Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পূর্ণ পবিত্র বিচার ব্যবস্থা কাম্য

অবসরের পরে বিচারপতিদের রাজনীতিতে যোগ দেওয়া উচিত কি? কিছুদিন আগে এই বিষয়ে দেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের মত জানতে চাওয়া হয়।

পূর্ণ পবিত্র বিচার ব্যবস্থা কাম্য
  • ৬ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অবসরের পরে বিচারপতিদের রাজনীতিতে যোগ দেওয়া উচিত কি? কিছুদিন আগে এই বিষয়ে দেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের মত জানতে চাওয়া হয়। শীর্ষ আদালত থেকে তিনি তখন সবে অবসর নিয়েছেন। জবাবে এই বিশিষ্ট আইনজ্ঞের সাফ কথা ছিল, অবসর জীবনে তিনি নিজে এমন কিছু করবেন না যাতে বিচারপতি হিসেবে তাঁর কাজ বা বিচার ব্যবস্থার প্রতি তাঁর আনুগত্য সম্পর্কে সংশয়ের অবকাশ তৈরি হয়। তাঁর এই বক্তব্যের ভিতরে বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বদের প্রতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা ছিল। কারণ দেশবাসী তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছে যে, বিচার ব্যবস্থাই হল তাদের সবচেয়ে বড়, এমনকী বহু ক্ষেত্রে শেষ ভরসা। ভারতের মতো ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’র মূল সমস্যা হল বৈষম্য। এক শ্রেণির মানুষ শিক্ষার সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। আবার অধিকার সম্পর্কে অবহিত হয়েও অনেক মানুষ আর্থিক এবং সামাজিক দুর্বলতার কারণে তার নাগাল পায় না। এমনই দুর্ভাগ্য যে, সকলের দাবি অভাব অভিযোগের প্রতি কর্ণপাত করে না নির্বাচিত সরকার এবং সরকারি প্রশাসন। স্বভাবতই কোটি কোটি মানুষ জীবনভর বঞ্চনারই শিকার রয়ে যায়। এই বৈষম্য বা অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিই দেশের স্বাস্থ্যকর উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। শেষমেশ বিচার ব্যবস্থাই এইসব মানুষের সহায় হলে কমতে পারে তাদের দুর্দশা। 

Advertisement

কিন্তু সেক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থার পবিত্রতা সবরকমে রক্ষা হওয়া চাই। বিচারপতির আসন অলঙ্কৃত করছেন যেসব বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, সেই দায়িত্ব বিশেষভাবে নিতে হবে তাঁদেরকেই। শুধু বিচারপতির কার্যকাল নয়, তাঁদের সমগ্র জীবন প্রশ্নাতীত হওয়াই কাম্য। গণতন্ত্রের সবক’টি স্তম্ভের সামনে বিচার ব্যবস্থাই হয়ে উঠবে সর্বজনগ্রাহ্য আদর্শ, এটাই সমাজের আকাঙ্ক্ষা। প্রাক্তন বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের বক্তব্যটি আমাদের এমনই আকাঙ্ক্ষা প্রত্যাশার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও বিচার ব্যবস্থার প্রতি বহু মানুষ যে আস্থা হারাচ্ছে, তা ফের স্পষ্ট করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই স্বয়ং। এজন্য তিনি আঙুল তুলেছেন বিচারপতিদেরই একাংশের দিকে। বুধবার ব্রিটেনে সুপ্রিম কোর্ট আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিয়ে বিচারপতি গাভাই একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তাঁদের আলোচনার প্রতিপাদ্য ছিল—‘বিচারবিভাগীয় যোগ্যতা এবং জনগণের আস্থা রক্ষা’। সেখানেই তিনি রীতিমতো তোপ দেগেছেন সেইসব প্রাক্তন বিচারপতি সম্পর্কে, যাঁরা স্বেচ্ছাবসর নিয়ে ভোটে প্রার্থী হয়েছেন কিংবা অবসরের পর কোনও বৃহৎ সরকারি পদে যোগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে সংশ্লিষ্ট বিচারপতিদের সততা ও নৈতিকতা এবং বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন ব্যক্তিরা বিচারপতি হিসেবে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বা রায় দিয়েছিলেন, সেগুলি জনগণের সন্দেহের তালিকায় থাকবে। প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ ব্যক্তিগত মুনাফা ও স্বার্থসিদ্ধির কথা ভেবেই যে ওই বিচারপতিরা রায় দেননি, তার নিশ্চয়তা কী? তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, অবসর-পরবর্তী জীবনে একজন বিচারপতির কোনও সরকারি পদ কিংবা অন্যকোনও সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা নীতিগত কারণেই নেওয়া উচিত নয়। রাজনীতিতে যোগদান তো নয়ই। 
কিন্তু কেউ কেউ এই লক্ষ্মণরেখা মানছেন না বলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। বিচারপতিদের নৈতিকতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। মত প্রকাশ করেছেন বিচারপতি গাভাই। এ঩তে শুধু বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের বক্তব্যেই সিলমোহর পড়েনি, বিচারপতি গাভাই সমস্যাটি নিয়ে আরও বেশি দূর এবং বিশদে ভেবেছেন। বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সম্পদ হল মানুষের আস্থা, বিশ্বাস, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং স্বচ্ছতা। এই স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থেই বিচারপতি গাভাই মনে করেন, বিচারপতিদের সম্পত্তির প্রকাশ্য ঘোষণা এবং যেকোনও শুনানির সরাসরি সম্প্রচার প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি যথার্থই বলেছেন, সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়া অথবা তা রক্ষা করা বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দুর্নীতির সঙ্গে আদালতের সামান্যতম সম্পর্ক থাকলে বিচার ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবেই। সাম্প্রতিক একাধিক অবাঞ্ছিত দৃষ্টান্তেই যেন দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কে ইতি পড়ে। এই প্রত্যাশা রাখব আমরা। খাতায়-কলমে ‘বৃহত্তম গণতন্ত্র’ হলেও ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’ হয়ে উঠতে ভারতকে এখনও বহু পথ অতিক্রম করতে হবে। বিচার ব্যবস্থা পূর্ণ পবিত্র হলে এই দীর্ঘ চলার ক্লান্তি আমাদের কখনও স্পর্শ করতে পারবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ