আগামী শুক্রবার সরস্বতী পুজো। বিদ্যাদেবীর আরাধনা মানেই স্কুলে হইহই, খাওয়াদাওয়া। কেমন কাটবে সরস্বতী পুজো জানাল শতাব্দী প্রাচীন বালি বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ছবিও আঁকল তারা।
আগামী শুক্রবার সরস্বতী পুজো। বিদ্যাদেবীর আরাধনা মানেই স্কুলে হইহই, খাওয়াদাওয়া। কেমন কাটবে সরস্বতী পুজো জানাল শতাব্দী প্রাচীন বালি বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ছবিও আঁকল তারা।
মিলন উৎসব
‘বীণা পুস্তক রঞ্জিত হস্তে / ভগবতী ভারতী দেবী নমস্তুতে।।’ বিদ্যার দেবী সরস্বতী। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে দেবীর আরাধনা হয়। এবছর আমাদের স্কুলের সরস্বতী পুজো স্পেশাল। কারণ, কিছুদিন আগেই বালি বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয় শতবর্ষ উদ্যাপন করল। লিঙ্গবৈষম্য দূর করে আমাদের স্কুলের পুজোয় পৌরোহিত্য করেন এই স্কুলেরই তিন ছাত্রী। আমাদের উপরও প্রচুর দায়িত্ব থাকে। অন্য স্কুলকে নিমন্ত্রণ করা, পুজোর বাজার করা, সাজানো, আলপনা দেওয়া সব কাজ আমরা ছাত্রীরা করি। অবশ্যই একাজে শিক্ষিকারাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। প্রতি বছর সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে যে আঁকা হয়, তাতে আমি যোগদান করি। আমি ও আমার বন্ধুরা স্কুলেই পুষ্পাঞ্জলি দিই। এখানকার বাগদেবীর আরাধনা মিলন উৎসবের চেহারা নেয়।
পর্ণা কংসবণিক নবম শ্রেণি
শাড়ি পরার আনন্দ
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। সারা বছরই নানা ঠাকুর-দেবতার আরাধনা হয়। তবে, ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম উৎসব সরস্বতী পুজো। আমরা যারা পড়ুয়া, বিদ্যার দেবীকে ঘিরে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার সীমা পরিসীমা নেই। সরস্বতী পুজো মানেই শাড়ি পরতেই হবে। আর সেই শাড়ির রং হতে হবে হলুদ। সেজেগুজে স্কুলে যাওয়া। বইপত্র ছাড়া স্কুলে যাওয়ার আনন্দই অন্যরকম। এদিন কোনওরকম চাপ ছাড়া অনাবিল আনন্দ উপভোগ করি। দেবীর পায়ে বই দেওয়া হয়। দেবীকে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়। সরস্বতী পুজোর সঙ্গে খিচুড়ির ওতপ্রোত সম্পর্ক। মায়ের হাতের খিচুড়ির স্বাদের কোনও তুলনা হবে না।
অদ্রিকা সরকার, সপ্তম শ্রেণি
প্রাণের উৎসব
আমাদের স্কুলের সরস্বতী পুজো শুধু একটি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান নয়, আমাদের কাছে প্রাণের উৎসব। বসন্ত পঞ্চমী দিনটির জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি। সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে এত আনন্দ স্কুলের আর কোনও অনুষ্ঠানে হয় না। ‘আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি...’ রবি ঠাকুরের এই গানখানি যেন এই দিনগুলিতে সার্থক হয়ে ওঠে। সকলেই কোনও না কোনও কাজে ব্যস্ত। কেউ সাজানোর দায়িত্বে তো কেউ প্রতিমা আনার দায়িত্বে। দেবী সরস্বতীর কাছে আমাদের একটাই প্রার্থনা— বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও। মহিলা পুরোহিতের পৌরোহিত্য আমাদের পুজোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এমন একটি স্কুলের ছাত্রী হিসেবে আমি গর্ব বোধ করি।
প্রিয়াঙ্কা প্রধান নবম শ্রেণি
একরাশ আনন্দ
স্কুল জীবনের অন্যতম আকর্ষণ সরস্বতী পুজো। এই পুজোকে কেন্দ্র করে ঘিরে ধরে একরাশ স্মৃতি। টুকরো টুকরো কত আনন্দ। বাড়িতেও চলে পুজোর প্রস্তুতি। স্কুলের পুজোর আর বাড়ির পুজো মিলে একেবারে হুলুস্থুল পড়ে যায়। বাবার সঙ্গে পুজোর বাজার করতে যাওয়ার আনন্দও অন্যরকম। কোন ঠাকুর কিনব, কীভাবে সাজাব— সেই নিয়ে চলে নানান পরিকল্পনা। আলপনা দিতে মাকে সাহায্য করি। পুজোর জায়গাটা ফুল দিয়ে সাজাই। উপোস করে থাকি। সকাল সকাল পুষ্পাঞ্জলি দিই। তারপর সেজেগুজে স্কুলে যাওয়া। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা, প্রসাদ খাওয়া। সারাটা দিন হইহই করে কাটে। সেই পুজোর গন্ধ মেখে একরাশ আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরা।
প্রিয়াঙ্কা চট্টোপাধ্যায় ষষ্ঠ শ্রেণি
ব্যতিক্রমী পুজো
গত ২ জানুয়ারি আমাদের স্কুলের শতবর্ষ উদ্যাপন শুরু হয়েছে। চলবে আগামী একবছর ধরে। আয়োজন করা হবে নানা অনুষ্ঠানের। হাওড়া জেলার বালি অঞ্চলের এক গর্বের স্কুল এই বঙ্গশিশু। ইতিমধ্যে ঠাকুর বায়না দেওয়া, নিমন্ত্রণ করার কাজ হয়ে গিয়েছে। প্রতিমার সাজসজ্জা থেকে আলপনা সর্বত্রই থাকে অভিনবত্বের ছোঁয়া। প্রতি বছর সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় প্রদর্শনীর। কখনও থিম হয় পশ্চিমবঙ্গের প্রধান শস্য, কখনও শতবর্ষের আলোকে সুকুমার রায় বা সলিল চৌধুরী। কমিটি গঠন করে মাস দু’য়েক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজোর প্রস্তুতি। ছাত্রীদের অভিভাবকদের পাশাপাশি এলাকার মানুষজনও আমাদের স্কুলে ঠাকুর দেখতে আসেন।
তৃষা মাইতি দশম শ্রেণি
প্রধান শিক্ষিকার কলমে
এই স্কুলের নামকরণ ও প্রার্থনা সঙ্গীত নির্বাচনে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ ভূমিকা। তাঁরই লিখিত শুভেচ্ছাপত্রটি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে গর্বের সম্পদ। সেই আশীর্বাণীকে পাথেয় করে ‘বালি বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়’ আজ শতবর্ষের আঙিনায়, যার সূচনা হয়েছে গত ২ জানুয়ারি। শত শত ছাত্রী, অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষিকার কলতানে মুখরিত এই শিক্ষাঙ্গন। বালি, বেলুড়, উত্তরপাড়া ও বেলানগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।
১০০ বছর আগের ইতিহাস অন্য কথা বলে। শিক্ষা তখন সোনার পাথরবাটি। কুসংস্কার, ধর্মের ভণ্ডামিতে মোহগ্রস্ত সমাজ। গ্রামই ছিল হাওড়া জেলার বালি অঞ্চলটি। সলতে পাকানোর কাজ শুরু হল ১৯২১ সালে। এগিয়ে এলেন কয়েকজন শিক্ষানুরাগী। তাঁদের অন্যতম শ্রী মোহিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ পাল, বনবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাকুমার মুখোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বিশ্বাস, অক্ষয় সুর প্রমুখ। এঁদের হাত ধরেই শুরু হল ‘প্রাথমিক’-এ শিক্ষাদান।
প্রথমে ছেলে ও মেয়েরা একসঙ্গে ক্লাস করলেও ১৯২৭ সালে বালিকা বিভাগ আলাদা হয়ে যায়। নামকরণ করা হল— ‘বালি বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়’। বহু প্রতিকূলতাকে জয় করে ১৯৪৪ সালে জুনিয়র হাই স্কুল এবং ১৯৫৭ সালে হায়ার সেকেন্ডারি স্তরে উন্নীত হয়। এখন উচ্চ মাধ্যমিকস্তরে এই বিদ্যালয়ে ২৭টি বিষয় পড়ানো হয়। চেনা পরিচিত বিষয়গুলির সঙ্গে রয়েছে সায়েন্স অব ওয়েল বিইং, এআই ইত্যাদি। ক্রীড়া ক্ষেত্রে সাঁতার ও জিমনাস্টিক্সে ছাত্রীরা জাতীয়স্তরে কৃতিত্বের অধিকারী। বিতর্ক, মিউজিক, নাচ, ক্যুইজ সবেতেই এখানকার পড়ুয়ারা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। পিছিয়ে পড়া ছাত্রীদের প্রতি আলাদা নজর দেওয়া হয়। বর্তমানে ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ৭০০। তাদের যেকোনও সমস্যায় শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীরা মিলিতভাবে পাশে দাঁড়ান। স্কুলের উন্নয়নে প্রাক্তনীদের অবদান প্রশংসনীয়। প্রাক্তন ছাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়, চিকিৎসক শিউলি মুখোপাধ্যায়, সাঁতারু ইন্দ্রানী বাগ প্রমুখ।
স্কুলের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে বছরভর চলবে হবে নানান অনুষ্ঠান। এই স্কুল শিক্ষা জগতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে উঠুক এই কামনা করি।
—সোনালী দত্ত
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা