নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: বহাল রইল কলকাতা হাইকোর্টের নজিরবিহীন ও অপ্রত্যাশিত রায়। স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারীর চাকরি বাতিল করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার এই রায় দিয়েছে দেশের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ। ৪১ পৃষ্ঠার রায়ে জানানো হয়েছে—২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া কলুষিত। শুধরে নেওয়ার কোনও জায়গাই নেই। তাই হাইকোর্টের রায়ের উপর হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। পুরো প্যানেলই বাতিল। তবে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হল।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে চাকরি হারালেন মোট ২৫ হাজার ৭৫২ জন। শুধু সোমা দাস নামে ক্যান্সার আক্রান্ত এক শিক্ষিকার চাকরি বহাল রইল মানবিকতার কারণে। বাকি প্রতিবন্ধীদের চাকরি গেলেও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কাজে যেতে পারবেন। সেই অনুযায়ী মিলবে ভাতা। তবে ‘অযোগ্য’ প্রার্থীদের ফেরত দিতে হবে বেতনের অর্থ। কিন্তু কারা দেবে সেই টাকা? বেআইনিভাবে নিয়োগ হওয়া মোট ৬ হাজার ২৭৬ জনকে চিহ্নিত করার কথা সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে এসএসসি। সম্ভবত তারাই টাকা ফেরাবে। ‘অযোগ্য’ চিহ্নিত না হওয়া প্রার্থীদের অবশ্য চাকরি গেলেও বেতনের অর্থ ফেরত দিতে হবে না। তাঁরা এবং দিব্যাঙ্গ বা প্রতিবন্ধীরা নতুন নিয়োগে অংশ নিতে পারবেন। এবং বয়সসীমায় ছাড় পাবেন। যদিও দীর্ঘদিন কাজ করার পর কাউকে এভাবে বেতন ফেরত দিতে বলা যায় কি না, সেব্যাপারে প্রশ্ন তুলছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরাই।
রাজ্য সরকারি অথবা স্বশাসিত সংস্থা ছেড়ে ২০১৬ সালের এসএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চাকরি পেয়েছিলেন অনেকে। তাঁদের চাকরি হারাতে হল বটে, তবে মিলল সুযোগ। এই সংখ্যাটি ৪২৩ জন। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, তাঁরা পুরনো দপ্তরেই ফিরে যেতে পারবেন। তিন মাসের মধ্যে তাঁদের নিয়োগ করতে হবে। দিতে হবে প্রাপ্য পদোন্নতি। মিলবে বাড়তি বেতন (ইনক্রিমেন্ট)। প্রয়োজনে অতিরিক্ত পদ তৈরি করে তাঁদের ফেরত নিতে হবে। তবে ঘটনা হল, চাকরি না পাওয়া যে প্রার্থীরা এতদিন নিজেদের যোগ্য বলে দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন, ধর্না দিয়েছেন, তাঁরাও কেউ চাকরি পাবেন না। কারণ, পুরো পরীক্ষা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াই বাতিল।
নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সহকারী শিক্ষক, গ্রুপ সি এবং ডি (অশিক্ষক কর্মী) নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি এসএসসি প্রকাশ করেছিল ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। ওই বছরই ২৭ নভেম্বর ওএমআর শিটে পরীক্ষা নেওয়া হয়। দু’বছর পর প্রকাশিত হয় চূড়ান্ত প্যানেল এবং প্রার্থীদের মেধা তালিকা। সেই অনুযায়ী ২০১৯ সালের গোড়ায় চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। সেই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে ২০২১ সালে। কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত এবং তার জেরে বেআইনি নিয়োগ বাতিলের রায় হয়। সেই নিয়ে আইনি টানাপোড়েন শুরু হয় ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশে। এই প্রেক্ষিতেই একাধিক মামলা হয় সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু শীর্ষ আদালত তা ফেরত পাঠায় হাইকোর্টেই। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল ২৫ হাজার ৭৫৩ জনের চাকরি বাতিল করে দেয় হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মহম্মদ শাব্বার রশিদির বিশেষ বেঞ্চ। সেই রায় চ্যালেঞ্জ করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে প্রথম শুনানি শুরু হয় ২৯ এপ্রিল। ২৬ বার শুনানির পর বৃহস্পতিবার সেই রায়দান হল। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, প্যানেলের বাইরেও ১ হাজার ৪৯৬ জনের নিয়োগ, র্যাঙ্ক টপকে ৯২৬ জনকে চাকরি দেওয়ার কথা। ৪ হাজার ৯১ জনের ওএমআর ‘মিসম্যাচ’ হয়েছে। এসএসসির সুপারিশ ছাড়াই পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ২ হাজার ৩৫৫ জনকে নিয়োগপত্র দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলার পরও রাজ্য, বোর্ড, কমিশন যোগ্য-অযোগ্য বাছতে ব্যর্থ হওয়ায় পুরো প্যানেল বাতিল করে দিল সুপ্রিম কোর্ট।



