তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক নানা বিমান সংস্থা অনেকদিন আগেই কলকাতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই মুহূর্তে ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে একটি বিমানও সরাসরি কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করে না। পশ্চিমি দুনিয়ার নাগরিকরা এই শহরে আসেন দুবাই, আবুধাবি, দোহা হয়ে। অথবা মুম্বই, দিল্লি ছুঁয়ে। বাস্তব ছবিটা হল, রাজধানী দিল্লিতে প্রতিদিন বিমান নামে ৫৯০টি, মুম্বইয়ে ৫১৬টি। কলকাতায় মাত্র ৫১টি। এত প্রতিকূলতা, ভয়ংকর অসম লড়াই— তবু দেশের পর্যটন মানচিত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে মমতার পশ্চিমবঙ্গ। কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক দু’দিন আগে জানিয়েছে, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে দেশের মধ্যে বাংলা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। আর দেশের অভ্যন্তরে পর্যটক সংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গের স্থান সপ্তম। এই হিসাব ২০২৪ সালের। তার পরের এক বছরে দু’টি ঘটনার সবিশেষ উল্লেখ প্রয়োজন। প্রথমত, ২০২৪-এর জুলাই, আগস্ট মাসে পড়শি বাংলাদেশে উদ্ভূত পরিস্থিতির জেরে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে বিমান চলাচলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হ্রাস পেয়েছে। ওই ঘটনায় পর্যটন ভিসায় কোপ পড়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে পর্যটক আসা কমে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, চলতি বছরে দীঘায় জগন্নাথ ধামের উদ্বোধনের পর গত আট মাসে সেখানে ৯০ লক্ষ পর্যটক উপস্থিত হয়েছেন। এর একটা ভালো অংশ বিদেশি পর্যটক। এই দু’টি ঘটনার প্রেক্ষিতে হিসাব করলেও দেখা যাচ্ছে, এরাজ্যে পর্যটক আসা বেড়েছে। তাই বিদেশি পর্যটক টানার মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ যে মহারাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে প্রথম স্থানে চলে আসতে পারে— তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আগে জাতীয় ক্ষেত্রে বাংলার পর্যটন নিয়ে সমালোচনা ও বদনামের কোনও শেষ ছিল না। এক দেড় দশক আগে পর্যন্তও বাংলার পর্যটনের গন্তব্য মানেই সেই ‘দিপুদা’ (দার্জিলিং-পুরী-দীঘা)। এর বাইরে শুধু কবিগুরুর শান্তিনিকেতন। কিন্তু মোদি সরকারের পর্যটন মন্ত্রকের বার্ষিক রিপোর্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাজ্য সরকারের ম্যাজিক ছোঁয়ায় ছবিটা আমূল বদলে গিয়েছে। সরকারের ‘ট্যুরিজম ডেটা সংকলন-২৫’-এ প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে, ২০২৪ সালে প্রথম স্থানাধিকারী মহারাষ্ট্রে বিদেশি পর্যটক গিয়েছিলেন ৩৭ লক্ষ। দ্বিতীয় স্থানাধিকারী পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাটা ছিল ৩১ লক্ষ। যা তার আগের বছরের তুলনায় ১৪.৮ (২৭ লক্ষ) শতাংশ বেশি। এ রাজ্যে বিদেশি পর্যটক এসেছেন মূলত আমেরিকা, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, কানাডার মতো দেশ থেকে। গত বছর বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা তার আগের বছরের ২১.২ লক্ষ থেকে কমে হয়েছে ১৭.৫ লক্ষ। গত বছর ভারতে যত বিদেশি পর্যটক এসেছেন, তার ১৭.৭ শতাংশ গিয়েছেন মহারাষ্ট্রে, পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন ১৪.৯ শতাংশ। পাশাপাশি, দেশের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্য থেকে পর্যটক আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে বাংলা রয়েছে সপ্তম স্থানে। তার আগে থাকা ছ’টি রাজ্য হল, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্র। বাংলায় সবচেয়ে বেশি পর্যটকের পা পড়েছে হাজারদুয়ারি প্যালেস, কোচবিহার রাজবাড়ি, বিষ্ণুপুর মন্দির ও মেটক্যাফে হল-এ।
আসলে পাহাড়-সমুদ্র-জঙ্গলের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই বাংলায় দেখার চোখ, উপযুক্ত পরিকাঠামো ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুললে যে পর্যটন ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব— তা প্রমাণ করে দিচ্ছে উপরের পরিসংখ্যান। ‘দিপুদা’র ধারণাকে পিছনে ফেলে বাংলার পর্যটন এখন তাই পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামের মতো একদা পিছিয়ে থাকা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু শীত এলেই পিঠে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়া নয়, দেশি, বিদেশি পর্যটকরা এখন প্রায় সারা বছর ধরেই বাংলার আনাচে-কানাচে পৌঁছে যাচ্ছেন অপার সৌন্দর্যের হাতছানি উপভোগ করতে। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং নবান্নের ঢালাও সাহায্য পেয়ে বেসরকারি উদ্যোগেও এখন রাজ্যের পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ আগ্রহ দেখাচ্ছে। এর ফল মিলছে হাতেনাতে। রাজ্য পর্যটন দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলায় ২০২২ সালে পর্যটক এসেছেন ৮.৪ কোটি, ২০২৩-এ ১৪.৫ কোটি। ২০২৪-এ এই সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে ১৮.৫ কোটিতে। অর্থাৎ দু’বছরে রাজ্যে পর্যটক বেড়েছে ১০ কোটির বেশি। স্পষ্টতই খুশি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, কোভিড পর্বের পরে পুনরুত্থানের জন্য রাজ্য সরকার পর্যটনকে যেভাবে প্রচার করেছিল, কেন্দ্রের পরিসংখ্যান তারই প্রতিফলন। তথ্য বলছে, ধর্মীয় পর্যটন, উৎসব পর্যটন এবং মিটিং-ইনসেনটিভ-কনফারেন্স-একজিবিশন— এসবের মিলিত ফল এই অগ্রগতি, দাবি রাজ্যের। পর্যটক টানতে রাজ্য সরকারের ‘সুইটেস্ট পার্ট অব ইন্ডিয়া’ ব্যান্ডিং-এর প্রচার ইতিমধ্যে সাড়া ফেলেছে। এই প্রচারের মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্য, খাদ্য, উৎসব, শিল্প ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হচ্ছে জাতীয়-আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এভাবে চললে নিকট ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম বড়ো ভরসাস্থল হয়ে উঠতে পারে পর্যটন শিল্প।