সমৃদ্ধ দত্ত: ভারত কি ঠিক পথে চলছে? নাকি আমাদের অজ্ঞাতে ক্রমেই এক সামগ্রিক আর্থ সামাজিক সংকটের অন্ধকারে প্রবেশ করতে চলেছে দেশ? ২০২৫ সাল শীঘ্রই অতীত হয়ে যাবে। শিয়রে আরও একটি নতুন বছর। কিন্তু সেই ২০২৬ সালকে সাদরে বরণ করে নিতে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যরাতে প্রবল আতশবাজি, শব্দবাজি, সুরা, পিকনিক, নাইট ক্লাব, বন্ধুর বাড়ির আড্ডা, পরদিন ভোরে দক্ষিণেশ্বর অথবা কাশীপুরে যাওয়ার প্রস্তুতির আনন্দের আড়ালে কিন্তু ২০২৫ সাল রেখে দিয়ে যাবে একঝাঁক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। প্রধান প্রশ্ন, প্রবল এক অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, প্রশাসনিক অব্যবস্থা এবং আর্থিক সংকটের ছায়া কেন প্রলম্বিত হচ্ছে ভারতকে কেন্দ্র করে? আমরা কেন সুশাসন ও সুস্থিতির জীবন পাচ্ছি না।
লক্ষ করা যাচ্ছে, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর বর্ষাকালে এক ধ্বংসলীলায় পরিণত হচ্ছে। পাহাড়ে ধস, রাস্তা বন্ধ, নদীর জলোচ্ছ্বাস, এসব বহুকাল ধরেই পার্বত্য প্রদেশগুলিতে হয়ে চলেছে। কিন্তু ২০২৫ সাল দেখিয়ে দিল যে, বর্ষাকালীন ধ্বংসকাণ্ড মোটেই স্বাভাবিক নয়। বিভিন্ন কারণের দিকে অঙ্গুলিহেলন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত অবৈজ্ঞানিক উন্নয়ন, পাহাড় ধ্বংস, সমতলের মতোই পাহাড়ে সড়ক নির্মাণের চেষ্টা, নদীকে বেঁধে ফেলা যেখানে সেখানে, সারাবছর ধরে পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাহাড়কে ধ্বংস করে ফেলা ইত্যাদি। উদ্বেগজনক হল, এর কোনওটাই কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না। পাহাড়ি প্রদেশের ধ্বংসলীলা আরও দ্বিগুণ হচ্ছে। ভারতের তিন প্রধান পাহাড়ি রাজ্যের বহু গ্রাম শূন্য হয়ে গিয়েছে। বহু এলাকা সম্পূর্ণ জনবসতিহীন হয়ে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে অপারেশন সিন্দুর হওয়ার আগে পর্যন্ত ভারতবাসীর বিশ্বাস ছিল ভারত বোধহয় সত্যিই আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ক্ষমতাবান শক্তি। দেশবাসীর গৌরববোধ হচ্ছিল। কিন্তু অপারেশন সিন্দুরের পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লাগাতার বলে গেলেন যে, তিনি ধমক দিয়ে ভারতকে যুদ্ধ বন্ধ করিয়েছেন। ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন। এত বড়ো সুযোগ পেয়েও কেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়া হল? কেন পাক অধিকৃত কাশ্মীর দখল করা হল না অন্তত কিছুটাও? এই প্রশ্নগুলির জবাব কিন্তু আজও পাওয়া গেল না। বরং এক নিশ্ছিদ্র নীরবতা বিরাজ করল।
খোদ রাজধানীর বুকে সবথেকে সুরক্ষিত এক স্থান লালকেল্লার সামনে বিস্ফোরণ ঘটল। এক ভয়ঙ্কর মেডিকেল মডিউল ভারতের বিভিন্ন নগরীকে টার্গেট করেছিল। অসংখ্য বিস্ফোরণের প্ল্যান ছিল। প্রায় ৩ হাজার কেজি বিস্ফোরক জমা করা হয়েছে দিল্লির নাকের ডগায় ফরিদাবাদে এক হাই প্রোফাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অথচ ভারতের গুপ্তচর ও গোয়েন্দাবাহিনী এক বিন্দুও কিছু জানতে পারল না! সেই তদন্ত কতদূর অগ্রসর হয়েছে? আর কিছুই জানা যাচ্ছে না ।
টাকার পতন অবিশ্বাস্যভাবে হয়েই চলেছে। মাত্র ১২ বছর আগে এক ডলারের বিনিময়মূল্য ছিল ৬০ টাকা। এখন ৯০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের ১২ বছরে কিন্তু বেড়েছিল মাত্র ১৩ টাকা। অথচ তার পরের ১১ বছরে বেড়ে গেল ৩০ টাকা। আজ থেকে ১২ বছর আগে ১০ গ্রাম সোনার দাম ছিল ২৯ হাজার টাকা (২৪ ক্যারাট)। এখন ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার বেশি।
ভারতে দ্রুততম বৃদ্ধি হচ্ছে শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট সংখ্যা। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য কাজের সুযোগ দেশে ৯ শতাংশ কমে গিয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের তুলনায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে কর্মসংস্থানের সুযোগ এক ধাক্কায় ৯ শতাংশ কমে গিয়েছে। নৌকরি জব স্পিক এই সমীক্ষা করেছে।
ফর্মাল জব অর্থাৎ অফিসে গিয়ে চাকরি, ২০২৫ সালে সাত মাস ধরে লাগাতার কমে গিয়েছে। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশ। গত এক বছরে কর্মহীন গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বেড়েছে ২০ লক্ষ। ২০১৫ সালে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই সময়সীমায় যাকে পরিভাষায় বলা হয় এন্ট্রি লেভেল স্যালারি অর্থাৎ বেসরকারি চাকরিতে ঢুকেই প্রথম যে বেতন অফার করা হয়, সেটির গড় ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকায় আটকে রয়েছে। স্নাতক স্তরের এন্ট্রি লেভেল গড় বেতন এখন ১৪ হাজার টাকা। এই টাকা কিন্তু বাড়ছে না। ভারতের সিংহভাগ বেসরকারি চাকরিতে এখন বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বন্ধ।
ভারতে বিগত ১০ বছরে সবথেকে দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেয়েছে একটি বিশেষ জীবিকা। ‘ল্যাপটপ ক্লাস’ চাকরি। অর্থাৎ যাদের চাকরি কিংবা জীবিকার প্রধান উপকরণ ও মাধ্যম হল ল্যাপটপ। এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। আইটি, সফটওয়্যার, বিমা, ব্যাংকিং, ফিনান্স, ট্যাক্স কনসালট্যান্সি, অডিট, প্রসেস, সার্ভিস ইত্যাদি আরও অসংখ্য। সবথেকে উদ্বেগজনক হল, এই ল্যাপটপ ক্লাস জবমার্কেট ২০২৩ সাল থেকে দ্রুত নিম্নগামী। এই পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর আকার নিতে চলেছে আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স আরও প্রবলভাবে আগ্রাসী থাবা বসানোয়।
আচমকা একদিন সকাল থেকে দেখা গেল, একটি এয়ারলাইন্সের শয়ে শয়ে ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাচ্ছে। কেউ বুঝতে পারছে না যে কেন? হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হল অনায়াসে। অনিয়ম অনেকদিন ধরে চলেছে। এতদিন সরকার কিছুই করেনি। চারদিন ধরে হাজার হাজার মানুষ গন্তব্যে যেতে পারল না। দেশজুড়ে হাহাকার। ২০২০ সালে আচমকা লকডাউন হয়েছিল এবং হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক ট্রেন বাস না পেয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ঘরে ফিরতে বাধ্য হচ্ছিল। ২০২০ এবং ২০২৫, দুই ভিন্ন সামাজিক ক্লাসের এই চরম বিপদ থেকে যেটা বোঝা যায়, সেটি হল, এই সরকার ক্রাইসিস সামলাতে পারে না। সেই শাসননৈপুণ্য নেই। নোটবাতিলেও প্রমাণ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার আইএমএফ কিছুদিন আগে বলল, ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিহার যে মাপকাঠিতে মাপা হয়, সেটি সি গ্রেডের! সোজা কথায় সেটি সেরকম বিশ্বাসযোগ্য নয়। যা চূড়ান্ত অপমান।
বিশ্বের দূষণতম নগরীর নাম দিল্লি। ভারতের রাজধানী। গোটা সরকার, পার্লামেন্ট যেখানে বাস করে। দিনে ১১টি সিগারেট খাওয়ার মতো দূষণ প্রতিদিন বুকে নিয়ে বাস করছে দিল্লিবাসী। দেশের রাজধানীতে ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় ২ লক্ষাধিক মানুষ সরকারি হাসপাতালগুলিতে এসেছিল শ্বাসকষ্টের রোগ নিয়ে। ৩০ হাজারের বেশি এরকম রোগীকে ভর্তি করে নিতে হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালে দূষণ আরও বেড়ে গিয়েছে। সরকার নির্বিকার।
ভারতের এমন কোনও শহর নেই যেখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে জলমগ্ন হবে না। অথচ সর্বত্র বেআইনিভাবে কনস্ট্রাকশন ও বেদখল হয়েই চলেছে সরকারি ও রাজনীতির মদতে। ভারতের এমন কোনও বৃহৎ শহর নেই যেখানে পথচারীদের জন্য নিশ্চিন্তে হেঁটে যাওয়ার সুগম ব্যবস্থা আছে। জীবনযাপনের প্রকৃতি, প্রাত্যহিক পরিষেবা, রাস্তায় বেরিয়ে নিশ্চিন্তে হাঁটাচলা, আয়ের নিশ্চয়তা সব দ্রুত কমে গিয়েছে। টোটো, স্কুটি, অটো, জবরদখলকারীর রমরমা এবং দাপটে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। বর্তমানে আর্বান প্ল্যানিং নিয়ে সবথেকে বেশি আলোচনা হয় যে, ভারতের নগরসভ্যতা কেন অবাসযোগ্য হয়ে যাচ্ছে?
অসহিষ্ণুতা, অশিক্ষা, অসৌজন্য পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সমাজে। বরং অপসংস্কৃতি ও অশিক্ষাকে আজকাল সেলিব্রেট করা হয়। ধর্মাচরণ দ্বিগুণ তিনগুণ হচ্ছে। কিন্তু ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ করা ততোধিক কমছে। আয় কমছে। সঞ্চয় কমছে। দেশের সর্বত্র কলেজগুলিতে বহু ক্লাস ফাঁকা। ছাত্রছাত্রী নেই বহু ডিপার্টমেন্টে। আবার তখনই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সভায় এক গরিব প্যাটিস বিক্রেতাকে মারধর করে কান ধরে ওঠবোস করায় গেরুয়াবাহিনী।
এই যে প্রবণতাগুলি দেখা যাচ্ছে, এর একটাও কি একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সামান্যতম আভাস দিচ্ছে? একটিও প্যারামিটার আমরা দেখতে পাই যা দেখে মনে করা যেতে পারে যে, সত্যিই দেশ শিক্ষিত আধুনিক উন্নত রাষ্ট্র হতে চলেছে?
চীন ও আমেরিকার কথা ছেড়েই দিলাম। আগামী কাল ক্ষুদ্র দেশ তাইওয়ান যদি বলে সেমিকন্ডাকটর সাপ্লাই করব না, গোটা বিশ্ব অর্থনীতি ধসে যাবে। ভারতের যখন উচিত ছিল সেমিকন্ডাকটর, রেয়ার আর্থ মিনারেলস কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দেওয়া, সেখানে আমরা কী দেখছি চারদিকে? কী নিয়ে আলোচনা হয়? আমিষ নিরামিষ।
একটাও সোশ্যাল মিডিয়া তৈরি করতে পারেনি ভারত। সব আমেরিকার। একটিও নিজের ইমেল নেই। সব আমেরিকার। একটাও নিজস্ব দামি মোবাইল কোম্পানি নেই। এসব ছেড়ে কী নিয়ে আলোচনা হয়? হিন্দু মুসলমান। কী লাভ হয়েছে এসব করে? নিছক ভোটে জেতা?
একটা সময় প্রতিবেশী দেশগুলিকে অনেক পিছনে ফেলে ভারত পশ্চিমি দেশগুলির সমকক্ষ হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছিল। সফল হচ্ছিল। আজকের ভারত পিছনের দিকে হাঁটছে। এখন ভারত প্রাণপণে চেষ্টা করছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মায়ানমার হয়ে উঠতে! যাদের প্রধান পুঁজি হল, সামাজিক অস্থিরতা! কুশাসন। আর্থিক অব্যবস্থা। কর্মহীনতা। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। সব মিলিয়ে ২০২৫ কিন্তু ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিয়ে চলে যাচ্ছে।