শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: শেয়ার বিনিয়োগের টোপ গিলে সাইবার জালিয়াতির শিকার হয়ে ৩৮ লক্ষ টাকা খুইয়েছিলেন চুঁচুড়ার ময়নাডাঙ্গা এলাকার এক তরুণী। টাকা তুলতে চাইলে আরও বিনিয়োগ করতে বলা হয়। তা না হলে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়া ও ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল করার হুমকি দেয় জালিয়াতরা। সাইবার জালিয়াতদের লাগাতার ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত দু’বছর আগে ভদ্রেশ্বর স্টেশনে রেল লাইনে মাথা দিয়ে আত্মঘাতী হন পেশায় সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার উপমা ঘোষ (২৮)। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে চলছিল তদন্ত। ওই তরুণীর বাবা শেওড়াফুলি জিআরপিতে লিখিত অভিযোগ করতেই রেল পুলিসের অফিসাররা জানতে পারেন, সাইবার প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছিলেন ওই তরুণী। প্রায় দু’বছর ধরে তদন্ত চালানোর পর সাইবার জালিয়াতির টাকা প্রথম যে কোম্পানির অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল, তার ডিরেক্টর আখতার হোসেনকে অসমের মরিগাঁও থেকে গ্রেপ্তার করে বুধবার কলকাতায় নিয়ে এল শেওড়াফুলি জিআরপি।
রেল পুলিস সূত্রে খবর, ২০২৩’এর ২৯ সেপ্টম্বর ভদ্রেশ্বর স্টেশনের আপ লাইনে এক তরুণীর দেহ উদ্ধার হয়। পরিচয়পত্র দেখে ওই তরুণীর সম্পর্কে জানতে পারে শেওড়াফুলি জিআরপি। তাঁর বাবাকে খবর দেওয়া হলে তিনি মেয়েকে শনাক্ত করেন। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হয়। ওই সময়ে ভদ্রেশ্বর পার করা আপ কামরুপ এক্সপ্রেসের চালক পরের স্টেশনে নকডাউন রিপোর্ট করেছিলেন। ওই ট্রেনের মোটরম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে রেল পুলিস জানতে পারে, ওই তরুণী রেল লাইনে আত্মঘাতী হয়েছেন। আত্মহত্যা কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। কোনও সুইসাইড নোটও মেলেনি। তদন্তকারীরা রীতিমতো অন্ধকারে হাতড়াচ্ছিলেন।
২০২৪’এর ৭ নভেম্বর ওই তরুণীর বাবা জিআরপিতে লিখিত অভিযোগ করে জানান, তাঁর মেয়ে ‘মানিটারি ব্ল্যাকমেলিং’এর শিকার হয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন। আত্মঘাতী হওয়া তরুণীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট দেখার পর মাথা ঘুরে যায় তদন্তকারীদের। তরুণীর বাবা গোপন জবানবন্দিও দেন আদালতে। অফিসাররা জানতে পারেন, শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ভালো রিটার্ন মিলবে, সাইবার জালিয়াতদের এই টোপ গিলেছিলেন ওই সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ফাঁদে পড়ে ২০২২ থেকে তিনি ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। বছর খানেকের মধ্যে তিনি ৩৮ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেন। টাকা রিটার্ন চাইলে বলা হয়, এখন তোলা যাবে না। আরও বিনিয়োগ না করলে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হবে। তাঁর বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি তাদের হাতে এসে গিয়েছে। সেগুলি ভাইরাল করে দেওয়া হবে। তরুণী ভয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে বসেন। বিনিয়োগের বিষয়টি বাড়ির কেউ জানতেন না। বারবার টাকা দাবি করায় এবং ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার হয়ে ওই তরুণী আত্মঘাতী হন।
তদন্তে উঠে আসে, ২১টি অ্যাকাউন্টে তরুণীর টাকা গিয়েছে। অসমের ‘এ কে ডিজিটাল স্টুডিও’ নামে একটি কোম্পানির মালিক আখতার হোসেনের অ্যাকাউন্টে প্রথমে টাকা ঢোকে। সেখানে থাকা মোবাইল নম্বর নিয়ে অফিসাররা দেখেন এর লোকেশন হল মরিগাঁওতে। শেওড়াফুলি জিআরপির ওসি প্রদ্যুৎ ঘোষের নেতৃত্বে একটি টিম ১৭ জুন আখতারকে গ্রেপ্তার করে ট্রানজিট রিমান্ডে কলকাতায় নিয়ে আসে। তাকে জেরা করে চক্রের বাকিদের খোঁজ চলছে।।