Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

যোগব্যায়ামে  ব্যারাম মুক্তি

যোগব্যায়ামে  ব্যারাম মুক্তি
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
তুষার শীল: ডায়াবেটিস মেলাইটাস যে কেমন অসুখ সে ব্যাপারে আমরা সকলেই জানি। এই অসুখ হয় শরীরে ইনসুলিনের অনুপস্থিতি, কম ক্ষরণ বা ইনসুলিন শরীরে সঠিকভাবে কাজ করতে না পারলে।
Advertisement
এও জানি একেবারে শৈশাবস্থায় যে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে সেটি টাইপ ১ ডায়াবেটিস। এই সমস্যা হয় শরীরে ইনসুলিন হরমোনের অনুপস্থিতি বা ইনসুলিন তৈরি না হলে। আর টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার পিছনে সম্পূর্ণরূপে দায়ী থাকে অসংযমী জীবনযাত্রা, স্থূলত্ব ইত্যাদি। 
টাইপ ১ ডায়াবেটিসের রোগীকে সারজীবনই ইনসুলিন নিয়ে চিকিত্‍সা চালিয়ে যেতে হয়। আমাদের আলোচনা মূলত টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ে। প্রশ্ন হল, স্থূলত্ব কীভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সমস্যাকে ত্বরান্বিত করে? 
আসলে আমাদের শরীরের কোষে থাকে ইনসুলিন রিসেপটর। এই রিসেপটরগুলি রক্ত থেকে কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ করতে সাহায্য করে। কারণ ওই রিসেপটরে ইনসুলিন যায় এবং কোষের মধ্যে গ্লুকোজ প্রবেশে সাহায্য করে। ইনসুলিন এক্ষেত্রে অনেকটা কোষের দরজায় লাগানো তালার চাবি হিসেবে কাজ করে। এখন কোনওভাবে একজন ব্যক্তি অতিরিক্ত মোটা হয়ে গেলে তখন ওই রিসেপটরগুলি স্বাভাবিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ইনসুলিনও আর কাজ করতে পারে না, কোষে কোষে গ্লুকোজও প্রবেশ করতে পারে না। রক্তে চিনির বন্যা বয়ে যায়!
এমতাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন বিশিষ্ট ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস বদলে, এক্সারসাইজের অভ্যেস করানো যায় তাহলে ধীরে ধীরে তার শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা কমতে থাকে। ইনসুলিনও সঠিকভাবে কাজ করতে থাকে। ওজন কমতে থাকে। একইসঙ্গে কয়েকটি বিশেষ যোগাসন ও প্রাণায়াম অভ্যেস করলে রোগী পুনরায় সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন। এমনকী সঠিক পদ্ধতিতে জীবনযাপন করলে সুগারের জন্য আলাদা করে কোনও ওষুধও খেতে হয় না। কারণ প্যাংক্রিয়াস গ্ল্যান্ড থেকে স্বাভাবিক মাত্রায় ইনসুলিন তৈরি হয় ও রিসেপটরগুলিও সঠিকভাবে কাজ করতে থাকে।
সুবিধা কী কী
• কিছু কিছু টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগীর সুগার এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে যে তাঁকে ইনসুলিন নিতে হয়। দেখা গিয়েছে নিয়মিত যোগাসন ও প্রাণায়াম করলে আগের মতো ইনসুলিন নিতে হচ্ছে না, তবে বয়সও একটা বড় বিষয়। খুব বেশি বয়সে সুগার ধরা পড়লে তখন হয়তো যোগাসন প্রাণায়ামে কম বয়সিদের মতো সুফল নাও পাওয়া যেতে পারে, তবে উপকার অবশ্যই মিলবে। ওষুধের ডোজও নিশ্চয়ই কমানো যাবে।
এছাড়া রোগী আগের থেকে অনেক সুস্থ অনুভব করবেন। রক্তে সুগারের ওঠা নামাও অনেক কম হবে। 
• জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মহিলাদের ক্ষেত্রেও পরবর্তীকালে সুগার হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন মহিলাদেরও উচিত নিয়মিত আসন ও এক্সারসাইজ করা।
নতুন জীবন
• তবে শুধু এক্সারসাইজ করলেই তো চলবে না, তার সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসও বদলাতে হবে অনেকখানি। বিশেষ করে ডায়েটে কিছুটা হলেও তেতো খাদ্য যোগ করতে হবে। করলা, নিমের মতো সব্জি রাখতেই হবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়।
• ভাত, রুটি, ময়দাজাতীয় খাদ্য কম খেয়ে সব্জি, স্যালাড  এগুলো বেশি করে খান। কারণ এই ধরনের খাদ্যে ক্যালোরির মাত্রা অত্যন্ত কম থাকে।
ডায়াবেটিসে কোন কোন আসন প্রাণায়াম?
শিবানন্দ ভ্রমণ প্রাণায়াম:  প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীর উচিত খাবার খাওয়ার পর হাঁটাহাঁটি করা। তবে হাঁটার সঙ্গে প্রাণায়ামও করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে উপকারও বেশি। তাই প্রথম ৪-৫ পা শ্বাস নিতে নিতে হাঁটুন আর ফের তার পরের ৪-৫ পা শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে হাঁটুন। দিনে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট এভাবে হাঁটলেই যথেষ্ট। এই বিশেষ ভ্রমণ প্রাণায়ামের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন বিশ্বখ্যাত যোগাবিশারদ শিবানন্দ সরস্বতী। 
জালান্ধার বন্ধ মুদ্রা: একটি দেওয়ালের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ান। দু’পায়ের মধ্যে ফাঁক থাকবে ৮-১০ ইঞ্চি। এবার হাত দুটি নিয়ে যান পিছন দিকে। এর ফলে বুকটা চিতিয়ে থাকবে। এবার শ্বাস নিতে নিতে মাথাটাকে পিছন দিকে হেলাতে হবে। আবার শ্বাস ছাড়঩তে ছাড়তে থুতনিটা এনে একেবারে গলায় ছুঁইয়ে দিন। এই অভ্যেসটিকে যোগের ভাষায় ‘জালান্ধার বন্ধ’ মুদ্রা বলা হয়। এভাবে বেশ কয়েকবার করতে হবে। এর সঙ্গে পারলে কাঁধটাকেও সামনে-পিছনে নিতে পারেন। এর ফলে থাইরয়েড ও প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি খুব ভালোভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এছাড়া প্যাংক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন হরমোন সঠিক মাত্রায় ক্ষরিত হয়।
জানুশিরাসন: যে আসনে অবস্থানের সময় জানু অর্থাত্‍ হাঁটুর উপর শির অর্থাত্‍ মাথা রাখতে হয়, সেই আসনকে বলা হয় জানুশিরাসন। এই আসনে প্যাংক্রিয়াসের কর্মক্ষমতা বাড়ে। হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম বা উৎসেচকগুলির ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয় এই আসনটি। এই যোগাসন করতে হলে প্রথমে সুখাসনে সোজা হয়ে বসুন। তারপর দুই পা সামনে প্রসারিত করুন। এরপর বাম পা ভাঁজ করে নিন ও এবার বাম পায়ের পাতা ডান পায়ের কুঁচকির কাছে স্পর্শ করুন। এতে বাম পায়ের পাতা ডান পায়ের ঊরুর কাছে লেগে থাকবে। এই অবস্থায় কোমর থেকে শরীরের বাকি অংশ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল ধরার চেষ্টা করতে হবে। ১০-১৫ সেকেন্ড এভাবে থেকে তারপর একই ভাবে পা বদলে ব্যায়ামটি করতে হবে।
ভুজঙ্গাসন: ভুজঙ্গের অর্থ সাপ। এই আসন করার সময় শরীরের ভঙ্গি অনেকটা সাপের ফণার মতো দেখতে লাগে বলে এই আসনটির নাম ভুজঙ্গাসন। অই আসনটি করার জন্য উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। কনুই থেকে ভাঁজ করে দুই হাত কাঁধের সমান্তরালে রাখুন। এক্ষেত্রে হাতের তালু থাকবে মাটির দিকে। এবার  ধীরে ধীরে হাতের তালুর উপর ভর দিয়ে কোমর থেকে মাথা বুক পর্যন্ত অংশকে বাতাসে তুলে ধরুন। মাথা থাকবে সোজা। ফলে সমগ্র ভঙ্গিটি দেখতে লাগবে অনেকটা সাপের ফণার মতো। এভাবে পূর্ণ ভঙ্গিমায় এসে ১০/১৫ সেকেন্ড অবস্থান করুন। এবার এই অবস্থাতেই শ্বাস নিতে নিতে মাথা পিছনে নিয়ে যেতে হবে। আবার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে সামনের দিকে মাথা নিয়ে আসতে হবে। এই আসনটি নিয়মিত করলে শ্বাসকার্যে সাহায্যকারী পেশি তো বটেই, শ্বাসকার্যে স্নায়ুগুলিও উজ্জীবিত হয়। ৩ থেকে ৫ বার করতে পারেন। প্রথম দিকে পা জোড় অবস্থায় আসনটি না করতে পারলে পা দু’টো সুবিধা মতো ফাঁক করে অভ্যেস করতে পারেন। ধীরে ধীরে শরীর নমনীয় হলে সঠিক ভঙ্গিমায় আসনটি করতে পারবেন।
উত্থান পদাসন: চিৎ হয়ে শুয়ে শরীরের দু’পাশে রাখতে হবে দু’হাত। দুই পা জোড়া ও সোজা রেখে মাটি থেকে এক হাত উঁচুতে তুলে রাখতে হবে। স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসে মনে মনে দশ থেকে ক্রমশ বাড়িয়ে তিরিশ গোনার পর পা মাটিতে নামিয়ে শবাসনে বিশ্রাম নিতে হবে। এভাবে ৩ থেকে ৫ বার করতে হবে।
জালন্ধর মুদ্রা সহযোগে বিশ্বশ্রী মনতোষ রায় প্রাণায়াম: সোজা হয়ে দাঁড়ান দুপায়ের মধ্যে ৮/১০ ইঞ্চি ফাঁক রেখে। দু হাত পিছনে নিয়ে গিয়ে এক হাতের তালু দিয়ে অন্য হাতের তালু ধরুন। এবার শ্বাস নিতে নিতে কাঁধ ও মাথা পিছনে নিয়ে যান যতটা পারবেন। পারলে পিঠের পালখা দুটি একে অপরের সঙ্গে লাগিয়ে দিন। এবার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে থুতনিটা এনে গলাতে লাগিয়ে দিন সঙ্গে দু’কাঁধ সামনে এনে বুকের পেশীতে চাপ দিন কিন্তু দু’হাত সর্বদা পেছনেই ধরা থাকবে। যোগের ভাষাতে এটি জালান্ধর বন্ধ মুদ্রা অনুরূপ। এতে থাইরয়েড প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির কাজ খুব ভালো হয়। তলপেট টেনে রেখে এই প্রাণায়ামটা করলে প্যাংক্রিয়াস গ্রন্থির কাজ ভালো হয়। ফলে ইনসুলিন হরমোন সঠিক মাত্রাতে ক্ষরিত হয়। ১০/১৫ বার এ প্রণায়ামটি করুন।
লেখক : রাজ্য যোগা ও ন্যাচেরোপ্যাথি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও যোগ বিশারদ
লিখেছেন: সুপ্রিয় নায়েক
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ