Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

একটি নৈশম্যাচের ধারাবিবরণী

বুক চেপে মা শুয়ে পড়তেই ঘাবড়ে যায় সরোজ। মাকে সামলাতে ব্যস্ত হয় বনানী। আর সঙ্কোচ করে না সরোজ, ফোন করে ফেলে ডাক্তারবাবুকে।

একটি নৈশম্যাচের ধারাবিবরণী
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেবতোষ দাশ: বুক চেপে মা শুয়ে পড়তেই ঘাবড়ে যায় সরোজ। মাকে সামলাতে ব্যস্ত হয় বনানী। আর সঙ্কোচ করে না সরোজ, ফোন করে ফেলে ডাক্তারবাবুকে। মা যখন অস্থির-অস্থির করছিল, বালিশ থেকে মাথা তুলে উঠে বসেছিল সটান, তখনই ভেবেছিল ফোন করবে, কিন্তু করতে গিয়েও করেনি। রাত সোয়া একটায় ফোন করলে কোন ডাক্তার আজকাল ফোন ধরেন! দোষ তাঁদের দেয় না সরোজ, তাঁরাও তো মানুষ! সারাদিনের ধকলের পর সামান্য ঘুম কি তাঁদের প্রাপ্য নয়! এইসব সাতপাঁচ ভেবে, সঙ্কোচে ডাক্তারবাবুর নম্বরে আর আঙুল ছোঁয়াতে পারেনি। কিন্তু মায়ের অবস্থা দেখে এবার আর দোনামনা করে না, ফোন করে বসে ডাক্তারবাবুকে। ধরবেন না-ই ভেবেছিল, কিন্তু তাকে বিস্মিত করেই তিনবার রিং হওয়ার পরপরই ফোন ধরেন ডাক্তারবাবু। এলাকার পরিচিত চিকিৎসক, সুনামও আছে। 

Advertisement

‘হ্যাঁ, বলুন সরোজবাবু?’
‘সরি ডাক্তারবাবু, এত রাতে—’
দুঃখপ্রকাশ দিয়ে শুরু করে গড়গড় করে সব বলে সরোজ। মন দিয়ে শুনে ডাক্তারবাবু বললেন,
‘দেড় কিলোমিটার দূর থেকেও আমি বাজি ফাটার আওয়াজ পাচ্ছি, আর আপনার বাড়ি তো পাশেই!’ 
‘গত তিনদিন ধরে চলছে! বারোটার মধ্যে অন্যদিন চুকেবুকে যায়, আজ ফাইনাল, বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত! ডিজের সঙ্গে আতসবাজির প্রদর্শনীও চলছে!’ 
মায়ের কি হার্টের প্রবলেম আছে?’
‘ন-নাহ্‌, কিন্তু— ’
‘না থাকলেও সমস্যা হবে, সিক্সটি ডেসিমেলের ওপরে শব্দ হলেই মানুষের স্ট্রেস ট্রিগার্ড হয়—হার্ট রেট বেড়ে যায়, বিপি বেড়ে যায়, আর ডিজে সাউন্ড তো একশো দশ ডেসিবেল! তার সঙ্গে আবার বাজি! নাগাড়ে এই আওয়াজের মধ্যে থাকলে হার্ট অ্যাটাক বা সেরিব্রাল স্ট্রোকও হয়ে যেতে পারে!’
‘আ-আমি ক্‌-কী—’ বিহ্বল সরোজ তোতলায়।
‘ঘাবড়াবেন না! এত রাতে আর কী করবেন! বাড়িতে তুলো আছে নিশ্চয়ই, মায়ের কানে দিয়ে দিন। বাজি বা ডিজে তো আর আপনি বন্ধ করাতে পারবেন না, কিছু বললে কাল থেকে আপনার ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দেবে!  
দুই
ডাক্তারবাবুর কথামতো কানে মোটা করে তুলো দিয়ে মা-কে শুইয়ে দিল সরোজ। মাঝে মাঝে শব্দবাজির দাপটে গোটা অ্যাপার্টমেন্টই কেঁপে-কেঁপে উঠছে, কাঁপছে জানলার শার্সিগুলোও। অন্য ফ্ল্যাটের কারও কোনও হেলদোল আছে বলে মনে হচ্ছে না, সবাই দিব্যি সয়ে নিয়েছে!
‘ডাক্তারবাবু ভুল কিছু বলেননি— দেশটা সত্যি-সত্যিই ইতরদের হাতে চলে গেছে!’ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে বনানী। খানিকক্ষণ চুপ থেকে ফের বলে, ‘তুমি বেরিয়ে একবার দেখ— বাপ্পা ওদের কর্মকর্তা– ডেকে বল, তোমরা কী চাও, তোমাদের ফুর্তির চোটে আমার মা মারা যাক!’ 
‘ওকে এখন পাব কোথায়?’ কিছুটা বোকার মতোই বলে বসে সরোজ। 
‘গিয়ে দেখ না! ঘরে বসে কী পাবে নাকি!’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে বনানী।
‘দাঁড়াও ফোন করি!’
ফোনে পাওয়া যায় না বাপ্পা নামক কর্মকর্তাকে। নীচে নামে সরোজ। হাঁ করে মোচ্ছবের লাইভ দেখছে নিরাপত্তারক্ষী। সরোজকে দেখে এক গাল হেসে দরজা খুলে দেয়। 
থিকথিক করছে লোক। এর মধ্যে কোথায় সে খুঁজে পাবে বাপ্পাকে। মঞ্চের দিকে একবার তাকায়। ঘোরাঘুরি করছে প্রচুর লোক। মরিয়া সরোজ ভিড় ঠেলে চেষ্টা করে এগতে। ওই তো, মস্ত মঞ্চের ওপরেই কথা বলছে বাপ্পা। গলা ও হাত উঁচিয়ে সরোজ একবার বা-প্‌-পা-আ-আ-আ বলে খানিক চেঁচায়, তুমুল ভিড় ও আওয়াজে সেই আকুল ধ্বনি হারিয়ে যায়। বাপ্পাও হারিয়ে যায় মঞ্চ থেকে। ভিড় থেকে বেরিয়ে ফের ফোন করে সরোজ। কিন্তু রিং হয়ে যায়, ধরে না বাপ্পা।
ফ্ল্যাটে ঢুকে জানায় বনানীকে। মুহূর্তে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বনানী। 
‘তুমি থানায় ফোন কর!’
‘থানা!’
হতবুদ্ধি সরোজের ওপর আর নির্ভর না করে নিজেই ফোন তুলে নেয় বনানী। তৎক্ষণাৎ ফোন তোলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিসকর্মী এবং ফোন করার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। নাম-ঠিকানা সব গড়গড় করে বলে দ্রুত মূল অভিযোগে আসে বনানী।
‘খবর নিয়েছি, একটু পরেই শেষ হয়ে যাবে।’  
‘এটা বলা আপনার কাজ নয়! বেআইনি কাজ হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে ইমিডিয়েট ব্যবস্থা নেওয়া আপনাদের কাজ! কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?’ বনানী তীক্ষ্ণ। ‘আরে আপনাকে বললাম তো, কিছুক্ষণের মধ্যে সব ফিনিশ হয়ে যাবে!’
‘তার আগে তো আমার বিরাশি বছরের শাশুড়ি ফিনিশ হয়ে যাবে, তখন কী হবে? আপনার নাম কী? কী পোস্ট হোল্ড করেন?’
‘নামে আপনার কাজ কী? খবর দেওয়ার দিয়ে দিলাম!’
‘পুরো কথোপকথনটা রেকর্ড করছি, একটু পরেই সবটা সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দেব! খবর দেওয়া পুলিসের কাজ?’
‘প-প্লিজ হোল্ড করুন!’ মুহূর্তের মধ্যে যেন সাপ নামিয়ে নিল ফণা। ‘আমি আমার সিনিয়রকে দিচ্ছি— কথা বলুন—’ পালিয়ে বাঁচেন পুলিসকর্মী। ‘হ্যালো!’ ফোনে ঊর্ধ্বতন পুলিসকর্মী।
‘রাত দশটার পর, রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় সাউন্ডের পারমিসিবল লিমিট কত, জানেন? পঁয়-তাল-লিশ ডেসিবেল! নিষিদ্ধ বাজি ফাটানো হচ্ছে লাস্ট দেড় ঘণ্টা ধরে, কী করছেন আপনারা!’ কেটে কেটে বলে বনানী।  
‘দেখুন ম্যাডাম, সবই বুঝতে পারছি— আসলে বুঝতেই পারছেন— মঞ্চে কেবল কারেন্ট এমএলএ নেই, প্রাক্তন এমএলএ আছেন! অল পার্টি কমিটি— সবাই মিলে এলাকায় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করছে— লোকাল বিনোদন—’
‘আপনাদের আনন্দের জন্য অন্যজনের মৃত্যু ডেকে আনবেন! আমার শাশুড়ির যদি আজ কিছু হয়ে যায়, একটা লোককেও ছাড়ব না, সে যত বড় হনুই হোক!’
‘ম্যাডাম, আমি দেখছি— আপনাকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে জানাচ্ছি—’
‘আপনার দৌড় আমার বোঝা হয়ে গেছে— আমি কী করি এবার দেখুন!’
মুখের ওপর ফোন কেটে দিয়ে দরজা খুলে ব্যালকনিতে যায় বনানী। বিহ্বল সরোজও যায় তার পিছু পিছু। অসংখ্য মানুষ, আলো, শব্দ আর ধোঁয়াভরা মাঠের দিকে পিছন ফিরে, নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে বনানী শুরু করে দেয় লাইভ। নিজের নাম এবং কোথা থেকে বলছে, জানিয়ে দেয় শুরুতেই। বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দিতে ঠান্ডা মাথায় কথা বলে যায় নাগাড়ে।  
‘এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না! আজ তিনদিন ধরে ক্রিকেটের নামে এই ডিজে মোচ্ছব সহ্য করেছি, আজ সহ্যের সীমা পেরিয়ে গিয়েছে বলেই এই লাইভ করতে বাধ্য হচ্ছি। এখন শনিবারের রাত, বাজে পৌনে দুটো, এক্সিস্টিং সমস্ত নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তীব্রভাবে ডিজে ও বাজি ফাটানো চলছে! আমার বিরাশি বছরের শাশুড়ি এই ভয়ানক শব্দের চোটে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন! এই লাইভের মাধ্যমে আমি মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিসসহ সকলকে করজোড়ে অনুরোধ করছি, যারা এই অনাচার করছে রেসিডেন্সিয়াল এলাকায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিন— আমার বৃদ্ধা শাশুড়িকে বাঁচান!’ 
মাঝে একবার ঘরের ভিতরে গিয়ে শয়নরত শাশুড়িকেও ধরে ক্যামেরায়। পৌনে দুটোর গভীর রাতেও মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে সময় নেয় না বিচার প্রার্থনার সেই দৃশ্য। দ্রুত ভাইরাল হয় সেই ভিডিও। প্রশাসনের তাবড়-তাবড় নাম ট্যাগ করে অনেকেই নিজের টাইমলাইনে ভাগ করে নেয় বনানীর বার্তা। লাইভ শেষ করে বিছানায় এসে বসে। জল কতদূর যাবে, আশঙ্কায় মাথা নিচু করে বসে থাকে সরোজ। আরও মিনিট দশেক পরে দুটো নাগাদ শেষ হয় শব্দের তাণ্ডব। শান্ত হয় চারপাশ। বনানী চোখ বুজে বসে থাকে সোফায়। ঘুমোনোর আয়োজন আপাতত দফারফা।   
তিন
পরদিন সকালে ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে সরোজের। বাপ্পা। ধড়মড় করে উঠে ধরে ফোন। 
‘দাদা, সাড়ে দশটা নাগাদ যাচ্ছি— আছ তো বাড়িতে?’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ আছি—’
ফোন ছেড়ে সরোজ বসে থাকে বিছানায়। আসন্ন বিপন্নতার ইঙ্গিত আতঙ্কিত করে সরোজকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি মেসেজ করে অনেকে যোগাযোগ করতে চান। বুঝেশুনে, বাছাই করে কয়েকজনকে ফোন নম্বর দেয় বনানী। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিকও আছেন। আটটার পর থেকে পরপর ফোন ঢুকতে শুরু করে বনানীর নম্বরে। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল অডিও বাইটে সন্তুষ্ট হয় না, বনানীকে লাইভে ধরতে চায়। তাদের দাবি সাধ্যমতো মেটাতে চেষ্টা করে বনানী। লোকে ঘুম থেকে উঠেই এই দৃশ্য দেখে তেড়ে গালাগাল করছে প্রশাসনকে। 
থানা থেকে বড়বাবু চলে আসেন গাড়ি হাঁকিয়ে। এসে কুশল জিজ্ঞেস করেন। বনানী মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে!’ হেঁ-হেঁ করেন বিপন্ন বড়বাবু। সরোজ তাঁর থেকেই জানতে পারে, প্রবল খেপে গিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ফোন করেছিলেন এসপিকে, এসপিসাহেব বড়বাবুকে হুকুম করেছেন সোজা বনানীদেবীর বাড়িতে গিয়ে দেখা করে আসতে। 
 (খ) পাতার পর
সাড়ে দশটার আগেই দলবল নিয়ে ঢোকেন এমএলএ, সঙ্গে বাপ্পাও। হাতে একঝুড়ি ফল, হেলথ ড্রিঙ্ক আর মস্ত এক ফুলের তোড়া।  
‘আপনার মা কেমন আছেন একবার দেখতে চাই— ওনার কাছে ক্ষমা চাইতেই এসেছি আমি!’ 
সরোজের সঙ্গে মায়ের ঘরে ঢোকেন এমএলএ। ঘুমন্ত বৃদ্ধার পায়ের কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফের বসার ঘরে এসে বসেন। সরোজ বোঝে পর্বতপ্রমাণ চাপ আছে এমএলএ-এর মাথায়। 
‘বনানীদেবীর কাছে ক্ষমা তো চাইবই— ম্যাডাম একটা আবদারও আছে আমাদের!’
বলেই বাপ্পার দিকে তাকান এমএলএ, একগাল হাসে বাপ্পা। 
বিস্মিত বনানী এমএলএ-এর দিকে চায়। 
‘আমাদের প্ল্যান আছে, পরেরবার আমরা শুরু করছি মেয়েদের টুর্নামেন্ট— বনানীদেবী আপনি থাকবেন মাথার ওপরে কমিটির প্রেসিডেন্ট হয়ে— না করবেন না প্লিজ!’ বাকরুদ্ধ বনানী। চোখ যায় সরোজের দিকে। সরোজের মুখে কি স্বস্তির আভাস?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ