Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

আজ বিশ্ব চা দিবস: লক্ষ্মীনারায়ণ কেবিনে থমকে আছে ঘড়ির কাঁটা, বাগবাজারে এখনও দু’টাকায় এক কাপ চা

যাঁদের পকেটে তেমন টাকা নেই অথচ তেষ্টায় ছাতি ফাটছে, তাঁদের জন্য মাঝ রাত থেকে বিশ্বনাথ করণ জেগে থাকেন।

আজ বিশ্ব চা দিবস: লক্ষ্মীনারায়ণ কেবিনে থমকে আছে ঘড়ির কাঁটা, বাগবাজারে এখনও দু’টাকায় এক কাপ চা
  • ২১ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: যাঁদের পকেটে তেমন টাকা নেই অথচ তেষ্টায় ছাতি ফাটছে, তাঁদের জন্য মাঝ রাত থেকে বিশ্বনাথ করণ জেগে থাকেন। দু’টি মাত্র টাকা কিংবা সেটিও না থাকলে এক কাপ চা হাতে তুলে দেন।

Advertisement

সকালে কাগজ বিক্রি করতে যাওয়ার আগে গলা ভেজাতে বা সব্জি বেচতে যাওয়ার আগে তেষ্টা মেটাতে বড় ভরসা বিশ্বনাথ। বাগবাজার বাটার মোড় থেকে গঙ্গার দিকে এগলে বাঁ হাতে পড়ে তাঁর দোকান। সেটি খোলে রাত সাড়ে তিনটের সময়। দোকানের নাম ‘লক্ষ্মীনারায়ণ কেবিন’। শ্যামবাজার-বাগবাজারের বহু প্রবীণ বলেন, ‘এ দোকান আজকের নয়। নয় নয় করে শ’খানেক বছরের পুরনো বুঝলেন। দাদু আসতেন। তারপর বাবা। এখন আমি আসছি।’ সমাজমাধ্যমে অনেকে দাবি করেন, ‘লক্ষ্মীনারায়ণ কেবিনের প্রতিষ্ঠা সাল ১৯১৩।’ 
‘চায়ের নামে যে সাড়া নাহি দেয়, চাষাড়ে তাহারে কও/ চায়ে যে ‘কু’ বলে, চাকু দিয়ে তার নাসিকা কাটিয়া লও’-স্বয়ং নজরুল চায়ে মশগুল হয়ে চা বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। চা নিয়ে আপামর বাঙালির রোমান্টিকতা কম নয়। বহু স্বনামধন্য কবি চা নিয়ে কলম ধরে নিজের মুগ্ধতা জানিয়েছিলেন। আজ ২১ মে। এই দিনটি ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ হিসেবে ঘোষিত। আজ বিশ্বনাথ করণের সঙ্গে দেখা করে দু’টাকার চা খাওয়াই যায়। বিশ্বনাথবাবু বলেন, ‘এ দোকানের বয়সের কি গাছপাথর আছে? আমি নিজেই তো ছয়ের দশকে কাজে ঢুকি।’ তখন তিনি বালক। এখন প্রৌঢ় হয়েছেন। কালো-দোহারা চেহারা। লাভের থেকে খদ্দেরদের দিকে বেশি নজর। পয়সা নেই বলে কেউ এসে না খেয়ে ফিরে যাবে তার জো নেই। তাই লাভ কম হলেও দু’টাকা দামের চা রেখেছেন। আর আছে কিছু সস্তার খাবার। রয়েছে আলুর দম-মুড়ি। আর আছে মুড়ি-ডিমকষা। দাম কুড়ি টাকা। ‘এই খাবারটি এই দোকানের নিজস্ব আইটেমই বলা চলে। কলকাতার অন্য কোথাও তো দেখিনি’-বললেন ৭০ বছরের এক নিয়মিত ক্রেতা। 
রাস্তা থেকে একটু একটু উঁচুতে কেবিনটি। বাইরে হলুদ সাইনবোর্ডে চায়ের প্রস্ততিসূচক কথাবার্তা লেখা। পাশে কাউন্টার। সেখানে দাঁড়িয়ে বিশ্বনাথ দ্রুত হাতে চা বানান। ভিতরে ছ’জনের বসার নড়বড়ে টেবিল। জলভর্তি চৌবাচ্চা দোকানের ভিতরেই আছে। অন্দরমহলের দেওয়াল কালো হয়ে গিয়েছে। দেখলে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমার দৃশ্যের মতো লাগে। ‘একটি রাত’ সিনেমায় তুলসি চক্রবর্তীর যে অতিথি নিবাসটিতে উত্তমকুমাররা রাত কাটাতে গিয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকের সে অতিথি নিবাসটির মতো অনেকটা দেখতে লাগে লক্ষ্মীনারায়ণ কেবিনটিকে। সেখানে কাজ করতে করতে বিশ্বনাথ বালক থেকে প্রৌঢ় হয়েছেন। কিন্তু বাপ-ঠাকুদ্দার সে কালে দেওয়া শিক্ষা মোটেও ভোলেননি। টাকা না থাকলে এই ২০২৫ সালেও কেউ না খেয়ে ফেরে না। কি টাকাপয়সার দিক থেকে, কি দৃশ্যত, কলকাতা যেন লক্ষ্ণীনারায়ণে এসে ১০০ বছর আগের সময়ে থমকে থাকে। চা দিবসে বিশ্বনাথের দোকানে বসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পড়তে ভালো লাগবে। তিনি অনুবাদ করেছিলেন চীনা কবিতা-‘প্রথম পেয়ালা কণ্ঠ ভেজায়/ দ্বিতীয় পেয়ালা জড়তা নেশা/তৃতীয় পেয়ালা মশগুল করে মজলিশ ক্রমে জমিয়া আসে...।’ লক্ষ্মীনারায়ণ কেবিন গত ১০০ বছর ধরে মজলিশ জমাচ্ছে। কলকাতা চায়, আরও হাজার বছর দু’টাকার চায়ে তুফান উঠুক।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ