Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বঞ্চনার যোগ্য জবাব

রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল সরকার টানা তিনবার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। লোকসভা বিধানসভার প্রতিটি নির্বাচনে প্রচারের (অপপ্রচারের) ঝড় বইয়ে দিয়েও বিজেপি’র কাছে ক্ষমতা অধরা থেকে গিয়েছে।

বঞ্চনার যোগ্য জবাব
  • ৮ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল সরকার টানা তিনবার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। লোকসভা বিধানসভার প্রতিটি নির্বাচনে প্রচারের (অপপ্রচারের) ঝড় বইয়ে দিয়েও বিজেপি’র কাছে ক্ষমতা অধরা থেকে গিয়েছে। ভোট এলে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের বাহিনী কার্যত ‘ডেলি প্যাসেঞ্জারি’ করেও নবান্নের ত্রিসীমানায় পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে। গত পনেরো বছর রাজনীতির ময়দানে এভাবেই বারবার পর্যুদস্ত হয়ে মমতা সরকারের বিরুদ্ধে শেষমেশ অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করেছে মোদি সরকার। একদিকে অবাস্তব অযৌক্তিক শর্ত চাপিয়ে যৌথ প্রকল্পে কেন্দ্রীয় ভাগের টাকা আটকে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনার মতো প্রকল্পের টাকা বছরের পর বছর আটকে রেখে রাজ্যকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার চেষ্টা হচ্ছে। অভিযোগ, শুধু এভাবেই রাজ্যের প্রাপ্য ১.৭১ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবু আটকানো যাচ্ছে না মমতার সরকারকে। শত বঞ্চনা, প্রতিরোধ সত্ত্বেও নিজেদের কোমরের জোরে, চোখে চোখ রেখে লড়াই চালাচ্ছে বাংলার সরকার। এর নিট ফল হল, যাবতীয় আশঙ্কাকে পিছনে ফেলে নিজের রোজগারেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এই রাজ্য। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজ্যের অর্থনীতিতে। বাণিজ্যিক কর থেকে জিএসটি আদায়— মোদির বেহাল অর্থনীতির দেশে মমতার বাংলা যেন এক ব্যতিক্রমী রাজ্য।

Advertisement

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মানুষের হাতে নগদের জোগান থাকলে বাজারে কেনাকাটা বাড়ে। যার হাত ধরে পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ে। অঙ্কের নিয়মেই অর্থনীতির বাজার গতিশীল হয়। এ রাজ্যে প্রায় ১০০টির মতো সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের হাতে নগদ জোগানের ব্যবস্থা করে অর্থনীতিকে সচল রাখার সেই ধ্রুপদী কাজটি করেছেন মমতা। যা করতে ব্যর্থ হয়েছে মোদি সরকার। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে রাজ্যের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কী রকম? রাজ্যের বাণিজ্যিক কর বা কমার্শিয়াল ট্যাক্স বাবদ আদায় নির্ভর করে বিক্রয় কর, বিদ্যুৎ মাশুল, কয়লা সেস, প্রফেশনাল ট্যাক্স এবং জিএসটি’র উপর। দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫-এর সদ্য শেষ হওয়া অর্থবর্ষে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ রাজ্যে আদায় বেড়েছে গত অর্থবর্ষের থেকে। যেমন ২০২৩-২৪-এ বিক্রয় কর আদায় হয়েছিল ১০ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫-এ তা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ শুল্ক বাবদ আদায় ৩ হাজার ৮৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। কয়লা সেস ১৯১৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২১৬৫ কোটি টাকা হয়েছে। একইভাবে প্রফেশনাল ট্যাক্স বাবদ আদায় ২০২২-২৩-এর ৭৭৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০২৩-২৪-এর অর্থবর্ষে বাণিজ্যিক কর বাবদ রাজ্যের আদায় হয়েছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫-এ ৫ হাজার কোটি টাকা বেড়ে আদায় হয়েছে মোট ৬৬ হাজার কোটি টাকা। রাজ্যের নিজস্ব আদায়ের নিরিখে গোটা দেশে বাংলার স্থান ষষ্ঠ। বাংলার পিছনে একাধিক ডাবল ইঞ্জিনের সরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল জিএসটি আদায়। পণ্য ও পরিষেবার এই পরোক্ষ কর ব্যবস্থা চালু হয়েছিল ২০১৭ সালের ১ জুলাই। ঘটনা হল, জিএসটি চালু হওয়ার পর রাজ্যগুলির কর আদায়ের পথ অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়েছে, এমনকী সেস বাবদ কেন্দ্রের নেওয়া অর্থের ভাগও ঠিকমতো পায় না রাজ্য। এরসঙ্গে জুড়েছে বিভিন্ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আটকে রাখার ইতিহাস। এই প্রতিকূলতার মধ্যেই জাতীয় গড়কে পিছনে ফেলে দিয়েছে রাজ্যের জিএসটি বাবদ আদায়ের হার। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ২০২৪-২৫-এর অর্থবর্ষে তার আগের বছরের তুলনায় ৪ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত জিএসটি আদায় হয়েছে। শতকরা হিসেবে যা ১১.৪৩ শতাংশের বেশি। যেখানে জিএসটি আদায়ের জাতীয় গড় ৯.৪৪ শতাংশ, তারচেয়ে ২ শতাংশ বেশি জিএসটি সংগ্রহ করেছে বাংলা। এর পাশাপাশি জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশন ও স্ট্যাম্প ডিউটি থেকে ২০২৪-২৫-এ ১৯০৮ কোটি অতিরিক্ত অর্থ জমা পড়েছে। বৃদ্ধির হার ৩১.৫ শতাংশ। আবার, কৃষিজমির খাজনা তুলে দেওয়া সত্ত্বেও ২০২৪-২৫-এ ভূমি রাজস্ব বাবদ আয় ২৫০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২৫০ কোটি টাকা। আবগারি শুল্ক থেকে আয় বেড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে জিএসডিপি-ও ১০.৫০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৮ লক্ষ ৭৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। এসবই আসলে কেন্দ্রের বঞ্চনার যোগ্য জবাব। নিজের জোরে মাথা তুলে এগিয়ে চলা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ