Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

রং তুলিতে সমর্পিত জীবন

রামকিঙ্কর বেইজের শিষ্যা তিনি। আঁকা আর মূর্তি গড়ার কাজেই জীবন সঁপে দিয়েছেন। তাঁর একক প্রদর্শনী আয়োজিত হবে বিড়লা অ্যাকাডেমিতে।

রং তুলিতে  সমর্পিত জীবন
  • ২৯ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রামকিঙ্কর বেইজের শিষ্যা তিনি। আঁকা আর মূর্তি গড়ার কাজেই জীবন সঁপে দিয়েছেন। তাঁর একক প্রদর্শনী আয়োজিত হবে বিড়লা অ্যাকাডেমিতে।

Advertisement

 

শান্তিনিকেতনে প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিরণ দীক্ষিত, কাগজ কলম না পেলে মাটিতে আঁচড় কেটেও ছবি আঁকতেন। ছোটবেলা থেকেই আঁকার প্রতি তাঁর এমনই টান। প্রখ্যাত শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের একমাত্র জীবিত শিষ্যা কিরণ দীক্ষিত থ্যাকার। হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুতো ভাইবোনদের আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্ট বিষয়ের সব কিছুই তৈরি করে দিতাম নিজে হাতে। পরিবর্তে তারা আমার অঙ্ক হোমওয়ার্ক করে দিত। জীবনের অনেক কঠিন থেকে কঠিনতর মুহূর্তেও আঁকাই আমার প্রধান ও প্রথম সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ নিজেকে রং তুলি আর মাটির মধ্যেই রাখেন অশীতিপর কিরণ। বললেন, ‘এই দীর্ঘ জীবনে রং তুলি আর মাটির তালই আমার সেরা সঙ্গী। এভাবেই  জীবনের বাকি দিনগুলোও কাটিয়ে দিতে চাই।’ কথায় কথায় তাঁর গুরুর প্রসঙ্গ উঠতে আবেগে আচ্ছন্ন হলেন কিরণ। বললেন, ‘কিঙ্করদার (রামকিঙ্কর বেইজ) সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তই যেন শিল্পের খণ্ডচিত্র। অনেক ছোটবেলা থেকেই সহযোগিতা করেছি তাঁর কাজে। মনে আছে আমি যখন তরুণী, তখনও কিঙ্করদা আমায় নিজের শিল্পের সঙ্গী করে নিতেন। মূর্তি গড়ার আগে মাটি প্রস্তুত করতে হয়। ওঁর কাজের আগে মাটির তাল তৈরি করে দিতাম আমি।’ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ছাত্রী কিরণ। সেখানেই বিভিন্ন গুণী শিল্পীর সান্নিধ্যে এসেছেন তিনি। রামকিঙ্করের শিষ্যা হিসেবে পরবর্তীতে কলাবিদ্যা চর্চা করেন। বললেন, ‘কিঙ্করদা খুব কড়া শিক্ষক ছিলেন। আমরা ক্লাসে রীতিমতো ভয় পেতাম তাঁকে। যতক্ষণ পর্যন্ত আঁকা সঠিক না হতো, ততক্ষণ আঁকিয়ে যেতেন আমাদের দিয়ে। লাইনগুলো সঠিক হওয়া চাই, মুখের ভাঁজ, রেখা, অভিব্যক্তি সব একেবারে নিখুঁত হতে হবে। নাহলেই কিঙ্করদার কাছে ফেল! কীভাবে কয়েকটা লাইন এঁকে তার মাধ্যমেই একটা চরিত্র ফুটে উঠবে তা ওঁর কাছেই শেখা।’ শুধু তাই নয়, জমিদার বাড়িতে গিয়ে সেখানকার চরিত্র স্টাডি করতে বলতেন রামকিঙ্কর তাঁর ছাত্রছাত্রীদের। সেই সূত্রেই বিভিন্ন আর্ট এক্সকার্সনে গিয়েছেন কিরণ তাঁর গুরুর সঙ্গে। ‘আমাদের ক্লাসে একটি মেয়ে ছিলেন— মণিমালা, ওঁর আঁকার স্টাইলও বিশেষ পছন্দ করতেন কিঙ্করদা। ওঁকে আর আমাকে নিয়ে জমিদার বাড়িগুলোয় গিয়ে সেখানকার পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে ক্লাস নিতেন। প্রাণহীন জিনিসেরও যে চরিত্র থাকে, তা কিঙ্করদাই প্রথম দেখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, জমিদার বাড়ির সিঁড়ি, সেখানকার ঘর, ঠাকুরঘর, হেঁশেল, দরবার, খাসমহল— সবই যেন এক একটা গল্প বলে। সেই মতো আঁকলে প্রতিটি বস্তু একে অপরের চেয়ে আলাদা হয়ে ধরা দেবে চোখে।’ 
নিজেকে অনেকের মাঝে উল্লেখযোগ্য করে তোলার কায়দাটাও তাঁর কাছেই শেখা। কিঙ্করদা বলতেন, ‘ক্লাস নিতে হলে শিক্ষককে ছাত্রদের মাঝে থেকেও নিজস্বতা বজায় রাখতে হয়। নাহলে ভিড়ের মাঝে মিশে যাবি।’ পরে এই শিক্ষা কিরণের শিক্ষক জীবনেও বহু কাজে লেগেছে।  লন্ডনে পড়াতে গিয়েও এই বাচনভঙ্গিই অনুসরণ করেছেন কিরণ। তাঁর কথায়, ‘কিঙ্করদার দুঃখ ছিল তাঁর ছাত্রীরা অধিকাংশই পরে গৃহিণী হয়ে গিয়েছেন। তাঁর কাছে অর্জিত বিদ্যাকে কাজে লাগাতে পারেননি। আমি কিন্তু তখনও তাঁকে বলতাম, কাজ করব। প্রতিষ্ঠিত ভাস্কর হয়ে উঠব। এত বয়সেও প্রদর্শনী করছি। ২ ও ৩ এপ্রিল বিড়লা অ্যাকাডেমিতে আমার প্রদর্শনী হবে। এটাই আমার গুরুদক্ষিণা।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ