শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: সারদা-রোজ ভ্যালির পর ফের বড় ধরনের প্রতারণা কারবার সামনে এল। মান্থলি ইনভেস্ট স্কিম (এমআইএস) এবং শেয়ারে বিনিয়োগের টোপ দিয়ে ‘স্টক গুরুকুল’ নামে একটি কোম্পনি ৪০০ কোটির বেশি টাকা প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ। দুবাইতে বসেই রাজ্যের হাজার হাজার আমানতকারীর টাকা হাতানোর অভিযোগ উঠেছে সংস্থার কর্ণধার শুভ্রকান্তি নাগ ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে। প্রতারিতদের একটা বড় অংশই প্রবীণ নাগরিক। আমানতকারীদের টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে আনার পর বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এনিয়ে হাওড়ার বাউড়িয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন আমানতকারীরা। তার ভিত্তিতে প্রতারণা, জালিয়াতি সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
রাজ্য পুলিশ সূত্রে খবর, নদীয়ার তাহেরপুরের এই কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রথমে অভিযোগ জমা পড়ে স্থানীয় থানায়। অনলাইন শেয়ার ট্রেডিংয়ে বিনিয়োগের নাম করে কয়েকশো কোটি টাকা হাতানোর অভিযোগ ওঠে। তদন্তভার নেয় ‘ডিরেক্টরেট অব ইকনমিক অফেন্সেস’ (ডিইও)। কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়। অভিযোগ, এরপরই দুবাই পালিয়ে যান সংস্থার কর্ণধার শুভ্রকান্তি নাগ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বেশ কিছুদিন কারবার বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে যেতেই নাম বদলে একাধিক নতুন কোম্পানি খোলেন শুভ্রকান্তি। অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের টোপ দেওয়া হয়, তাদের সংস্থায় এমআইএস করলে মাসে চার শতাংশ হারে সুদ মিলবে। কীভাবে এই সুদ দেওয়া সম্ভব, তা ভিডিও করে বিভিন্ন এজেন্টদের কাছে দুবাই থেকে পাঠিয়ে দিতেন কর্ণধার। সেটাই এজেন্টরা আমানতকারীদের সামনে তুলে ধরেন। সংস্থায় টাকা রাখতে শুরু করেন হাওড়ার বাউরিয়া, উলুবেড়িয়া, বাগনান, দুই ২৪ পরগনা, নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি সহ বিভিন্ন জেলার লোকজন। পাশাপাশি, অনলাইন শেয়ারে লগ্নির টোপ দিয়ে টাকা তুলতে থাকে এই কোম্পানি। চলতি বছরের তিন-চার মাসেই তারা ৪০০ কোটির বেশি টাকা তুলে ফেলে। আমানতকারীদের বলা হয়, টাকা সংস্থার মালিকের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে। নগদে ও অ্যাকাউন্টে টাকা সংগ্রহ করা হয়। মালিক তাঁদের জানান, এই টাকা তিনিই আমানতকারীদের হয়ে বিনিয়োগ করবেন বিভিন্ন শেয়ারে। তাছাড়া, এমআইএসের টাকা বিনিয়োগ করা হবে একাধিক ব্যবসায়। এই কারণেই তারা সবার চেয়ে বেশি সুদ দিতে পারছে। এভাবে কয়েকশো কোটি টাকা অ্যাকাউন্টে ঢোকার পর টাকা তোলার অপশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমানতকারীদের বলা হয়, তাঁদের টাকা ক্রিপ্টোতে বদলে ফেলা হবে, যাতে লাভ আরও বেশি হয়। প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে বাউরিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেন কয়েকজন আমানতকারী।
তদন্তে জানা যায়, এভাবে উঠে আসা টাকার পুরোটাই হাওলার মাধ্যমে দুবাইতে নিয়ে গিয়েছেন সংস্থার মালিক। এই ফাঁদে পড়ে সব মিলিয়ে ১২ হাজারের বেশি আমানতকারী প্রতারিত হয়েছেন। টাকা ফেরতের জন্য ১৩,৫০৪টি চেক ইস্যু করে কোম্পানি। সবক’টি চেকই ‘বাউন্স’ করেছে বলে অভিযোগ। এখনও পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে, তাতে প্রতারণার পরিমাণ ৪০০ কোটির প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। তাঁরা আরও জেনেছেন, দুবাইতে বসে শুভ্রকান্তি একের পর স্কিম চালু করে এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। এই সূত্র ধরেই তাঁর অবস্থান চিহ্নিত করে তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য প্রস্তুতি শুরু করছে রাজ্য পুলিশ।