বিশ্বজিৎ দাস: ক্রেতা দীননাথবাবু: ছেলেটার জ্বর। ৫টা প্যারাসিটামল দেবেন। (চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিলেন)
বিশ্বজিৎ দাস: ক্রেতা দীননাথবাবু: ছেলেটার জ্বর। ৫টা প্যারাসিটামল দেবেন। (চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিলেন)
বিক্রেতা কুবেরবাবু: ৫টা তো দিতে পারব না দাদা। নিতে হলে ১৫টার স্ট্রিপ নিতে হবে।
ক্রেতা: মানে?
বিক্রেতা: মানে খুব সহজ। কাটা ওষুধ বেচব না। শুধু প্যারাসিটামল কেন, পেটখারাপ, বমি, ইনফেকশন, গ্যাস, অম্বল, সুগার, প্রেশার, মৃগী, ডিপ্রেশন—যে ওষুধই চাইবেন, গোটা পাতা কিনতে হবে।
ক্রেতা: কিন্তু আমার তো ১০ বা ১৫টার পাতা লাগবে না! জ্বর উঠলে তবেই দিতে বলেছে। তাহলে বেশি টাকা খরচ করে বেশি ওষুধ নেব কেন?
বিক্রেতা: না নিলে না নেবেন। নেওয়ার হাজার একটা লোক আছে আমার।
ক্রেতা: কিন্তু, এরকম কি কোনও নিয়ম আছে, ওষুধের গোটা স্ট্রিপই নিতে হবে? একটা-দুটো-চারটে-পাঁচটা দেওয়া যাবে না।
বিক্রেতা: অতশত জানি না। আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আপনার না পোষালে অন্য দোকানে যান। দেখছেন না, আপনার সঙ্গে চারটে কথা বলতে গিয়ে কেমন লাইন লেগে গিয়েছে।
ক্রেতা (ফোনে): নমস্কার, নিয়মরক্ষক সমাদ্দার বলছেন?
ড্রাগ ইনসপেক্টর: বলুন দীননাথবাবু। আছেন কেমন? হঠাৎ মনে করলেন যে আজ?
ক্রেতা (ফোনে): ছেলেকে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে দোকানে ওষুধ কিনতে গিয়ে আজ একটা আজব অভিজ্ঞতা হল।
ড্রাগ ইনসপেক্টর: কী হল?
ক্রেতা: ৫টা প্যারাসিটামল চেয়েছিলাম। দোকানদার দিল না। বলল, কাটা ওষুধ দেবে না। না পোষালে অন্য দোকানে চলে যান। এইরকম কি কোনও নিয়ম আছে?
ড্রাগ ইনসপেক্টর: ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট অনুযায়ী, এইরকম কোনও নিয়ম নেই। আপনার দোকানদারের আচরণ বা যুক্তি আপত্তিকর মনে হলে আমাদের লিখিত অভিযোগ জানান। নিশ্চয় দেখব।
তাহলে? অধিকাংশ দোকানদার কি জানেন না, কাটা ওষুধ না দেওয়াটা বেআইনি। তাঁরা বেআইনি কাজ করছেন? নাহ্, তাঁরা বিলক্ষণ জানেন, কাটা ওষুধ চাইলে দেওয়া উচিত। তাহলে তাঁদের পালটা যুক্তি কি? এক, ওইভাবে কাটা ওষুধ বেচলে বাকি ওষুধ বেচব কী করে? (মানে কেউ একলপ্তে ১০টা বা ১৫টা ওষুধের গোটা স্ট্রিপ যখন চাইবেন, আগের স্ট্রিপটা তো বেকার হয়ে গেল)। দুই, ওষুধের গোটা স্ট্রিপের সব ওষুধের গায়ে নাম লেখা থাকে না ব্র্যান্ডের। কিছু কিছু জায়গায় থাকে। একইভাবে ওষুধের ম্যানুফ্যাকচারিং ও এক্সপেয়ারি ডেট, ব্যাচ নম্বর ইত্যাদি জরুরি তথ্যও লেখা থাকে না স্ট্রিপের প্রতিটি ওষুধের পিছনে। অনেকসময় কাটা ওষুধের সঙ্গে কোম্পানির দেওয়া ব্র্যান্ড নেম, ব্যাচ নম্বর ইত্যাদি তথ্য চলে যাওয়ার পর যেসব ওষুধ পড়ে থাকে, সেখানে জরুরি তথ্যগুলি থাকে মিসিং।
তখন? ক্রেতাই-বা কী করে বুঝবেন, কোন ওষুধ তিনি কিনছেন! আবার বিক্রেতার কাছে ওষুধ সংক্রান্ত কোনও ডকুমেন্ট থাকছে না। তাঁকে হাতে লিখে এইসব তথ্য ক্রেতাকেও দিতে হচ্ছে। আবার নিজের কাছেও রাখতে হচ্ছে।
উভয়পক্ষের হাতেই রয়েছে শক্তপোক্ত যুক্তি। তাহলে? এর কি কোনও সমাধান নেই? একটা সমাধান আছে বটে। কিন্তু এখনই সেই উত্তর খুঁজতে না গিয়ে বরং দেখা যাক, বাড়ির জমে থাকা বা অতিরিক্ত বা কাজে না লাগা বা মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধের জন্য কত বড়ো বিপদ হতে পারে?
সেজন্য প্রথমে দেখতে হবে, কী পরিণতি হচ্ছে এইসব ওষুধের? বেশিরভাগ গৃহস্থ এইসব ‘বাতিল’ ওষুধ ফেলে দিচ্ছেন বাড়ির অন্যান্য বর্জ্য রাখার ডাস্টবিনে। দেশজুড়ে একাধিক সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, কমবেশি ৭৩ থেকে ৮২ শতাংশ ক্ষেত্রে বাতিল ওষুধ ফেলা হচ্ছে রোজকার বর্জ্য ফেলার ডাস্টবিনে। মাত্র ২.৬ শতাংশ ফেরত দেওয়া হয় দোকানে। সবচেয়ে বেশি নষ্ট হচ্ছে বা বাতিল হচ্ছে ব্যথার ওষুধ। বাড়ির ডাস্টবিনে ফেলা ‘বাতিল’ ওষুধ ঘুরেফিরে মিশছে মাটিতে, নদীতে। ওষুধ দূষণ নদীতে কী মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে ২০২২ সালে হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত সমীক্ষা—‘ফার্মাসিউটিক্যাল পলিউশন অব দ্য ওয়ার্ল্ডস রিভার’। পিএনএএস-এ প্রকাশিত সেই সমীক্ষা শুধু ভারত নয়, পৃথিবীজুড়ে তোলপাড় ফেলে দেয়। পৃথিবীর ১৩৭টি জায়গার ২৫৮টি নদী এবং ৪৭ কোটি নির্ভরশীল মানুষ চলে এসেছিলেন সেই সমীক্ষার আওতায়। জাপান থেকে আন্টার্কটিকা, ভারত থেকে গ্রিস—কোনও জায়গাই প্রায় বাদ ছিল না।
এইবার দেখা যাক, নদীর জলে কী কী পাওয়া গিয়েছিল। অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট বা এপিআই হিসেবে পাওয়া যায় অ্যান্টি ডায়াবেটিক ওষুধ মেটফরমিন! পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে পেইনকিলার, প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি এপিলেপটিক মেডিসিন বা খিঁচুনি কমানোর ওষুধ। গঙ্গার জলে পাওয়া গিয়েছে অ্যান্টিবায়োটিকের অংশ। বাদ নেই যমুনা বা দেশের অন্যান্য নদীও। দেখা যাক, ওষুধ বর্জ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি নদী দূষণ হয়েছে সাব সাহারান আফ্রিকায়। তারপরই আসছে আমাদের নিবাস যেখানে, সেই দক্ষিণ এশিয়ায়।
এইবার দেখা যাক, জলে ওষুধ বর্জ্য মেশার ফল কী? পৃথিবীখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল বিএমজে’তে এ নিয়ে ২০২৪ সালে একটি চাঞ্চল্যকর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে একটির পর একটি ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন গবেষকরা।
ঘটনা ১
তেলেঙ্গানার যদাদ্রি ভুবনগিরির চাষিরা ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে সতর্ক করেন, বিভিন্ন ওষুধ এবং রাসায়নিক কোম্পানির বর্জ্য আনথাম্মাগুদেমের মাটি বিষাক্ত করে তুলেছে। পাকেচক্রে সেই জায়গাটি আবার গোটা হায়দরাবাদের মানুষের শাক-সবজির প্রধান উৎস। শুধু সতর্ক করেই ক্ষান্ত হননি তাঁরা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে সরাসরি অভিযোগ জানান চাষিরা। তার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল মাটি পরীক্ষার নির্দেশ দেয়। পরীক্ষার রিপোর্ট জেনে স্তম্ভিত হয়ে যান বিজ্ঞানীরাও। জানা যায়, ওই এলাকার মাটি, ভূগর্ভস্থ জলে সবেতেই রয়েছে ওষুধের অংশবিশেষ। অ্যান্টিঅ্যাসিড, অ্যান্টিফাংগাল, অ্যান্টিঅ্যালার্জি—কী নেই তালিকায়!
ঘটনা ২
নামকরা পরিবেশ গবেষণা সংস্থা টক্সিক লিঙ্ক ভারতের চারটি নদীতে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ পরীক্ষার জন্য নমুনা পরীক্ষা করেছিল। চেন্নাইয়ের কউম, লখনউয়ের গোমতী, দিল্লির যমুনা এবং গোয়ার জুয়ারি। দেখা যায় তিনটি অ্যান্টিবায়োটিক মারাত্মক পরিমাণে রয়েছে নদীর জলে। ওফ্লক্সাসিন (ডায়ারিয়া, পেট খারাপ এবং অন্যান্য অসুখে ব্যবহৃত), নরফ্লক্সাসিন (একই) সালফামেথক্সাসোল (ইউটিআই, আমাশা ইত্যাদি অসুখে)।
নদীর জলে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার অর্থ হল, মারাত্মক এক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে দেশ। তার নাম হল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স (এএমআর)। মোদ্দা কথায়, আমাদের অতিব্যবহার অথবা কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যবহারে জীবাণুকুল হয়ে উঠেছে দুর্ভেদ্য। কমতে কমতে এখন তাদের বধ করার মতো অস্ত্রই খুঁজে পাওয়া ভার। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, করোনার পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর আসন্ন মহামারীর নাম হতে চলেছে এই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স। ডাক্তার হাজির, স্বাস্থ্যকর্মী হাজির, হাসপাতাল এবং উন্নত পরিকাঠামো হাজির। কিন্তু রোগ সারানোর মতো প্রায় কোনও ওষুধই নেই হাতে!
সিঁদুরে মেঘ দেখে দেশের শীর্ষ ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোল (সিডিএসসিও) বাতিল বা অব্যবহৃত ওষুধ কীভাবে নষ্ট করতে হবে, তার নিয়মকানুন সংবলিত একটি নির্দেশনামা প্রকাশ করে। এবছর ২৬ মে প্রকাশিত সেই গাইডলাইনের নাম গাইডেন্স ডকুমেন্ট অন ডিসপোজাল অব এক্সপায়ার্ড/আনইউজড ড্রাগস।
সেখানে বলা হয়েছে, কী ধরনের ওষুধ বর্জ্য নষ্ট করতে হবে এবং কীভাবে। কখনও ভূগর্ভস্থ জলস্তর বাঁচিয়ে মাটিতে পুঁতে, কখনও ৮৫০ থেকে ২ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পুড়িয়ে, কখনও ক্যাপসুল বা প্যাকেজিং খুলে সিমেন্ট, লেবু এবং অন্যান্য উপাদানসহ মিশিয়ে পেস্ট জাতীয় তৈরি করে তারপর শক্ত করে সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে নষ্ট করা, কখনও নিকাশি ব্যবস্থায় মিশিয়ে দেওয়া (সিরাপ ইত্যাদি, তবে একসঙ্গে ৫০লিটারের বেশি নয়)—সমস্ত পদ্ধতির বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু ভারতের মতো দেশে যেখানে সমাধানের শর্টকাট খুঁজে নেওয়াটাই দস্তুর, সেখানে পরিবেশ বাঁচাতে এত নিয়ম কেউ মানে নাকি? ঠিক যেমন নিজের ব্যবসা রক্ষা করতে ড্রাগ অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চাহিদার অতিরিক্ত ওষুধ গছিয়ে বাড়িতে ওষুধের অপ্রয়োজনীয় পাহাড় তৈরি করা রোজ দিব্য চলছে। না চাইতেও ওষুধের বাক্সে জড়ো হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় সংখ্যার ওষুধ। কারণ কাটা ওষুধ যে দেওয়া হবে না!
আবার যদি সত্যিই অক্ষরে অক্ষরে নিয়ম মানতে হয়, ঠিক গোনাগুনতি ওষুধ প্রেসক্রিপশন ধরে ধরে কিনতে হবে (শুধু অ্যান্টিবায়োটিকই নয়, সব ওষুধ)। গোনাগুনতি ওষুধ প্রেসক্রিপশন ধরে ধরে বেচতেও হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেউ বেচবেনও না, আবার কেউ কিনবেনও না। শুধুমাত্র ফার্মাসিস্টই ওষুধ দেবেন। প্রতিমুহূর্তে ফার্মাসিস্ট না থাকলে দোকান চলবে না। ফার্মাসিস্ট না দেখলেই দোকানদারকে শো-কজ করা হবে।
সবমিলিয়ে অসম্ভব, অবাস্তব সব ভালোর দেশে লহমায় চলে যাওয়া। যা কি না দ্রুত হওয়া অসম্ভব। কবে হবে, তাও বলা অসম্ভব। তাই বড়ো বিপদ কোনওদিন হবে না, এই আশা করে নির্লিপ্ত থাকাটাই যে জাতি রপ্ত করে ফেলেছে, তাদের জন্য টুক টুক করে নয়, রীতিমতো ঝড়ের বেগে আসছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স। আসছে এমন এক ভয়াবহ দিন, যখন হাসপাতালে সব থাকবে, শুধু থাকবে না রোগ সারানোর কার্যকরী ওষুধ। যার মানে হল ভর্তি হওয়াও যা, বাড়িতে বসে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকাও তাই!
বছরে গড়ে শুধু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের জন্য এখন প্রাণ যায় ১১ লক্ষ মানুষের। শহরের খ্যাতনামা সংক্রামকবিদ্যার চিকিৎসক ডাঃ যোগিরাজ রায় কিছুদিন আগে বলছিলেন, ‘বহু কেসে আমরা বুঝতেই পারছি, হাতে আর কোনও ওষুধ নেই। অতি ব্যবহারে রেজিস্টেন্ট হয়ে গিয়েছে। আর রোগীমৃত্যুর পর বিমর্ষ, ভেঙে পড়া মুখের আত্মীয়স্বজনদের বলছি, অনেক চেষ্টা করলাম। পারলাম না! আমরাই জানি, কীসের চেষ্টা? দেওয়ার মতো ওষুধই তো ছিল না আমাদের হাতে!’