অধৈর্য হয়ে গিয়ে আবার ফিরে যাওয়ারা সাফল্য পায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু ফিরে যাননি কংগ্রেসে। সাফল্য পেয়েছেন। 
আর কী কী প্রবণতা আছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে? আর একটি প্রবণতা হল, একবার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গেলে আর পুনরায় বাংলায় সরকারে ফেরা যায় না। এই প্রবণতা ১৯৭৭ সাল থেকে চলছে। তার আগেও যে চলেনি তা নয়। কারণ বাংলা কংগ্রেসের রাজত্বের পর ১৯৭২ সালের যে নির্বাচনে কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল আবার, সেই নির্বাচনকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আখ্যা দিয়ে থাকেন প্রহসনের ভোট হিসেবে। অর্থাৎ অভিযোগ যে, অবাধে সন্ত্রাস ও রিগিং করা হয়েছিল ওই ভোটে। নচেৎ নাকি কংগ্রেস জয়ী হতে পারত না। 
কিন্তু ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসা সিপিএম যখন ৩৪ বছর পর অবশেষে নির্বাচনে পরাস্ত হল, তারপর থেকে কী দেখা যাচ্ছে? দেখা যাচ্ছে ক্রমেই সিপিএম দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে চলেছে। সিপিএম যে আর ক্ষমতায় ফিরবে না, সেটা বোঝার জন্য কোনও রকেট সায়েন্সের দরকার নেই। এখন সিপিএমের একটাই লক্ষ্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিকভাবে ফিনিশ হতে দেখা। সেই কারণে সিপিএমের ভোটব্যাঙ্কের বড় অংশ সিপিএমের ব্রিগেডে যায়, জাস্টিস আন্দোলনে যায়। কিন্তু ভোট দেয় বিজেপিকে। কারণ যে দল মমতাকে হারাবে, আমি তার হাত শক্ত করব। এই হল মনোভাব। সিপিএম নামক পুরনো ফরম্যাটে সিপিএম আর ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না কোনওদিন। ঠিক যেমন কংগ্রেস কোনওদিন ফিরতে পারছে না। পারবেও না। এই দুই দল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। 
সুতরাং কী দেখা গেল? প্রথমত পুরনো বড় জাতীয় দল ভেঙে নতুন কোনও দল আত্মপ্রকাশ না করা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদল হয় না। দ্বিতীয়ত, একবার ক্ষমতাচ্যুত হলে পশ্চিমবঙ্গে আর ক্ষমতায় ফেরা যায় না। তাহলে মোটামুটি সত্যিই যদি এই ফর্মুলায় বিশ্বাস রাখতে হয় তাহলে প্রশ্ন হল, এই সব চেনাজানা ইতিহাস অথবা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার কথাগুলি বলা হল কেন? কারণ বঙ্গবিজেপির হাল হকিকত দেখেই বঙ্গ রাজনীতির এই প্রবণতার কথা মনে পড়ে গেল। 
বঙ্গবিজেপি বহুধাবিভক্ত। অন্তত তিনটি শাখা। এই বিভাজিত অংশের কোনও এক নেতাকে হয়তো বিজেপির প্রাচীন কর্মী সমর্থক নেতারা বিশ্বাসই করেন না। তাঁরা মনে করেন ওই শাখাটি আসলে তৃণমূলের এজেন্ট। আবার যাঁরা আদি বিজেপি তাঁদের মধ্যেও বিভাজন। কেউ বর্তমান সভাপতির অনুগামী। কেউ প্রাক্তন সভাপতির। 
বঙ্গবিজেপির যদি মনে না থাকে তাহলে তারা চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করুক যে, ২০২০ সালে করোনাকালেও উগ্র হিন্দুত্বকে সামনে নিয়ে এসে  কী চরম প্রচার আর গরমাগরম ভাষণ তারা দিয়েছিল। মিছিল, স্লোগান, হুংকার এসব চলেছিল বিভিন্ন ধর্মীয় পরবে। কারণ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে ভোট বিভাজনের একটি চেষ্টা। রাজনীতিতে সেটা বিজেপির পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে দেখা গেল ওই মডেল ব্যর্থ হয়েছে। কাজে দেয়নি। রমরম করে তৃণমূল জয়ী হয়েছে। 
ইদানীং ঠিক সেই পাঁচ বছর আগের ফর্মুলা আবার শুরু হয়েছে। হঠাৎ করে ধর্মীয় বিভাজনের স্লোগান আরও তুঙ্গে উঠছে। কারণও সেই এক। আগামী বছর ভোট। বঙ্গবিজেপি যতই ধর্মীয় বিভাজনের মাধ্যমে ভোটে লড়াইয়ের চেষ্টা করে সেটা যে আদতে তৃণমূলের সুবিধাই করে দেয় এটা তারা বোঝেই না, এটা তো হতে পারে না। কারণ বিজেপি যতই বিভাজনের কথা বলবে, ততই তো মুসলিম ভোট মরিয়া হয়ে তৃণমূলে আরও বেশি করে জমা হবে। যদিও বা মুসলিমদের একাংশ সিপিএমকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবত, বিজেপির এই আচরণে তারা আর ওসব ভাববে না। সুতরাং বিজেপির উভয় সঙ্কট। কী করবে? 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এতটা রিলাক্সড হয়ে লন্ডনের হাইড পার্কে  মর্নিং ওয়াক করছেন এবং গোটা বঙ্গবাসী সেটা সোশ্যাল মিডিয়া আর টিভিতে দেখছে। কেন? কারণ ৪১ বছরের সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতায় মমতা বুঝে গিয়েছেন বিজেপির আস্তিনে আর কোনও তাস নেই। প্রকৃত রাজনৈতিক ইস্যু ধরে ময়দানে নামতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। 
নানাবিধ দুর্বলতা ও ড্যামেজের  প্রচুর ক্যাচ দিয়েছে তৃণমূল সরকার। বঙ্গবিজেপি সব ক্যাচ ফেলে দিয়েছে। এত ক্যাচ ফেললে ম্যাচ জেতা যায় না।  তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিশ্চিন্ত হয়ে ভাবছেন কবে নাগাদ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা আবার বাড়িয়ে দেবেন। 
২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় বঙ্গবিজেপির ছিল উত্থানের সময়। দেখা যাচ্ছে 
তারপর থেকে ক্রমাবনতি। ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটে বিপর্যয়। একের পর এক বিধানসভা উপ নির্বাচনে পরাজয়। সুতরাং আর নতুন করে বিপুল বিক্রমে মহাশক্তিধর হওয়া সম্ভব নয়। সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। 
তাহলে কি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ট্রেন্ড 
তথা ফর্মুলা অনুযায়ী বিজেপির ভবিষ্যৎ সাফল্যের একমাত্র পথ হল, বিজেপি ভেঙে নতুন কোনও বিজেপির জন্ম হওয়া? দিল্লি থেকে রিমোট কন্ট্রোলে চলা এই বঙ্গবিজেপি সাফল্য পাবে না? নতুন দল গড়লে সুফল পাবে? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ