


সাঙ্গ হয়েছে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন (একটিমাত্র আসন বাদে)। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে বিজেপি। নতুন সরকার গঠন কেবল সময়ের অপেক্ষা। তার আগে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরসহ সরকার পরিচালিত হবে রাইটার্স বিল্ডিংস বা মহাকরণ থেকে। অর্থাৎ নবান্ন আর রাজ্যের প্রধান সচিবালয় হিসাবে গণ্য হবে না। নতুন মুখ্যমন্ত্রী আগামী দিনে নবান্নের বদলে বসবেন ঐতিহ্যবাহী লালবাড়ি রাইটার্সে। রাজ্যের রাজধানী শহরের প্রাণকেন্দ্র ডালহৌসি অঞ্চলের মহাকরণেই অতীতের সমস্ত মুখ্যমন্ত্রী বসেছেন। স্বাধীনতার পর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ থেকে তাঁর উত্তরসূরিগণ—বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থশংকর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সকলেই সরকার পরিচালনা করেছেন রাইটার্স থেকে। ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও অভিষেক হয়েছিল ওই বাড়িতে। সে-বছর ২০ মে লোকভবনে (আগের নাম রাজভবন) শপথ গ্রহণের পর বিরাট শোভাযাত্রাসহ মমতা রাইটার্সে প্রবেশ করেন। টানা ৩৪ বছরের সিপিএম-শাহির পতনের পর রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পরিবর্তনের সরকার’ বা ‘মা-মাটি-মানুষের সরকার’। সরকারে আসার আগে সুদীর্ঘ গণআন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মনে রাখতে হবে, তাঁর বেশিরভাগ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাইটার্স! সেগুলি নাম পেত ‘রাইটার্স চলো’ কিংবা ‘মহাকরণ অভিযান’। মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিবছর ২১ জুলাই ‘শহিদ দিবস’ পালন করে। তাঁর দলের ১৩ জন সৈনিক কলকাতার রাজপথে জ্যোতি বসুর পুলিশের গুলিতে নিহত হন। যুব কংগ্রেস নেত্রী হিসাবে মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন মমতা। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েই হাজারে হাজারে মানুষ যাচ্ছিলেন রাইটার্সে। তাঁদের রুখতেই বেপরোয়াভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী। সোজা কথায়, মমতার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে রাইটার্স নামটি নানাভাবে সম্পৃক্ত।
মমতা ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ওই বাড়িতেই অফিস করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কার্যালয় ছিল বাড়িটি। ভবনটির আমূল সংস্কারে হাত দিয়ে অতঃপর তাঁর দপ্তর সরিয়ে নেওয়া হয় হাওড়ায় নবান্নে। এবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী হলে তাঁর চতুর্থ সরকার নবান্ন থেকেই পরিচালিত হত বলেই অনুমান করা যায়। কিন্তু বাংলার মানুষ এই নির্বাচনে তৃণমূলের বদলে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। মোদি-শাহের পার্টির রাজ্য নেতৃত্ব নবান্নে যেতে রাজি নন। তাঁদের তরফে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে বিবাদী বাগে লালদিঘির পাড়ের ঐতিহাসিক ভবন থেকেই চলবে নতুন সরকার। এই ভবনের সংস্কার কাজ যতটা বাকি আছে সেটা দ্রুত সেরে ফেলতেই উদ্যোগী রাজ্য প্রশাসন। এই খবর চাউর হতেই বহু মানুষ খুশি। বিশেষ করে অসংখ্য মানুষের রুটিরুজি চলত রাইটার্সের ভরসায়। কয়েক হাজার কর্মী ওখানে অফিস করতেন। এছাড়া বহু মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে রাইটার্সে আসতেন রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে। তাঁদেরকে সামনে রেখেই সেজে উঠেছিল পরিবহণ ব্যবসা, খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্য ও পরিষেবার কারবার। হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজি চলত। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরসহ রাজ্যের প্রধান সচিবালয় গঙ্গার পশ্চিম পারে সরে যাওয়ায় ওই মানুষগুলি বিপাকে পড়ে যান। অন্যান্য মানুষেরও সমস্যা হয় এজন্য।
রাইটার্সে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর আবার ফিরে আসবে জেনে বহু মানুষ খুশি, তাঁরা সরাসরি আনন্দ প্রকাশও করেছেন এতে। আমরা জানি, রাইটার্স নিছক একটি সরকারি বাড়ি নয়, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনেরও কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল একদা। ভবনটি ইংরেজ আমলে শহরের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র বিবেচিত হত। বাংলার বিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং জাতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করেছিল। সুপ্রাচীন এই ভবনটি মূলত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাইটারদের (জুনিয়র ক্লার্ক) প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয় ছিল। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি এবং পরবর্তীতে বেঙ্গল প্রভিন্স সরকারের আসন হিসাবে ব্রিটিশ ক্ষমতা ও দাবির কেন্দ্রস্থল বিবেচিত হত। বিচার, বাণিজ্য, বিজ্ঞান এবং কৃষির অগ্রগতির প্রতীক হিসাবে বসানো হয়েছিল সংশ্লিষ্ট গ্রিক দেব-দেবীর মূর্তি। আশা করা যায়, এই হেরিটেজ বিল্ডিংসকে কেন্দ্র করে আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এই বাড়ি ফের রাজ্যের সার্বিক অগ্রগতির প্রতীক হয়ে উঠবে এবং ভারতসভায় বাংলার শ্রেষ্ঠ আসন প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হবে।