অথ যোগানুশাসনম্—এখন যোগের অনুশাসন শুরু হচ্ছে। যোগের মূল ধাতু হল যুজ্ (to unite, to join, to yoke) : ‘যুজ্ সমাধৌ’—চিত্তকে সমাহিত করা। পাতঞ্জল যোগের বিশেষ লক্ষ্য হল সমাধি। এটি হল অর্থসংকোচ। ‘যুক্ত করা’ অর্থে যুজ্ ধাতুর প্রয়োগ ঋদ্বেদেও পাওয়া যায়: ‘যুঞ্জতে মন উত যুঞ্জতে ধিয়ো’ এই মন্ত্রটি লক্ষণীয়। ‘মনকে যুক্ত করা’ যাকে মনোযোগ বলে তাই হল পতঞ্জলির যোগ; বৈদিক যোগ মুখ্যতঃ ‘ধী-যোগ’। বৃহতের সাথে মনকে যুক্ত করা, আর চিত্তকে সমাহিত করা— বৃত্তি নিরোধ করা—দুটির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে : বৃহতের সাথে যোগ আবেশের দ্বারা সম্পন্ন হয়, এই প্রক্রিয়া দ্বারা চিত্ত সংকোচের স্থলে চিত্তের ব্যাপ্তি হয়; মনোযোগে চিত্তকে অন্তরে সমাবিষ্ট করতে হয়। যোগসূত্রের ভাব কিছু উপনিষদে আর গীতায় পাওয়া যায়; বৌদ্ধদর্শনেও এর বিস্তার পাওয়া যায়। কঠোপনিষদ আর শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ হল বিশেষত: যোগ উপনিষদ, মুণ্ডকোপনিষদও অংশতঃ যোগ উপনিষদ; গীতাকে যোগশাস্ত্র বলা হয়। গীতায় যোগ শব্দের ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে: মনেযোগ আর ধী-যোগ দুইরূপে যোগের পরিচয় সেখানে পাওয়া যায়—“আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ”, “যোগী যুঞ্জীত সততমাত্মানং স্থিতঃ” ইত্যাদি পাতঞ্জল যোগের পরিচয় দেয়; “যোগস্থঃ কুরু কর্মানি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয়। সিদ্ধ্যাসিদ্ধ্যো সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে”, “যোগঃ কর্মসু কৌশলম্” “যুক্ত আসীৎ মৎপরঃ” ইত্যাদি পাতঞ্জল যোগের মূলসূত্র হতে ভিন্ন। পাতঞ্জল যোগে সমাধির বিশেষ প্রক্রিয়া দেখানো হয়েছে; পতঞ্জলির এর বিশ্লেষণ হল মূলতঃ মনোবৈজ্ঞানিক। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ করবার ফলে যোগসূত্রের ব্যঞ্জনা হল সার্বজনিক। যোগসূত্রের দার্শনিক ভিত্তি সাংখ্যদর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। পরমতত্ত্বের জ্ঞান হল সর্বদর্শনের লক্ষ্য; পরমতত্ত্ব হল ব্রহ্ম। তিনি সৎ, চিৎ ও আনন্দ; অসৎও তিনিই। ব্রহ্মের সাথে শক্তিকেও যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ব্রহ্ম হল অসৎ, সৎ, চিৎ-শক্তি ও আনন্দ। ষড়দর্শনের মূল দুইভাগ—এক, মীমাংসাপ্রস্থান, অপরটি তর্কপ্রস্থান। মীমাংসাপ্রস্থানের উত্তরমীমাংসা অংশ অনুসারে পরমতত্ত্বের অনুভব সত্তামাত্র, চিন্মাত্র এবং আনন্দরূপ, আর এই সকলের অতীত অসৎ-রূপেও সম্ভব। পূর্বমীমাংসা কিছুটা স্বতন্ত্র; কর্মকাণ্ডের প্রাধান্য হবার কারণে পূর্ব মীমাংসা যোগপ্রস্থান নয়। নীতিবাদের প্রভাবে প্রথম আনন্দতত্ত্বকে অস্বীকার করা হল: পরমতত্ত্ব অসৎ, সৎ আর চিৎ-রূপে সীমিত রয়ে গেল।
শ্রীমৎ অনির্বাণ রচিত‘অনির্বাণ আলোয় পাতঞ্জল যোগ-প্রসঙ্গ’ থেকে



