নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ওঁরা ভোরবেলা বাড়ি থেকে বেরন। শিয়ালদহে ফল কিনতে যান। বিক্রি করেন। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে রান্নাবান্না করেন। এত কাজের ফাঁকে অনিতা-অঞ্জলিদের নারী দিবস উদযাপনের অবকাশ থাকে না। এত পরিশ্রম কেন? কারণ, নিজেদের ছেলে-মেয়েরা যেন পড়াশোনা করতে পারে। মায়ের মতো যেন না হতে হয়। শিয়ালদহ থেকে নারী দিবস উপলক্ষ্যে বামেদের মিছিলের ভিডিও করছিলেন অনিতা। সামনে ঝুড়ি ভরা লেবু। বললেন, ‘বাড়িতে দৃষ্টিহীন মা থাকেন। এক ছেলে ক্লাস টুয়েলভে পড়ে। আর এক ছেলে সেলাইয়ের কাজ শিখছে। আজ নারী দিবস ভুলেই গিয়েছিলাম। মিছিল দেখে মনে পড়ল।’
মিছিল চলে গেল শিয়ালদহ ছেড়ে। মল্লিকপুরের ময়না সাহু তখন কয়েকটা বেদানা নিয়ে বসে শিয়ালদহে। হাতে ছাতা। বললেন, ‘সেই ভোরে বেড়িয়েছি। নারী দিবসের কথা আমার মনে আছে। নাতনিরা স্কুলে পড়ে তো। আমাকে বলেছে, কিছু টাকা দিও। নারী দিবস তাই তোমার জন্য গিফ্ট কিনব। আর কয়েকটা বেদানা বিক্রি করেই ট্রেন ধরব।’ সোয়া চারটে নাগাদ বারুইপুর লোকাল আসে। সেটাই ধরবেন। নিজের রোজগারের টাকা দেবেন নাতনিদের। তারা গিফট কিনবে। সে আনন্দে চোখ চকচক করছে প্রৌঢ়া ময়নাদেবীর। তাঁর কাছেই বসে অঞ্জলি দেবনাথ। বললেন, ‘ছেলে বেঙ্গালুরুতে থাকে। ওকে টাকা পাঠাতে হয়।’ ময়না জিজ্ঞেস করলেন, ‘মিছিলটা কাদের?’ শুনে আবার বিক্রিতে মন দিলেন।
শহরে মিটিং-মিছিল চলতেই থাকে। শ্রমজীবী নারীদের জন্য আস্ত একটা দিবস আন্তর্জাতিকও হয়। দাবি ওঠে, ‘সম কাজে সম বেতনের’। তা শুনতে শুনতে জীবনযাপন একটু ভালো করার জন্য লড়াই চলতেই থাকে অনিতা-অঞ্জলি-ময়নাদের। মনে হয় মিছিলের প্রবল শব্দের মধ্যেও তাঁদের সমস্বর সব ছাপিয়ে শোনা যায়, ‘কী করব বলুন তো! সংসার চালানোর জন্য খাটতে তো হবেই। নারী দিবস বলে ছুটি নেব, সে ভাগ্য আমাদের দেয়নি ভগবান।’