নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: একসময় এই বাড়িতে বসত সংস্কৃত শিক্ষার চতুষ্পাঠী। গণনা হতো পঞ্জিকার বিধান। সেই দিন কবেই হারিয়েছে। বর্ধমান রাজার থেকে পাওয়া জমিদারিত্বও গিয়েছে। তবুও টিঁকে রয়েছে হাওড়ার ব্যাটরার চট্টোপাধ্যায় বাড়ির ৩০০ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজো। আজও শুদ্ধাচারে পুজোর যাবতীয় রীতি সামলান ষাটোর্ধ্ব সীতাংশু চট্টোপাধ্যায়।
হাওড়ার ব্যাটরা চ্যাটার্জি পাড়ার রাজলক্ষ্মী বালিকা বিদ্যালয়ের পাশেই আছে চট্টোপাধ্যায়দের বাগানবাড়ি। জানা গিয়েছে, এই বংশ একসময় বর্ধমান রাজার রাজ পুরোহিত। প্রায় ৩০০ বছর আগে চট্টোপাধ্যায়রা বর্ধমান রাজার কাছ থেকে নিষ্কর জমিদারি নিয়ে চলে আসে ব্যাটরা গ্রামে। এরপর এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। সেই থেকেই নামকরণ চ্যাটার্জিপাড়ার। এই বংশের পূর্বপুরুষ গৌরীশঙ্কর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সংস্কৃতের পণ্ডিত। ‘গৌরীশঙ্কর কাব্য ব্যাকরণ তীর্থ’ রচনা করেছিলেন তিনি। তাঁর সময় সরকারি অনুদানে এই বাড়িতে নিয়মিত পৌরহিত্য ও বেদান্ত শিক্ষার টোল বা চতুষ্পাঠী চলত। তাঁর মৃত্যুর পর বন্ধ হয়ে যায় সংস্কৃত চর্চা। পরবর্তী প্রজন্ম অন্য পেশায় চলে যায়। জমিদারিত্ব, টোল হারিয়ে যায়। তবে জরাজীর্ণ বাড়িতে ঐতিহ্য ও নিয়ম মেনে হয়ে চলেছে দুর্গাপুজো। পুজোর বয়স ৩০০ বছরেরও বেশি। একচালায় বাংলা সাজে সজ্জিতা দেবী। ষষ্ঠী থেকে দশমী যাবতীয় নিয়ম শুদ্ধাচারে নিজ হাতে সামলান বাড়ির বর্তমান পুরুষ ৬৮ বছর বয়সী সীতাংশুবাবু।
জানা গিয়েছে, বহু বছর ধরে এই বাড়ির প্রতিমা তৈরি করে আসছেন কুমোরটুলির বিখ্যাত শিল্পী হেমন্ত পাল। জন্মাষ্টমীর পরের দিন হয় কাঠামো পুজো। কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা বাড়িতে এলে অধিবাসের দিন দেবীকে শুদ্ধ করে জুড়ে দেওয়া হয় বেলগাছের ডাল। একসময় মহিষ ও ছাগ বলির প্রথা প্রচলিত থাকলেও তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে আজও নিয়ম মেনে দেবীকে দেওয়া হয় আমিষ ভোগ। নিবেদন করা হয় কাতলা মাছ, চিংড়ি মাছের পদ, নানারকম তরকারি, ভাজা। পাশাপাশি ভোগে থাকে কিশোরান্ন ও পরমান্ন। সীতাংশুবাবু বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা তো বিদেশেই চলে গেল। তবুও ওরা পুজোয় আসে। তখন ওদের হাতে-কলমে পুজোর নিয়ম শিখিয়ে দেওয়া হয়।’ পুজোর চারদিন স্থানীয়দের পাশাপাশি ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজনরা। জমিদারিত্ব হারানো জরাজীর্ণ বাড়িটি গমগম করে সেসময়।