


বেজিং: স্বশাসিত তাইওয়ানে আমেরিকার হস্তক্ষেপ বরদাস্ত নয়! বৃহস্পতিবার বেজিংয়ের বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একথা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিলেন জি জিনপিং। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় চীনের প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তা, তাইওয়ান ইস্যুর অপব্যবহার হলে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দুই দেশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। চীনের সরকারি সংবাদ মাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে জিনপিং স্পষ্ট বলেছেন, চীন-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাইওয়ান প্রণালীর শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকা। ‘সুপার পাওয়ার’ দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকে হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার ইস্যুটিও উঠেছে। হোয়াইট হাউসের তরফে বিবৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, জ্বালানির অবাধ প্রবাহের স্বার্থে হরমুজ প্রণালী মুক্ত থাকাটা আবশ্যক বলে সহমত পোষণ করেছেন ট্রাম্প ও জিনপিং। হরমুজে সামরিক শক্তির আস্ফালন ও সেখানে টোল আদায়ের চেষ্টা নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ওই প্রণালীর উপর নির্ভরতা কমাতে ভবিষ্যতে আমেরিকা থেকে তেল কেনার বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছেন জিনপিং।
ইরান সংঘাত ও শুল্কযুদ্ধের আবহে নিজের দেশেই প্রবল চাপের মুখে ট্রাম্প। সেই প্রেক্ষিতেই তাঁর চীন সফরের দিকে চোখ ছিল গোটা বিশ্বের। ৯ বছর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেজিং এলেন। সঙ্গে প্রথম সারির মার্কিন সংস্থাগুলির শীর্ষকর্তারা। দু’দিনের এই সফরের শুরুতেই আয়োজক দেশের সর্বোচ্চ নেতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন ট্রাম্প। জিনপিংকে কখনো ‘মহান নেতা’, আবার কখনো ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধনও করেন। দুই দেশ মিলে ‘চমৎকার ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলার আহ্বানও জানান। তুলনায় জিনপিং অনেক সংযত ছিলেন আগাগোড়া। তাঁর বক্তব্য, ‘স্থিতিশীল চীন-মার্কিন সম্পর্ক গোটা বিশ্বের কাছে আশীর্বাদ হতে পারে। সহযোগিতায় দু’পক্ষেরই লাভ, সংঘাতে ক্ষতি। প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোগী হয়ে ওঠা উচিত আমাদের। চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাইওয়ান ইস্যু। এই ইস্যুটি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মূলত স্থিতিশীলই থাকবে। অপব্যবহার হলে দুই দেশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।’ ঘটনাচক্রে তাইওয়ান সদ্য বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, আমেরিকার দিক থেকে পাশে থাকার বার্তা ফের নিশ্চিত করা হয়েছে। সেই আবহেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই ইস্যুতে সরাসরি ট্রাম্পকে সতর্ক করলেন জিনপিং। চীনা প্রেসিডেন্টের কথায়, তাইওয়ানের তথাকথিত স্বাধীনতা মৌলিকভাবে বেমানান।
স্বশাসিত গণতান্ত্রিক তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে চীন। এই দ্বীপভূমি ঘিরে তারা সামরিক মহড়ার গতিবিধিও বাড়িয়েছে। গত বছর তাইওয়ানের জন্য ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করে ট্রাম্প প্রশাসন। তা অবশ্য এখনও কার্যকর হয়নি। তবে চীন যে বিষয়টিকে লঘু করে দেখছে না, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে তা স্পষ্ট করে দিলেন জিনপিং। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ইতিবাচক বার্তা এসেছে তাঁর তরফে। চীনা প্রেসিডেন্টের সাফ কথা, আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হলে তা দু’পক্ষের কাছেই লাভজনক হবে। মার্কিন বাণিজ্যের জন্য চীনের দরজা আরও প্রশস্ত হওয়ার আশ্বাসও শোনা গিয়েছে তাঁর গলায়। ঘটনাচক্রে, এদিন ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ ট্রাম্পের সঙ্গেই ছিলেন শীর্ষ মার্কিন কোম্পানিগুলির সিইওরা। এলন মাস্ক, টিম কুক— তালিকাটা দীর্ঘ। আর টেবিলের উলটোদিকে স্বয়ং জিনপিং। আলোচনার মূল এজেন্ডা কী ছিল? ইরান, তাইওয়ান, রেয়ার আর্থ, এআই, বাজারের প্রবেশাধিকার— কার্যত সব কিছুই। গোটা বিশ্বেরই প্রত্যাশা, ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠক থেকে যুদ্ধের আগুনে জল পড়বে। একইসঙ্গে শুল্কযুদ্ধ পিছনে ফেলে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে বাণিজ্য।