শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: নেপথ্যে নার্সিংহোমগুলির এজেন্ট! হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়েই উধাও হয়ে যাচ্ছেন ভর্তি থাকা রোগী! গত এক সপ্তাহে এভাবে তমলুক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ২২ জন রোগী চম্পট দিয়েছেন। মুচলেকা দিয়ে হাসপাতাল ছাড়ার ঘটনাও ঘটছে। সেই সংখ্যাটা আরও বেশি। রোগী হয়তো ডিসচার্জ দেওয়ার অবস্থায় নেই। তার আগেই রোগীকে বাড়ির লোকজন অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে স্বেচ্ছায় নিয়ে চলে যাচ্ছেন। গত সাত দিনে ১৩০ জন রোগী হাসপাতাল ছেড়েছেন। এর পিছনে নার্সিংহোমের এজেন্টদের খেলা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। ওই এজেন্টরা হাসপাতাল চত্বরে ঘুর ঘুর করেন। রোগী এবং বাড়ির লোকজনকে নানাভাবে বুঝিয়ে অথবা ভয় দেখিয়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীকে নার্সিংহোমে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আর একবার কোনও রোগীকে পৌঁছে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। মিলছে মোটা কমিশন।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, ৯ সেপ্টেম্বর একজন, ৮ সেপ্টেম্বর একজন, ৭ সেপ্টেম্বর চারজন, ৬ সেপ্টেম্বর পাঁচজন রোগী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে চলে গিয়েছেন। একইভাবে ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচজন, ৪ সেপ্টেম্বর তিনজন এবং ৩ সেপ্টেম্বর তিনজন একইভাবে ভ্যানিশ। আবার, গত সাত দিনে ১৩০ জন রোগীকে চিকিৎসক ডিসচার্জ করার আগেই বাড়ির লোকজন মুচলেকা দিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছেন। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এদেরকে ‘লিভ আন্ডার মেডিক্যাল অ্যাডভাইস’ বলে দাবি করছে।
বেশকিছু দিন আগে জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাজী হাসপাতাল পরিদর্শনে এসেছিলেন। রোগীদের এভাবে স্বেচ্ছায় হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তাঁর নজরে আনা হয়। আশ্চর্য হয়ে যান জেলাশাসক। প্রতিটি ঘটনা থানায় জানানোর নির্দেশ দেন জেলাশাসক। সেইমতো হাসপাতাল থেকে প্রতিটি ঘটনা থানার নজরে আনা হতো। তমলুক থানার পুলিশ রোগীর যোগাযোগ নম্বরে ফোনও করত। কিন্তু, এনিয়ে পুলিশের অভিজ্ঞতা বেশ খারাপ। অধিকাংশ রোগীর বাড়ির লোকজনের দাবি, তাঁরা স্বেচ্ছায় হাসপাতাল থেকে রোগী এনেছেন। থানা থেকে ফোন করে অযথা হয়রানি কেন? তারপর থেকে থানা থেকে ফোন করা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জেলা সদর তমলুক শহরে নার্সিংহোমের সংখ্যা প্রায় ৮৫টি। রোগীর অভাবে ইদানীং বহু নার্সিংহোম ধুঁকছে। ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখতে কেউ কেউ এজেন্ট নিয়োগ করেছে। তাঁরা তমলুক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে আউটডোর থেকে ইনডোরে ভর্তি থাকা রোগীর পরিজনদের সঙ্গে কথা বলছেন। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড কিংবা কর্পোরেট সংস্থার বিমাকার্ডে ভালো পরিষেবা মিলবে বলেও টোপ দিচ্ছেন। হাসপাতালে অনেক সময় ওয়ার্ডে রোগী উপচে পড়ছে। সেখানে বেডের সমস্যাও থাকে। মূলত, এ ধরনের রোগীদের টার্গেট করছেন এজেন্টরা।
ঘটনা হল, হাত, পা ভাঙা রোগীও ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় হাসপাতাল থেকে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে যাচ্ছেন। গেট পেরিয়ে রাস্তায় এসে টোটোয় চড়ে শহরের কোনও নার্সিংহোমে গিয়ে ভর্তি হচ্ছেন। সমস্যা মোকাবিলায় থানা-পুলিশ করেও সুরাহা মিলছে না। বিপাকে পড়ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তমলুক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিন্সিপাল শর্মিলা মল্লিক বলেন, ‘ডাক্তারি পরামর্শ নিয়ে কিছু রোগী নিজেরাই হাসপাতাল থেকে চলে যেতে চান। সেক্ষেত্রে উপযুক্ত পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে, না জানিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনা অনেকটাই কম।’
প্রোগ্রেসিভ নার্সিংহোম অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক কানাইলাল দাস বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে অনেক সময় নানা অসুবিধার কারণে রোগী নিয়ে বাড়ির লোকজন অন্যত্র চলে যান। এটা তাঁর এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। তবে, নার্সিংহোম এজেন্ট লাগিয়ে রোগী বের করে আনে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সেটা ভিত্তিহীন।’