Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গণতন্ত্র ও সংবিধানের বিরাট জয়

সুপ্রিম কোর্টের রায়কে হাতিয়ার করে শনিবার রাজ্যপালের স্বাক্ষর ছাড়াই দশটি বিলকে আইনে পরিণত করল তামিলনাড়ু। সেইমতো বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে সরকার।

গণতন্ত্র ও সংবিধানের বিরাট জয়
  • ১৪ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুপ্রিম কোর্টের রায়কে হাতিয়ার করে শনিবার রাজ্যপালের স্বাক্ষর ছাড়াই দশটি বিলকে আইনে পরিণত করল তামিলনাড়ু। সেইমতো বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে সরকার। দেশে এই প্রথম আইনসভায় পাস হওয়া কোনও বিল রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়াই আইনে পরিণত হল। এই তালিকায় রয়েছে তামিলনাড়ু বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধনী আইনও। ওই বিজ্ঞপ্তির বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের রায়কেই বিলগুলির পক্ষে সম্মতি বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। আইনসভায় পাস হওয়া বিল অনন্তকাল ধরে আর আটকে রাখতে পারবেন না রাষ্ট্রপতি। তিনমাসের মধ্যেই তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমনকী, বাড়তি সময়ের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট রাজ্যকে তার কারণ জানাতেও বাধ্য থাকবে রাষ্ট্রপতি ভবন। এমনই বেনজির এই রায় দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিবেচনার জন্য রক্ষিত যেকোনও বিলে মতামত জানানোর প্রশ্নে এই প্রথম রাষ্ট্রপতির জন্যও সময়সীমা নির্দিষ্ট করা হল। সৌজন্যে দক্ষিণী ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ রাজ্যের নির্বাচিত সরকার-রাজ্যপাল দ্বৈরথ। বিধানসভায় সত্ত্বেও দশটি বিল রাষ্ট্রপতির বিবেচনার অছিলায় ঝুলিয়ে রেখেছিলেন রাজ্যপাল আর এন রবি। তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য। রাজ্যপালের কাজকে মঙ্গলবার ‘অসাংবিধানিক’ দেগে দিয়েছিল কোর্ট। ওই মামলারই বিস্তারিত রায় প্রকাশিত হয়েছে শুক্রবার। বিল নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রপতির জন্যও তিনমাসের সময়সীমা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। 

Advertisement

এই পদক্ষেপে আশার আলো দেখছে পশ্চিমবঙ্গসহ অনেক বিরোধী রাজ্য। কেননা, সিঙ্গল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিকে বেকায়দায় ফেলতে কিংবা অপদস্থ করতেই ‘কেন্দ্রের এজেন্টরূপী’ একাধিক রাজ্যপাল বহু বিল নির্বিচারের আটকে রেখেছেন বলে বিরোধী সরকারগুলির অভিযোগ। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গের নাম। বাংলার বিধানসভায় পাস হওয়া সত্ত্বেও ধর্ষণ-বিরোধী অপরাজিতা বিল, গণপিটুনি প্রতিরোধী বিল, হাওড়া মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যামেন্ডমেন্টের মতো ২২টি বিল দীর্ঘদিন ধরে সম্মতির অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে রাজভবনে। রাজ্যপালের মর্জির তোয়াক্কা ছাড়াই এবার সেগুলিও আইনে পরিণত করা যাবে কি? বিষয়টি নিয়ে এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ভীষণই ক্ষুব্ধ। স্ট্যালিনের বেনজির পদক্ষেপ মমতাকেও নিশ্চয় ভাবাচ্ছে বলে অনুমান রাজনৈতিক মহলের। প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য, নির্দিষ্ট সময়ে বিল ছাড়া জরুরি। না-হলে উন্নয়নমূলক প্রকল্প রূপায়ণ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পর্যন্ত বহু কাজে বিস্তর সমস্যা হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বহুকালের সেই জট এবার কাটবে। সংবিধানের ২০১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাজ্যপাল কোনও বিলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তা রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য পাঠাতে পারেন। তখন রাষ্ট্রপতিকে সেই বিলে সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানাতে হয়। সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংবিধানে কোনও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তামিলনাড়ু সরকারের দায়ের করা মামলার রায়ে ওই প্রেক্ষিতকেই সামনে আনে বিচারপতি জে বি পার্দিওয়ালা এবং আর মহাদেবনের বেঞ্চ।
রায়টিতে সাফ বলা হয়েছে, ২০১ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতির পালনীয় কর্তব্য বিচারবিভাগের পুনর্মূল্যায়ন সাপেক্ষে সংশোধনযোগ্য। রাষ্ট্রপতির কোনও ‘পকেট ভেটো’ নেই। তাই বিলে তিনি হয় সম্মতি জানাবেন, নয়তো খারিজই করবেন। যুক্তিসঙ্গত সময়সীমার মধ্যেই তাঁকে সিদ্ধান্তটি নিতে হবে। ওই সূত্রেই নজিরবিহীনভাবে রাষ্ট্রপতির জন্য তিনমাসের সময়সীমা বেঁধে দিল শীর্ষ আদালত। এটা হল গতির যুগ। সেদিক থেকে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সর্বোচ্চ আদালত মত ব্যক্ত করেছে গতির পক্ষেই। সংস্কার, উন্নয়ন প্রভৃতি থমকে যাওয়া কিংবা শ্লথগতিসম্পন্ন হয়ে পড়ার জন্য বরাবর কাঠগড়ায় ওঠে লালফিতার ফাঁস। বিশেষ করে, শিল্প-বাণিজ্য স্থাপন প্রক্রিয়াকে যন্ত্রণামুক্ত করে তোলার জন্য সরকারি ক্ষেত্রে ‘এক জানালা’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। শুধু শিল্প-বাণিজ্যই নয়—শিক্ষা, প্রশাসন, আইন ও বিচার ব্যবস্থাসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে গতিসঞ্চারই কাম্য। বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচিত সরকারগুলি সংশ্লিষ্ট বিধানসভায় কিছু বিল পাস করায় এমনই কিছু মহৎ উদ্দেশ্যে। পদক্ষেপগুলি নির্বাচিত সরকারের তরফে হওয়ায় সেগুলির পিছনে জনগণের ইচ্ছা এবং জনকল্যাণের উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে বলে মনে করার সংগত কারণ থাকে। তাই বিলগুলি আইনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে রাজভবন কিংবা রাষ্ট্রপতি ভবন অন্তরায় হয়ে উঠুক, সুপ্রিম কোর্টও তা চায়নি। এই রায় পরিষ্কার করে দিয়েছে সেটাই। রাজ্যের তরফে আইন প্রণয়ন এবং সংশোধনের প্রশ্নে আইনি লড়াইতে তামিলনাড়ু সরকারের এই জয় নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। এই জয় শুধু স্ট্যালিন সরকারের নয়, সব রাজ্যের, বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্রের এবং ভারতের মহান সংবিধানেরও।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ