বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের সুদের হার বৃদ্ধি করে না ইপিএফও। কারণ? অর্থমন্ত্রক নাকি সেই আবেদনে সাড়া দেয় না। কিন্তু বর্ধিত পেনশন? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও এর শম্বুক গতি কেন? প্রায় সাড়ে ১৭ লক্ষ প্রবীণ আবেদনকারী এর আশায় টাকা ঢেলে কতদিন অপেক্ষা করবেন? এই প্রশ্নে কিন্তু কেন্দ্র নিরুত্তর। আর তাই আবেদনকারীদের বৃহত্তম অংশ মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও বর্ধিত পেনশন পান না। কেন? দপ্তরের অন্দরের যুক্তি একটাই—পেনশন দিতে যে বিপুল টাকা খরচ হবে, তা আসবে কোথা থেকে? এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন বা ইপিএফও একটি অন্তর্বর্তী রিপোর্টে বলছে, বর্ধিত হারে পেনশনের জন্য যাঁরা সঠিকভাবে আবেদন করেছেন, তাঁদের যদি পঞ্চাশ শতাংশকেও পেনশন দিতে হয়, তাহলে দপ্তরের খরচ হতে পারে প্রায় ১ লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর অর্থ, সঠিক শর্ত মেনে করা সব আবেদনের ভিত্তিতে পেনশন দিলে খরচ হওয়ার কথা পৌনে তিন লক্ষ কোটি! এই টাকা আসবে কোথা থেকে? তার স্পষ্ট জবাব নেই মোদি সরকারের কাছেও।
গোড়া থেকেই বর্ধিত হারে পেনশন দিতে অনীহা ছিল কেন্দ্রের। অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের গুঁতোয় এই পেনশন দিতে বাধ্য হয় তারা। কিন্তু যাঁরা আবেদন করেছিলেন, শর্তের গেরোয় তাঁদের অধিকাংশকেই ছেঁটে ফেলে কেন্দ্র। তারপরও পেনশন দেওয়ার কাজে গতি আসেনি। প্রাথমিকভাবে ঠিক ছিল, ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে পেনশন দেওয়ার যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ শেষ করবে দপ্তর। সময়সীমা দূরঅস্ত, প্রক্রিয়াটাই এখনও অথৈ জলে। ইপিএফওর শেষ দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্ধিত পেনশনের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা প্রায় ১৭ লক্ষ ৪৯ হাজার। নানা শর্তের ফিকির দেখিয়ে এর মধ্যে ৭ লক্ষ ৩৫ হাজার আবেদন বাতিল করা হয়েছে। আর পেনশন চালু হয়েছে কতজনের? স্পষ্ট করছে না দপ্তর। এমনকী এই তথ্য জানানো হয়নি কেন্দ্রীয় অছি পরিষদের বৈঠকেও। সূত্রের খবর, সংখ্যাটা ৪০ হাজারও পেরয়নি।
দপ্তরের কর্তারা বলছেন, পেনশন প্রদান পর্ব চালু হলেও তার ‘অ্যাকচুরিয়াল’ প্রভাব কতটা পড়বে, তার হিসেবই শুরু করা হয়নি চূড়ান্তভাবে। মূল্যবৃদ্ধি, সুদ, আগামী দিনের আর্থিক অবস্থা সংক্রান্ত ঝুঁকি প্রভৃতি সামগ্রিকভাবে তহবিলের উপর কতটা প্রভাব পড়বে, সেটাই অ্যাকচুরিয়াল হিসেব। এই প্রসঙ্গে পিএফ দপ্তর একটি নোটে জানিয়েছে, সব আবেদনের প্রসেসিং শেষ হওয়ার পরই সেই হিসেব কষা সম্ভব। তবে প্রাথমিকভাবে কয়েক হাজার আবেদনের উপর এই সংক্রান্ত হিসেব কষে খরচের আভাস পেতে চেয়েছে দপ্তর। তাতেই তাদের চক্ষু চড়কগাছ। দেখা গিয়েছে, যদি যোগ্য আবেদনকারীর অর্ধেককে পেনশন দিতে হয়, তাহলে ঘাটতি হবে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বৈধ আবেদনকারীর সবাইকে পেনশন দিলে তহবিলে ঘাটতি হবে প্রায় পৌনে তিন লক্ষ কোটি টাকা! প্রশ্ন উঠছে, অর্ধেক সংখ্যক আবেদনকারীকে পেনশন দেওয়ার হিসেবই কেন সামনে এল? সেক্ষেত্রে কি ধরেই নেওয়া হয়েছে যে, বাকি অর্ধেক আবেদনকারীকে বর্ধিত পেনশন দেওয়া হবে না?
উত্তর নেই। এমনকী এই টাকা আসবে কোথা থেকে, তারও জবাব নেই দপ্তরের কাছে। বর্ধিত পেনশনের জন্য আবেদন করার পর যাঁদের কাছে ডিমান্ড নোটিস পাঠাচ্ছে দপ্তর, তাঁরা বাকি টাকা একবারে মেটাচ্ছেন। সেটা পেনশন পাওয়ার আগেই। কিন্তু দপ্তর দেখছে, সেই থোক টাকা মোট প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় কিছুই নয়। কারণ, এতদিন পেনশন না দেওয়ায় ‘এরিয়ার’ হিসেবে এককালীন অনেকগুলো টাকা ওই গ্রাহককে দিতে হচ্ছে। তাই সব মিলিয়ে বিরাট অঙ্কের ঘাটতির আভাস। কেন্দ্রীয় অছি পরিষদের সদস্য এবং টিইউসিসি’র সাধারণ সম্পাদক শিওপ্রসাদ তেওয়ারি বলেন, ‘বিপুল পেনশন মেটাতে দপ্তরের তহবিলে যে টান পড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আগামী বছরগুলিতে পিএফ গ্রাহকদের তরফে বিপুল টাকা জমাও হবে। ফলে তখন দপ্তর সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারবে।’