পি চিদম্বরম: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট ‘মনরো মতবাদ’ ঘোষণার দুশো বছর পর, এবং তার ক্ষমতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তর সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট এই মতবাদটি প্রয়োগ করেছেন। আমার মনে হয়, আজকের পরিস্থিতিটা ১৮২৩ সালে কল্পনাও করা হয়নি।
প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর নামাঙ্কিত মতবাদটি আমেরিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলিকে সতর্ক করেছিল। ২০২৬ সালের ২/৩ জানুয়ারি রাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মতবাদের প্রতিটি মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে আমেরিকার একটি সার্বভৌম দেশে তিনি আক্রমণ করেছেন। সে-দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে বন্দি করেছেন এবং বিচারের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছেন নিউইয়র্কের একটি ফৌজদারি আদালতে। এটি ছিল মনরো মতবাদের এক বিস্ময়কর সম্প্রসারণ। কোনও বিদেশি শক্তি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি। ভেনেজুয়েলার জনগণই নিকোলাস মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছিল। তবে হ্যাঁ, ওই নির্বাচনের ফলাফল ছিল ভয়ানক বিতর্কিত। মিস্টার মাদুরো হয়তো অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু তিনিই প্রথম কোনও নির্বাচিত শাসক নন যিনি এমনটি হয়ে উঠেছিলেন।
আধিপত্যবাদী প্রেসিডেন্টরা
এই নতুন মতবাদটির ‘বুশ-ট্রাম্প ডকট্রিন’ আখ্যা পাওয়া উচিত। এর নিকটতম দৃষ্টান্ত ছিল পানামায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ (১৯৮৯)। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়রের অধীনে মার্কিন সামরিকবাহিনী পানামা আক্রমণ করেছিল। তাতে পরাজিত হয় ওই দেশের বাহিনী। পানামার প্রেসিডেন্ট নোরিয়েগা বাধ্য হয়েছিলেন ভ্যাটিকানের দূতাবাসে আশ্রয় নিতে। শেষমেশ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণই করেন। শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমেরিকায় নতুন ‘শেরিফ’ বা মাতব্বর হয়ে ওঠে।
প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়র ইরাকের শেরিফ হয়েছিলেন এবং তিনজন প্রেসিডেন্ট (বুশ জুনিয়র, ওবামা এবং ট্রাম্প) ধারাবাহিকভাবে হয়ে উঠেছিলেন আফগানিস্তানের শেরিফ। ইরাকের ক্ষেত্রে (২০০৩) একটি মিথ্যা হুমকি ‘আবিষ্কার’ করা হয়েছিল যে তাদের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লুএমডি) আছে! অন্যদিকে, আফগানিস্তানে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে মার্কিন আগ্রাসন চালানো হয়েছিল ২০০১-২০২১ সালের মধ্যে। তার জন্য আল-কায়েদা ও তালিবান ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ করার অজুহাত দেওয়া হয়েছিল। উভয় যুদ্ধেই ভয়াবহ ব্যর্থতা সঙ্গী হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিকতম ঘটনায়, প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে মাদক পাচার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক চোরাচালানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই সমস্ত অভিযোগের সমর্থনে এখনও কোনও যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ উপস্থিত করেনি তারা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা থেকে এটা পরিষ্কার যে, ভেনেজুয়েলার তৈলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণের জন্য মিস্টার মাদুরোকে বলির পাঁঠা করা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম তৈলভাণ্ডার মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। দেশটি তেল রপ্তানি, অস্ত্র আমদানি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের দিকে ঝুঁকছিল। অন্যকোনও দেশের, বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের মতো রাষ্ট্রের, ভেনেজুয়েলায় বিশেষ অর্থনৈতিক স্বার্থ পূরণ হবে, যুক্তরাষ্ট্র তা কোনওমতেই বরদাস্ত করবে না। বিশেষ করে তৈলসম্পদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘সংরক্ষিত’ বলেই মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন মার্কিনি স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মিস্টার মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার অব্যবহিত পরেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অকপটে বলেছিলেন যে, বৃহৎ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলিকে ভেনেজুয়েলার তেল ‘উৎপাদন ও বিক্রয়’ এবং ‘অর্থ উপার্জন’ করার অনুমতি দেওয়া হবে।
প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে ভারত
‘অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ সাংকেতিক নামের চার ঘণ্টার এই অভিযানটি ছিল মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের এক প্রদর্শন। গভীর রাতে অন্য একটি দেশে প্রবেশ করে প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত সুরক্ষিত বাসভবন থেকে তুলে আনা হল সেই রাষ্ট্রপ্রধানকে! বলা বাহুল্য, কোনওরকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই। আমরা ভাবতাম, কেবল রূপকথায় কিংবা কল্পকাহিনিতেই এই জিনিস সম্ভব। কিন্তু আমেরিকা প্রমাণ করেছে যে, তাদের সামরিকবাহিনীও এমন একটি আপাতত অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে। বিশ্বের ইতিহাসে ভয়ংকরতম যুদ্ধযন্ত্র (মোস্ট লেথাল ওয়ার মেশিন) হল মার্কিন সামরিকবাহিনী। উদ্বেগের বিষয় এটাই যে, চীনকে বাদ দিলে, বিশ্বে নতুন মাতব্বর গজিয়ে ওঠারও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
অ্যাবসোলিউট রিজলভের আগে ও পরে ভারত ছিল সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দাবি মারফত ইতিমধ্যেই নরেন্দ্র মোদিকে দুবার অপমান করেছেন: একবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামার প্রসঙ্গে এবং দ্বিতীয়বার ট্রাম্পকে খুশি করার অভিপ্রায়ে ভারতের তরফে রাশিয়ার তেল আমদানি হ্রাসের ব্যাপারে। ট্রাম্পের ক্রোধের শিকার হওয়ার ভয়ে সরকার এতটাই ভীত যে, ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত সরকারি বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তারের নিন্দা পর্যন্ত করা হয়নি বা এমনকি এতে উল্লেখিত হয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার দিকটিও। বিবৃতিতে কেবল ‘ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি (রিসেন্ট ডেভেলপমেন্টস ইন ভেনেজুয়েলা)’র কথাই বলা হয়েছে এবং ‘সংশ্লিষ্ট সকলকে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের’ আহ্বান জানানো হয়েছে। আহা, যেন কোনও একটি ফুটবল ম্যাচের স্কোর নিয়ে গন্ডগোল থামাতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে!
এই ইস্যুতে ভারত ব্রিকস-এর পাঁচ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন। ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার বড়াই সত্ত্বেও, ভারত বিশ্ব বিষয়ে তার কণ্ঠস্বর এবং প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। একজন প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত যেমন বলেছেন, ‘ভারত যা বলবে তাতে কোনও পার্থক্য হবে না।’
সাম্রাজ্যবাদকে অবাধ ছাড়পত্র
আমি আশঙ্কা করছি যে, ‘অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ রাশিয়া এবং চীনকে অবাধ ছাড়পত্র দিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি গ্রিনল্যান্ড দখল করবেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান যদি হয়, তবে তার বিনিময়ে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে। ‘এক চীন’ নীতিকে যৌক্তিক পরিণতি দিতে প্রলুব্ধ হবে আমাদের প্রতিবেশী চীন। যদি চীন ভারতের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তে বা অরুণাচল প্রদেশে অনুপ্রবেশের আর একটি চেষ্টা করে, তবে ভারতকে নিজের সুরক্ষার জন্য লড়তে হবে একাই! ভেনেজুয়েলার তৈলভাণ্ডার নিয়ন্ত্রণ করার পর, ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি করার আগ্রহ কমে গিয়েছে। ট্রাম্প কোনও বাণিজ্য চুক্তি ছাড়াই শুল্ক নিয়ে খেলা করেন। ভারতের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি। ট্রাম্প তাঁর দেশে কম বা বেশি পণ্য প্রবেশ করতে দিতে পারেন নিজের মর্জিমাফিক। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা পেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে মার্কিন ইতিহাসের ‘মোস্ট ইনটারভেনশনিস্ট প্রেসিডেন্ট’ প্রমাণ করেছেন। তাঁর আগ্রাসনের তালিকায় রয়েছে প্যালেস্তাইন, ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া এবং এখন ভেনেজুয়েলা। এটি স্বঘোষিত নতুন শেরিফের কুৎসিত রূপ। আমরা হয়তো মিস্টার মাদুরো বা তাঁর স্ত্রীর জন্য এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলব না। তবে সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যাবর্তন এবং পরিণামে রাষ্ট্রগুলির (নেশন) সার্বভৌমত্বের বিলুপ্তিতে আমাদের শোক প্রকাশ করা উচিত।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত