নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নদীয়া জেলায় চাকরি হারালেন ৯০৬ জন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী। যার মধ্যে শুধু শিক্ষকের সংখ্যাই প্রায় সাড়ে আটশোর কাছাকাছি। যার ফলে কার্যত মাথায় হাত শিক্ষক মহলের। কারণ এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষক চাকরি হারালে, প্রান্তিক এলাকার স্কুলগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত ধসে পড়বে বলেই মনে করেছেন অনেকে। কারণ নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির পাশাপাশি গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি কর্মীদের চাকরিও বাতিল হয়েছে। নদীয়া জেলার প্রায় ৩০০টি স্কুল শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের হারাতে বসেছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় সামনে আসার পর বৃহস্পতিবার অনেক স্কুলেই চাকরি হারানো শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি ইতিমধ্যেই নদীয়া জেলা শিক্ষা দপ্তরের নজরে এসেছে।
নদীয়া জেলার ডিআই শুভ্রকান্তি নন্দ বলেন, সুপ্রীমকোর্টের রায় শুনেছি। বোর্ড থেকে আমাদের কাছে এখনও পর্যন্ত কোনও নির্দেশিকা আসেনি। তাই এই মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না।
নদীয়া জেলা শিক্ষা দপ্তর সূত্র জানা গিয়েছে, ২০১৬ সালে প্রথম স্টেট লেভেল সিলেকশন টেস্ট অনুযায়ী নদীয়া জেলার নবম ও দশম শ্রেণির ৬৩৬ জন, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ১৯৭ জন এবং গ্রুপ সি ও ডি পদের ৭৩ জনের চাকরি বাতিল হয়েছে। শিক্ষা দপ্তরের এক পদস্থ কর্তার কথায়, জেলার প্রতিটা স্কুলের গড়ে তিন থেকে চারজন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে। তাঁরা সকলেই ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে চাকরি পেয়েছেন।
কৃষ্ণনগর শহরের দেবনাথ হাইস্কুল এবং কালীনগর হাইস্কুলের একজন, ঘূর্ণি হাইস্কুলের ২ জন, কালীনগর গার্লস হাইস্কুলের ৩ জন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়েছে। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা সৌমিত্র কারাটি বলেন, আমি বামুনপুকুর হাইস্কুলের শিক্ষক। ২০১৯ সাল থেকে পড়াচ্ছি। যখন রায়ের বিষয়টা জানতে পারি তখন স্কুলেই ছিলাম। মা শয্যাশায়ী। মেয়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। বাড়িতে একমাত্র আমিই উপার্জন করি। এখন আমার উপার্জন বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তো সমস্যা হবেই।
অন্যদিকে শান্তিপুর সূত্রাগড় গার্লস হাইস্কুল থেকে পাঁচ জন শিক্ষক এবং একজন অশিক্ষক কর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে নৃসিংহ পুর উচ্চ বিদ্যালয় এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় ঘোষ বলেন, আমাদের স্কুলের চারজনের চাকরি বাতিল হয়েছে। তার মধ্যে দুজন শিক্ষক এবং দুজন শিক্ষিকা। প্রত্যেকেই প্রচন্ড ভেঙে পড়েছিলেন। আমরা যতটা সম্ভব পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।
অন্যদিকে, নবদ্বীপ হিন্দু স্কুল এবং নবদ্বীপ বালিকা বিদ্যালয়, বামুনপুকুর হাইস্কুলের তিনজন করে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে। নবদ্বীপ হিন্দু স্কুলের টিচার ইনচার্জ জগন্নাথ গুঁই বলেন, একজন শিক্ষক, একজন শিক্ষিকা এবং একজন শিক্ষাকর্মীর সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে চাকরিহারা হলেন। বর্তমানে একজন দক্ষ শিক্ষাকর্মী চলে গেলে প্রশাসনিক কাজকর্মের বিরাট সমস্যা দেখা দেবে। এছাড়া অঙ্কের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দু’জন শিক্ষক শিক্ষিকা যদি চলে যান সেক্ষেত্রে পঠনপাঠন ব্যাহত হবে।
অন্যদিকে করিমপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের আট জন, শিকারপুর সুভাবিনী বালিকা বিদ্যালয় ও গোয়াবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয় জন চাকরি হারিয়েছেন। হোগলবেড়িয়া আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অনিল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের প্রায় দেড় হাজার ছাত্রছাত্রীকে পড়ানোর জন্য ২৮ জন স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন। ৮ জন শিক্ষকের পদ এমনিতেই খালি আছে। তার উপর এখন পাঁচজন শিক্ষক চলে গেলে স্কুল কিভাবে চলবে সেটাই চিন্তার।
পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে তেহট্টের শ্রীদাম চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ে থাকল না ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষিকা। ফলে বড়সড় সমস্যায় পড়ল স্কুল। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক মল্লিকা সরকার বলেন, এমনিতেই শিক্ষিকা কম ছিল। তারপর পাঁচজনের চাকরি বাতিল হওয়ায় কীভাবে মেয়েদের লেখাপড়া হবে, বুঝতে পারছি না। প্রতীকী চিত্র