পূর্ণাঙ্গ বাজেট নয়, মাত্র চার মাস (এপ্রিল-জুলাই)-এর জন্য ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব। তাতেই রাজ্যের সব স্তরের মানুষের কাছে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ হয়ে ওঠার বার্তা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র পাঁচ দিন আগে ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে যে বাজেট পেশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার, তাতে বিরোধী শাসিত পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্তি কার্যত ‘শূন্য’। এরাজ্যকে ভাতে মারতে মমতা সরকারের ন্যায্য প্রাপ্য প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রেখেছে মোদি সরকার। তবু রাজ্যের সাড়ে দশ কোটি মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে লড়াই চালাতে যে সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে তৃণমূল সরকার, ২০২৬-২৭-এর অন্তর্বর্তী বাজেটেও সেই ধারা অব্যাহত থাকল। বরং সামাজিক সুরক্ষার পরিসর আরও বাড়ল। বাংলার মহিলা, যুব, কৃষক, খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ, খেতমজুর, গিগকর্মী, শিক্ষাবন্ধু থেকে সরকারি কর্মচারী সহ সব স্তরের মানুষের কাছে সরাসরি আর্থিক সাহায্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এতদিন ৯৪টি সামাজিক প্রকল্প চালু ছিল। এবার তা সেঞ্চুরি ছাড়াল। একথা ঠিক যে, একটি রাজ্যের সুসংহত উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি, সর্বোপরি পরিকাঠামো ক্ষেত্রে উন্নয়ন জরুরি। সেই কাজ থেমে না থাকলেও আরও উন্নতি করার অনেক সুযোগ রয়েছে। আশা করা যায়, বিধানসভা ভোটের পর নতুন সরকার এসে সেদিকে আরও বেশি করে নজর দেবে। কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সামাজিক প্রকল্পগুলির মাধ্যমে নগদ পৌঁছে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, যা একদিকে বাজারকে সচল রাখছে। অন্যদিকে, রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বৃদ্ধির হারকে ত্বরান্বিত করছে। তাই রাজনীতির বিচারে এই বাজেট হয়তো ভোটমুখী মনে হতে পারে, কিন্তু এর ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবও অস্বীকার করা যাবে না।
রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট নিয়ে বিরোধীদের হা-হুতাশ অবশ্য অব্যাহত। তাদের মূল অভিযোগ হল, এই বাজেটে কর্মসংস্থানের কোনো কথা নেই। সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে যথেচ্ছ খরচের ব্যবস্থা হলেও আয়ের কোনো দিশা নেই। সত্যিই কি তাই? পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে রাজ্যে বেকারত্ব কমেছে ৪৫-৬৫ শতাংশ। এই আমলে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮ গুণ। এর ফলে সাধারণ মানুষের হাতে নগদের জোগান বেড়েছে, যার পরিণতিতে জিএসটি আদায়ের হারও ক্রমবর্ধমান। পাশাপাশি, রাজ্যের নিজস্ব কর বাবদ আয় বেড়েছে ৫.৬২ গুণ। এই আয় বৃদ্ধির ফলে রাজ্যের রাজস্ব ও আর্থিক ঘাটতি আগামী বছর তুলনামূলকভাবে কমবে বলে আশা করা যায়। তথ্য আরো বলছে, গত ১৫ বছরে বাজেট বৃদ্ধি হয়েছে ৫ গুণ। পরিকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ৯.৮৪ গুণ। কৃষি ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ১২.৮৪ গুণ। প্রায় ১.৭২ কোটি মানুষকে দারিদ্রসীমার বাইরে আনা সম্ভব হয়েছে। রাজ্যের ঋণের বোঝাও কিছুটা কমেছে। দেখা যাচ্ছে, গত বাজেটের তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি ৩.৭৫ থেকে কমে ১.০১ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি ৪.৪৩ শতাংশ। রাজ্যের দাবি, দায়িত্বশীল অর্থব্যবস্থার জেরেই এই উচ্চতায় পৌঁছতে সফল হয়েছে রাজ্য।
অন্তর্বর্তী বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ভাতা বৃদ্ধি, যুবসাথী নামে শিক্ষিত বেকারদের নতুন ভাতার প্রকল্প যদি চমক হয়, তাহলে পরিকাঠামো উন্নয়নে রাজ্যের ছোটো শহরগুলির আধুনিকীকরণের ঘোষণা এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। রাজ্যের এমন ২৬টি শহরকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার সর্বাঙ্গীণ আধুনিকীকরণ হবে। শহরগুলির বাসিন্দাদের স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসা ও পরিবেশ বান্ধব পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। পরিকাঠামোর এই সামগ্রিক আধুনিকীকরণ কর্মসূচির বাস্তবায়নে বাজেটে মূলধনী ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক শহরের নকশা তৈরি করতে একটি কমিটি তৈরি হবে, যারা চলতি বছরের মধ্যেই সরকারকে রিপোর্ট দেবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বণিকমহল। তাদের কথায়, মূলত দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির শহরগুলির উন্নয়ন হলে রাজ্যের সার্বিক পরিকাঠামো অনেক উন্নত হবে। এছাড়াও রাজ্যে ৬টি শিল্প-করিডর হবে। জলপাইগুড়ি, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদে হবে ৫টি ক্ষুদ্রশিল্পতালুক। সন্দেহ নেই, বাজেটে সরকারের এমন কল্পতরু হয়ে ওঠার পাশাপাশি শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়নের ঘোষণা আগামী দিনে এক নতুন পশ্চিমবঙ্গের জন্ম দেবে। এই অন্তর্বর্তী বাজেট তাই সাধারণের কাছে গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস।