যে সে সাফল্য নয়। একেবারে ‘বড় সাফল্য’! নরেন্দ্র মোদির তাঁবেদারদের দাবি অন্তত তেমনই। দু’মাস আগে, গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ধর্ম পরিচয় জেনে গুলি চালিয়ে জঙ্গিরা ২৬ জন নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলেছিল। গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া এই ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় এনআইএ তদন্তের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর গত ৬০ দিনে গোটা কাশ্মীর কার্যত চষে ফেলেছেন গোয়েন্দারা। এনআইএ-র সেরা অভিজ্ঞ অফিসারদের তদন্তে নামানো হয়েছে। একটি তদন্তকারী দল কাশ্মীরে ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। অন্তত তিন হাজার কাশ্মীরিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তল্লাশির নামে নিরীহ কাশ্মীরবাসীর উপর অত্যাচার চালানোরও অভিযোগ উঠেছে। অতীতে জঙ্গিযোগের অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পহেলগাঁওয়ের সেই হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের সঙ্গে পাকিস্তানের যোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই পড়শি রাষ্ট্রের ন’টি জঙ্গিঘাঁটি এবং একাধিক সামরিক ঘাঁটির উপর হামলা চালিয়েছে ভারতীয় বায়ু সেনা। যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সিন্দুর।’ ভারতীয় সেনার কৃতিত্বে প্রতিটি ভারতবাসী গর্বিত। কিন্তু এত কিছুর পরেও হামলাকারী চার জঙ্গির এখনও হদিশ করতে পারেননি ভারতীয় গোয়েন্দারা। কর্পূরের মতো তারা যেন উবে গিয়েছে! তাহলে পহেলগাঁওয়ে হামলার দু’মাস পর ‘বড় সাফল্য’ এল কীভাবে? এনআইএ-র দাবি, রবিবার কাশ্মীরের দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা সব জেনেবুঝে হামলাকারী জঙ্গিদের আশ্রয় দিয়েছিল। খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করেছিল, যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সুতরাং ‘আসলদের’ হদিশ না পেলেও আশ্রয়দাতাদের খুঁজে পাওয়াটা কম ‘বড় সাফল্য’ নয়।
কিন্তু দুধের বদলে ঘোলের স্বাদ অর্থাৎ এই সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২২ এপ্রিল ঘটনার পর চারজন জঙ্গির মধ্যে যে তিন জঙ্গির নাম, মুখের স্কেচ ও তাদের সন্ধান দিতে পারলে ২০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল এনআইএ, তাদের মধ্যে দু’জন পাকিস্তানি হলেও একজন নাকি ছিল কাশ্মীরের বাসিন্দা। কিন্তু রবিবার ধৃত দু’জন নাকি স্বীকার করেছে, তাদের আশ্রয়ে থাকা তিনজনই পাকিস্তানের। তাহলে কাশ্মীরের বাসিন্দা জঙ্গির নাম, পরিচয় এল কোথা থেকে? শুধু তাই নয়, প্রকাশিত স্কেচের মুখের সঙ্গে ধৃতদের বর্ণনায় উঠে আসা হামলাকারী জঙ্গিদের চেহারার মিল নাকি পাওয়া যাচ্ছে না! প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি গত দু’মাসের তদন্ত ঠিকপথে এগয়নি? তদন্তের গতিপ্রকৃতি ধীরলয়ে চলছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আবার ধৃতরা জানিয়েছে, ঘটনার আগে জঙ্গিরা তাদের আশ্রয়ে ছিল। তাই হামলার ঘটনার পর তাদের গতিবিধি ধৃতদের জানার সম্ভাবনা নিয়েও ধোঁয়াশায় রয়েছেন গোয়েন্দারা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ঘটনার দু’মাস পরেও হামলাকারীরা কাশ্মীর কিংবা ভারতের অন্য কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে থাকলে বুঝতে হবে গোয়েন্দারা পুরোপুরি ব্যর্থ। তা না হলে যদি জঙ্গিরা পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তাহলে এখন মোদি সরকার কতদূর, কী করতে পারবে— তা নিয়েও ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে দু’জনের গ্রেপ্তার হওয়াকে ‘বিরাট সাফল্য’ বলে দেখানো হলেও এর থেকে লাভের অঙ্ক শূন্য থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাস্তব সত্য হল, পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর সেনা যা করে দেখিয়েছে তাতে তাদের ভূমিকা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। আসলে সাফল্য বলতে সেটুকুই। দু’মাসের বাকি ইতিহাস বরং মোদি সরকারের ব্যর্থতায় ভরা বলে মনে করে দেশের প্রায় সব বিরোধী দল। এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির দাবি উড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে তিনিই মধ্যস্থতা করেছেন এবং এ জন্য তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত। ট্রাম্পের এই দাবিকে সমর্থন করেছে পাকিস্তান। এর পরও কিন্তু মোদিবাহিনীর রক্ত গরম হচ্ছে না! কেন? ট্রাম্প মোদির ‘বন্ধু’ বলে? মোদির ‘বিশেষ বন্ধু’ ট্রাম্প আরও বলেছেন, তিনি পাকিস্তানকে ভালোবাসেন। পাকিস্তানের সামরিক প্রধানের সঙ্গে তিনি মধ্যাহ্নভোজও করেছেন। এমনকী অনেক হম্বিতম্বির পর দেখা গিয়েছে পাকিস্তানের জনগণের সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার ও বিশ্ব ব্যাঙ্ক থেকে তারা আর্থিক ঋণ পাচ্ছে। কার ‘অঙ্গুলিহেলনে’ এসব হচ্ছে তাও ভারতের অজানা নয়। ভারত কিন্তু চুপ!
ঘটনা হল, পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর পাহাড়প্রমাণ প্রশ্ন ও দেশবাসীর নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থতাকে ধামাচাপা দিতেই সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার সাহস দেখায়নি মোদি সরকার। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা দাবি করেন, পাকিস্তানের ভিতরে জঙ্গিদের গতিবিধি নাকি এই সরকারের নখদর্পণে। অথচ কী আশ্চর্য, কয়েকজন পাক জঙ্গি সীমান্তের কড়া নজরদারি পেরিয়ে কাশ্মীরে ঢুকে পড়ল, সেই রাজ্যে ঘাঁটি গেড়ে কয়েকটি দিন কাটাল, তারপর নির্দিষ্ট জায়গায় প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে পর্যটকদের পরিচয় জেনে নৃশংস হত্যালীলা চালাল, তারপর গা ঢাকা দিল এবং উধাও হয়ে গেল! দু’মাস ধরে তাদের খোঁজে হন্যে প্রশাসন! এখন জঙ্গিদের আশ্রয়দাতাদের (যারা নিন্দনীয় জঘন্যতম কাজটি করেছে) ধরে যাবতীয় ব্যর্থতা ঢেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা চলছে! আরও আশ্চর্যের যে, তাকেই ‘বড় সাফল্য’ বলে প্রচার চালানো হচ্ছে!