এসআইআর শুরুর আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে অমিত শাহ থেকে বঙ্গ বিজেপি নেতাদের হুমকি, হুঁশিয়ারি, আস্ফালনের দিকে একবার চোখ ঘোরানো যেতে পারে। প্রায় দেড় দশক আগে ২০১১ সাল থেকে এ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস কী করে ও কেন একের পর এক নির্বাচন জিতে চলেছে— সেই সত্য উদঘাটনে বিজেপি নেতারা রাজ্যের ভোটার তালিকাকে কাঠগড়ায় তুলে চলেছেন! মোদ্দা কথা হল, ভোটার তালিকায় মৃত ও ভূতুড়ে ভোটার এবং বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম ঢুকিয়ে নাকি বাজিমাত করে চলেছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল! তাঁদের কারও মতে, সংখ্যাটা অন্তত দেড় কোটি হবে। এসআইআর করে এই বিপুল সংখ্যক ভুয়ো নাম তালিকা থেকে বাদ দিলেই এ রাজ্যে পদ্মফুলের জয় নাকি নিশ্চিত। কিন্তু গেরুয়া বাহিনীকে খুশি করে এক মাস ধরে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের পর নির্বাচন কমিশন যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা সাড়ে ১০ কোটির বেশি। তার মধ্যে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ মানে প্রায় ৫.৮০ শতাংশ। এর মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট ও খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন ভোটার রয়েছেন। কিন্তু বাদের তালিকায় বিজেপি-কল্পিত অনুপ্রবেশকারী মুসলিম ও রোহিঙ্গা কত— তা জানাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। এই খসড়া তালিকার প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সেখানে হিন্দুদের নামই বেশি। ফলে এসআইআর বিজেপির পক্ষে ব্যুমেরাং হবে কি না, সেই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বছর বছর ভোটার তালিকা সংশোধনের পরেও কী করে নিবিড় সংশোধনে এত নাম বাদ পড়ে, তা নিয়েও। এই প্রশ্নে কমিশন তার দায় এড়াতে পারে কি?
বিজেপির দাবিমতো পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের উপর্যুপরি ক্ষমতা দখলের মূল চাবিকাঠি হিসেবে তালিকাভুক্ত ভুয়ো ভোটারকে কাঠগড়ায় তুলতে হলে দেখা যাচ্ছে, এই খেলায় বিজেপি শাসিত ডবল ইঞ্জিনের রাজ্যগুলি কয়েক কদম এগিয়ে রয়েছে। বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গ সহ ১২টি রাজ্যে একযোগে এসআইআর শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে এই সিংহভাগ রাজ্যে খসড়া ভোটার তালিকাও প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, গুজরাতের জনসংখ্যা ৭.৪১ কোটি। বাদ পড়েছে ৭৩.৭৩ লক্ষ নাম (৯.৯৫ শতাংশ)। ছত্তিশগড়ে জনসংখ্যা ৩.১২ কোটি। বাদ পড়েছে ২৭.৩৪ লক্ষ (৮.৭৬ শতাংশ)। প্রায় ২৫ কোটি জনসংখ্যার উত্তরপ্রদেশে বাদ পড়তে চলেছে প্রায় ৩ কোটি ভোটারের নাম। মানে ১০ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি ৭.৭৫ কোটি জনসংখ্যার তামিলনাড়ুতে বাদ গিয়েছে ৯৭.৩ লক্ষ (১২.৭৫ শতাংশ) নাম, ৩.৬২ কোটি জনসংখ্যার কেরলে ২৪.৪ লক্ষ (৬.৬৫ শতাংশ) নাম। আবার মধ্যপ্রদেশে ৪২.৭৪ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে যা মোট ভোটারের ৯.৭৩ শতাংশ। রাজস্থানে বাদ পড়েছে ৪২ লক্ষ নাম, যা মোট ভোটারের ৭.৬৯ শতাংশ। ভোটার সংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গে বাদের হার ৮.১ শতাংশ। বিজেপির দাবিকে মান্যতা দিতে হলে এটা মেনে নিতে হয় যে, এইসব রাজ্যে ভোটার তালিকায় ভুয়ো নাম অনেক বেশি ছিল এবং এই ভূতুড়ে ভোটারের কাঁধে চেপেই সংশ্লিষ্ট একাধিক রাজ্যে তারা ভোটে জিতেছে। বিজেপি অবশ্য এই নিয়ে চুপ! প্রশ্ন উঠেছে, গেরুয়া শিবিরকে সুবিধা করে দিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন কি মোদি-শাহ বাহিনীর হিতে বিপরীত করে বসল? উত্তর ইতিহাস দেবে।
এ রাজ্যে এসআইআর-এর দ্বিতীয় পর্বে এখন প্রায় দেড় কোটি ভোটারের শুনানি শুরু হয়েছে। এক মাস ধরে চলবে শুনানির কাজ। কিন্তু শুরুতেই রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত ছাপ লক্ষ করা যাচ্ছে। অভিযোগ, ‘ম্যাপিং’-এর নামে নানা ‘অজুহাতে’ ভোটারদের চূড়ান্ত হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। নব্বই বছরের বৃদ্ধ থেকে প্রসব যন্ত্রণায় কাতর সন্তানসম্ভবা মহিলা— হেনস্তার হাত থেকে কারও রেহাই নেই! প্রায় প্রতিদিনই নিত্যনতুন নির্দেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে ভোটাধিকার হারানোর আতঙ্ক, অন্যদিকে অত্যধিক কাজের চাপে বিএলও-দের কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। অজানা আশঙ্কায় দিন কাটছে সাধারণ নাগরিকদেরও। গোটা পর্ব জুড়ে এই পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমেয়। সর্বত্র ভয়-ভীতির আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে, যা দুর্ভাগ্যজনক। খবরে প্রকাশ, নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দ্রুত কাজ সারতে ভোটারদের জমা দেওয়া নথি শুনানি চলাকালীন খতিয়ে দেখা হবে না। যাচাইপর্ব হবে পরে। অর্থাৎ ভোটারদের অগোচরে। এর অর্থ, শুনানিতে ডাক পাওয়া ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকবে কি না, তা জানার জন্য ভোটারদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তখন নাম না থাকলেও কার্যত কিছু করার থাকবে না। এর ফলে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েও চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এত অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা, হেনস্তা দেখেও কমিশনের কোনও হেলদোল দেখা যাচ্ছে না! ভোটার অর্থাৎ জনগণের উপর ক্ষমতা জাহিরের বুলডোজার চলছেই। প্রশ্ন হল, এসআইআরকে ঘিরে এই আতঙ্কের পরিবেশ থেকে বাংলার মানুষ মুক্তি পাবেন কবে?