


অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: জনশ্রুতি থেকে পুজোর রীতি, দেবীর গড়ন থেকে পুজোর সময়, এক কথায় দেবী জগদ্ধাত্রীর কিন্তু বহুমুখী প্রভাব। বাঙালি সংস্কৃতির তালে তাল দিয়ে তাঁকে ঘিরে যতই চমক থাকুক, ভাবনার মূলে আছে আরও বড়ো চমক। যা নিয়ে প্রকৃতঅর্থেই দেবতাস্বরূপ সন্ধানীদের অনন্ত ভাবনার খতিয়ান পাওয়া যায়। পুজোর মরশুমে সেসব খতিয়ে দেখতে গেলে পুজোর আড়ম্বর, আলোকসজ্জার আড়ালে এক ভিন্ন আলোর সূত্র মেলে।
একইসঙ্গে গতিমান অথচ স্থিতিশীল কোনও কিছু কি সম্ভব? না, আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে বাদ দিলে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মজা হচ্ছে জগদ্ধাত্রী সেই সোনার পাথরবাটি। গতিমান জগৎ আর থিতু হয়ে ধারণ, তিনিই তো জগতের ধাত্রী, ধারক। তাই তিনি দেবী জগদ্ধাত্রী। এত আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা। কিন্তু দৈবিক তত্ত্ব? তিনিই পরমব্রহ্মস্বরূপা। ব্রহ্মাণ্ডের গতি ও স্থিতি তাঁরই জন্য। তিনিই সৃষ্টি-স্থিতি। তিনিই সেই শক্তি যা জগৎপিতা ব্রহ্মা, পালনহার বিষ্ণু ও সংহারক শিবকে শক্তিমান করে। আবার দুর্গা নন, তিনি প্রকৃতঅর্থে শিবঘরণী। অন্তত পুরাণ তাই বলে। চমক লেগে যাওয়ারই কথা। কারণ, দেবী জগদ্ধাত্রীর পরতে পরতে চমকের বিস্ফোরণ। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, দেবী দুর্গাকে বাঙালি উমা হিসেবে পুজো করেন। বাঙালির সংস্কারের সঙ্গে গার্হস্থ্য ভাবনার যে যোগ, তার জেরেই উমা দেবী হলেও ঘরের মেয়ে। সন্দেহ নেই এমন ভাবনা, দেবতার এই বিরল আত্মীকরণ এক অনবদ্য ঘটনা। এই পরিসর তৈরির পিছনে মঙ্গলকাব্য থেকে শাক্তসাধক কবিদের বড় ভূমিকা আছে। তাই বাঙালির দুর্গাপুজোকে দেবী আরাধনা এবং উমার মাতৃগৃহে আগমন, এই দু’য়ের সমাহারেই দেখা হয়। দেবী দুর্গা, যাঁর উল্লেখ চণ্ডীপাঠে আমরা করি, সেখানে স্পষ্ট করে তাঁকে শিবজায়া বলে দেখানো হয়নি। কিন্তু জগদ্ধাত্রীর ধ্যানমন্ত্রকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সেখানে বলা হচ্ছে— ‘রক্তবস্ত্রপরিধানাং বালার্কসদৃশীং তনুম্/নারদাদ্যৈমুর্নিগণৈঃ সেবিতাং ভবগেহিনীম্’। এই ভবগেহিনীম্ শব্দের সরলার্থ ভবের গৃহিণী বা স্ত্রী। ‘ভব’ কে? শিব। কিন্তু তা বলে একথা ভাবা যাবে না যে, দুর্গা ও জগদ্ধাত্রী পৃথক। এমনকী কালীও পৃথক নন। পৌরাণিক এবং ভাবগত, কোনও অর্থেই পৃথক নন। তাঁরা সকলেই একই নিরাকার পরমব্রহ্ম শক্তিস্বরূপা। কেবলমাত্র আর্বিভাবে তাঁদের পৃথক চেহারা মানুষের আরাধনার জন্য উদ্ভাসিত।
আর এখানেই আছে আরেক চমক। চলে যেতে হবে দেবী জগদ্ধাত্রীর লোকসমাজে পুজোর জনশ্রুতি-লোকশ্রুতিতে। বঙ্গভূমে কে এনেছিলেন জগদ্ধাত্রী পুজো, এ নিয়ে চন্দননগর আর কৃষ্ণনগরের বিবাদের অন্ত নেই। হিসেবের খাতা মেলে না বলে তর্কবাগীশ বাঙালিও সে নিয়ে চর্চায় মাতে। কিন্তু আগে জনশ্রুতি বা বলা ভালো স্বপ্নাদেশটি একবার স্মরণ করা যাক। সুবে বাংলার তখনকার নবাব মুর্শিদাবাদ অধিপতি খাজনা বকেয়া থাকায় বন্দি করেছিলেন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে। রাজার গৃহে দুর্গাপুজোর উৎসব হয়। কিন্তু বন্দিদশা শেষে যখন তিনি নৌকাযোগে ফিরছেন, তখন দেখলেন দেবী দুর্গার ভাসান হচ্ছে। রাজার খেদ হল। পরে স্বপ্নে দেখলেন, এক দেবী তাঁকে বলছেন, তিনি নতুন রূপে পুজো নেবেন। সেই মতোই কৃষ্ণচন্দ্র আয়োজন করলেন দেবী জগদ্ধাত্রী পুজোর। এখানে বিষয়টিকে যদি সামান্য কল্পনার আশ্রয় নিয়ে লেখা হয়, তাহলে বলতে হবে, দুর্গাপুজোর পরিবর্ত হিসেবে জগদ্ধাত্রী পুজো চালু হয়। এবার আরও একটি স্বপ্নাদেশের প্রসঙ্গে আসি। সেবার জয়রামবাটির বাসিন্দা ব্রাহ্মণ ঘরণী শ্যামাসুন্দরী দেবী কালীপুজোর জন্য নৈবেদ্য রেখেছিলেন। কিন্তু তা দেবীকে অর্পণ করা হয়নি। অথচ পুজো পেরিয়ে গিয়েছে। খুব ব্যথা পাচ্ছেন ব্রাহ্মণী। তখনই এল মায়ের স্বপ্নাদেশ। এক দেবী তাঁকে জানালেন, ওই নৈবেদ্য তিনি ভিন্নরূপে নেবেন। এবার ব্রাহ্মণগৃহে পুজো হল জগদ্ধাত্রীর। প্রশ্ন উঠবে, ওদিকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র আর এদিকে শ্যামাসুন্দরীর মতো একজন সাধারণ ব্রাহ্মণী? জনশ্রুতির ধার একটু কমে যাচ্ছে নাকি! শ্যামাসুন্দরীর একটি বিশেষ পরিচয় আছে। তিনি মা সারদার জন্মদাত্রী। যে কারণে এই স্বপ্নাদেশের আখ্যান হল, এখানে মা কালীর পরিবর্ত হল জগদ্ধাত্রী।
মজা হচ্ছে, কেনোপনিষদ থেকে পুরাণ, যেখানে যতবার দেবী জগদ্ধাত্রীর আবির্ভাবের কথা উল্লেখ হয়েছে, সেখানেই তিনি দর্পাহারিণী। দেবতার অহংকার বিনাশকারী। অথচ আমাদের দেবীভাবনায় তিনি গজরূপী করিন্দ্রাসুর নিধনকারী। ভালো করে নজর করলে দেখা যাবে, দেবী দুর্গা ও কালী যেমন প্রচণ্ডা, বীরত্বব্যাঞ্জক তাঁদের স্বরূপ, সেখানে ভিন্নরূপে বিরাজ করেন জগদ্ধাত্রী। তিনি অস্ত্র ধরেন, কিন্তু রণংদেহী নন। দুর্গা ও কালীপুজোর পর দেবী জগদ্ধাত্রীর আবাহন তাই যুদ্ধ পরবর্তী নির্মাণের ভাষ্যবহন করে। আড়ম্বর, আলোর ঝলকানি আর বিপুলায়তন দেবীর জাগতিক অবয়বের তলায় চাপা পড়ে থাকে আরও এক চমকপ্রদ তথ্য। জগদ্ধাত্রীর পুজো হয় কার্তিকের শুক্লপক্ষের নবমীতে। ওই দিনটি ‘দুর্গানবমী’ নামে পরিচিত। আর সেই তিথি? সেটিকে স্মার্তপণ্ডিতরা ত্রেতাযুগের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছেন।