নির্বাচনি প্রচারে দিনকয়েক আগে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলার সবকটি বিধানসভা আসনে তিনিই দলের প্রার্থী। তাঁর আরজি, এই বার্তা মাথায় রেখেই যেন বাংলার মানুষ এবার তাঁদের অমূল্য ভোটটি দেন। কোনো সংশয় নেই যে, এই দৃঢ় ঘোষণায় রীতিমতো সিঁদুরে মেঘ দেখছে মোদি-শাহের পার্টি। নেপথ্যে রয়েছে আরো বড়ো সত্য: বাংলাজুড়ে বিজেপির সংগঠন দুর্বল; বিজেপি গত কয়েকবছরে নানাভাবে নিজেকে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী পার্টি হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে; কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে মোদিবাবুরা বাংলার কল্যাণে কোনোভাবে ব্যবহার করেননি, বরং নানা খাতে রাজ্যের বরাদ্দ মেরে দিয়ে গরিব মানুষের কষ্ট বাড়িয়েছেন; এছাড়া খ্যাতিবৃদ্ধির বহু সুযোগ নষ্ট করে, ধর্মীয় ইস্যুতে বাংলার বদনামই করেছেন দিল্লিওয়ালারা; সর্বোপরি ক্রনিক আকার নিয়েছে বিভেদের রাজনীতিতে নিরন্তর শান দেওয়ার ব্যাধি, যা বাংলার মতো একটি মিশ্র সমাজের কাছে কোনো যুগেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিজেপির কারো পক্ষেই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় যে, বাংলায় এবারের মেগা নির্বাচনি ইভেন্টে প্রতিপক্ষের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতার জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক সততা প্রশ্নাতীত। তৃণমূল কংগ্রেস তাঁর পরম মমতায় গঠিত এবং মা-মাটি-মানুষের স্বার্থে পরিচালিত। এই সরকারের কাছে অগ্রাধিকার নারী, গরিব এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতিত অবহেলিত শ্রেণির মানুষ। ওই সঙ্গে অবশ্যই যোগ হবে একুশ (বিধানসভা নির্বাচন) এবং চব্বিশের (লোকসভা নির্বাচন) চ্যালেঞ্জে বাংলায় গোহারা হয়েছিল গেরুয়া শিবির।
এই ইতিবৃত্ত সঙ্গী করেও বিজেপি এবার বাংলা দখলের জন্য মারাত্মক হাঁকপাক করছে। এসআইআর নামক আঘাত হেনেও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না কেন্দ্রের শাসক দল, তাই ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে দিল্লিওয়ালাদের ডেইলি প্যাসেঞ্জারি, বাংলায় যা অতিচেনা। গেরুয়া ঘুঁটি ক্রমে পেকে উঠছে ধরে নিয়েই এগোচ্ছিলেন মোদিবাবুরা। ঠিক তখনই যেন পাকা ঘুঁটি কেঁচে দিলেন বাংলার অগ্নিকন্যা, তিনি কিনা ষোলোর সুরেই ভরসা জোগালেন, ‘বাংলার সবকটি বিধানসভা আসনে আমিই তৃণমূলের প্রার্থী!’ বলা বাহুল্য, জননেত্রীর এই ঘোষণায় রাজ্যজুড়ে দলীয় সমর্থকদের মধ্যে বিপুল উন্মাদনা লক্ষ করা গিয়েছে। তখন পালটা রণকৌশল নিয়েছে বিজেপি—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনি প্রচার বন্ধের আর্জি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে তারা। কিরেন রিজিজু, পীযূষ গোয়েল, সুকান্ত মজুমদারদের মতো একঝাঁক কেন্দ্রীয় নেতা-মন্ত্রী সেদিন নির্বাচন সদনে যান। কিন্তু কোন অপরাধে মমতার বজ্রকণ্ঠ চেপে ধরবেন জ্ঞানেশ সাহেব? কিছু যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন ‘হেডস্যারের’ কাছে আজগুবি অভিযোগ জানানো হল, বাংলার নির্বাচনি প্রচারে ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী! তিনি নাকি আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। এই প্রসঙ্গেই বিজেপি শিবিরের আবদার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করুক জাতীয় নির্বাচন কমিশন। জাতীয় নির্বাচন কমিশনে বিজেপির আরো অভিযোগ, রাজ্যের পুলিস-প্রশাসন তার কর্তব্য ঠিকমতো পালন করছে না। সেই কারণে বিশেষত রাজ্যের স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে আরো বেশি করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হোক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াকেই কবজা করে নিতে চাইছে। বালুরঘাটের সাংসদ কেন্দ্রীয় শিক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের অভিযোগ, তৃণমূল নেত্রী যেভাবে ভোট প্রচার করছেন, তা ভোটারদের ভয় দেখানোরই শামিল। তাঁর দাবি, সব ‘তথ্য-প্রমাণ’ নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন তাঁরা। ভোটে পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই তৃণমূলের এই কারবার। ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাসের আবহ তৈরি করে কোনো লাভ হবে না। এবার রাজ্যে বিজেপির সরকারই তৈরি হবে।
গেরুয়া শিবিরকে তুলোধোনা করতে রাজ্যের শাসক দলও দেরি করেনি। তারাও পরিষ্কার শুনিয়ে দিয়েছে, নানাভাবে পরীক্ষিত মমতাকে এইভাবে দমানো সম্ভব নয়, তাঁর স্থান বাংলার মানুষের হৃদয়ে ইতিমধ্যেই স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গিয়েছে। কোন দল কত ভোট এবং আসন পাবে, তা বাংলার মানুষই ঠিক করবেন। তবে তার জন্য স্বচ্ছতার নীতিতে এবং নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান কাম্য। সেই আকাঙ্ক্ষা ধ্বংসের প্রক্রিয়া এসআইআর থেকেই শুরু হয়নি কি? যেভাবে পাইকারি হারে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে বাদ রেখে তালিকা চূড়ান্ত হচ্ছে, তাতে সিলমোহর পড়ছে এমন আশঙ্কাতেই। তার উপর সামনে এসেছে ভিন রাজ্যের গেরুয়া সমর্থকদের বাংলার ভোটার তালিকায় চোরাপথে ঢুকিয়ে দেওয়ার কালো বাজারি। সোজা আঙুলে ঘি তোলার ব্যর্থতা ঢাকতে বিজেপি বস্তুত নানাভাবে আঙুল বাঁকাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, মমতার ভোটব্যাংক ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে জল মেশানো বিকল্প তালিকা বানানো, যাতে মোদি-শাহের দল বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। এই চক্রান্ত ঘৃণ্য, বাংলার মানুষ এটা আগেভাগেই ধরে ফেলেছে, তারাই এটা ব্যর্থ করে দেবে যথাসময়ে।