শান্তনু দত্তগুপ্ত: নিরুপমা কি সাহিত্যলোকের ওপার থেকে দেখলেন তাদের? রিয়া, সাক্ষী, বা ১৬ বছরের ওই মেয়েটিকে? দিল্লি থেকে পাটনা, কিংবা মুম্বই। ছবিটা যে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল! এরা আজকের মেয়ে। জেন জি। শ্বশুরবাড়িতে গেলে এদের উঠতে বসতে খোঁটা শুনতে হয় না। একটু ভুল হল, শ্বশুরবাড়ি যাবে কি না, সেটাও তারাই ঠিক করে। শুধু নিজের নয়, দেশের... সমাজের অধিকারের জন্য তারা লড়াই করে। দিল্লি বিক্ষোভে যখন পুলিশ লাঠি চালাল, ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন ২১ বছরের সাক্ষী। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। মঞ্চ নয়, পথই ছিল তাঁর লক্ষ্য। আর লক্ষ্য ছিল পরিবর্তন। সিস্টেমের। ছেলেমেয়ে বিচার? করেননি তিনি। জাত-ধর্ম? সেটাও না। দু’হাত ছড়িয়ে তাঁর ‘সহযোদ্ধা’দের আগলে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। আঘাত আছড়ে পড়েছিল তাঁর গায়ে। একবারও ভাবেননি, যার গায়ের লাঠি তিনি নিজের উপর নিলেন, তিনি হিন্দু না মুসলিম। পুলিশের তাড়ায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া ভিড়ে চাপা পড়েছিলেন সাক্ষী। যখন তাঁকে উদ্ধার করা হয়, তিনি অচেতন। রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। লড়ছিলেন তিনি মৃত্যুর সঙ্গেও। হারেননি। কারণ, রাজপথে জয় তখনও হয়নি তাঁদের। যে কারণে তিনি নেমেছিলেন... লড়েছিলেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সেই জয়ের স্বাদ পাননি। এমনটাও কি হয়? হতে পারে? একটি মেয়ে... সে ঝাঁসির রানি নয়। প্রভাবশালী পরিবারের স্ট্যাম্প তার গায়ে নেই। রাজনীতির সঙ্গে যোগ নেই। তাও সে রুখে দাঁড়ায়। এরকম কিছু যে হতে পারে, ভাবতেও পারতেন না নিরুপমা। বাবার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হত না, সেটাও মুখ বুজে সইতেন তিনি। আর সাক্ষীরা? তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্ক করে, বোঝায়, আর আন্দোলনের ডাক দেয়। প্রচারের আলোয় আসা তাদের উদ্দেশ্য নয়। ব্যক্তি হিসাবে নয়, সমষ্টি রূপেই তাদের সাফল্য। তাই ব্যারিকেড হয়ে আন্দোলনকারীদের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর খুঁজতে হয় আমাদের... কে এই মেয়ে? এ কোন লক্ষ্মীবাঈ? কোন ইতিহাস নিঃশব্দে গড়ে ফেলল সে?
নিরুপমা কি ভাবছেন, আমিও তো পারতাম ওই হুডি পরা মেয়েটার মতো? যদি আমার সময় সমাজ এমনটা হত। যদি পাশে পেতাম কাউকে। বাবা... ভাইরা। রায়বাহাদুর নামটাকে তখন এই সমাজ কতই না ভয় পেত। অন্যায় করলেও মেনে নিত... মাথা নিচু করে। প্রতিটা ঘরে বাস করত এক একটা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রশক্তি। কেউ রুখে দাঁড়াত না। সাহস করত না। কিন্তু আজ ওই মেয়েটা দাঁড়িয়েছে। প্রিজন ভ্যানের সামনে। বলেছে, আমার ‘সহযোদ্ধা’দের নিয়ে যেতে দেব না। যেতে হলে আমার উপর দিয়ে চালিয়ে দাও। আমি দাঁড়িয়েই থাকব। লড়ে যাব। আজ এই ছবিটাই যে আন্দোলনের আইকন...। জেন জি’র প্রতিনিধি। রিয়া আহির। শহরটা মুম্বই। কিন্তু সত্যিই কি শহর বা জনপদের নাম এই আন্দোলনে কোনো ফারাক গড়েছে? এক কিশোরী, আর তার অদম্য সাহস। ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে তো সে-ও। নিরুপমা হয়তো ভাবছেন... লোকে কী বলল, সমাজ কোন চোখে দেখল, কিছুতেই কি কিছু আসে যায় না এদের? পুলিশ মারে ওদের। পেলেট গান চালায়। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট তাড়া করে, খোঁজে কী কী পোস্ট হয়েছে। ছেলেমানুষদের নিয়ে আসে থানায়। মুচলেকা লেখায়। তারা ভয় পায়... ইজ্জত নষ্ট হওয়ার, কেরিয়ারের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যাওয়ার। তবু তারা লড়ে। বারবার যেন বলে ওঠে, ‘সভ্যতা আজ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে/বাঁচাব না তাকে? দেব না দু’হাত বাড়িয়ে?’
স্কুল ইউনিফর্ম পড়া ওই মেয়েটির দেখে কি কেঁপে উঠেছেন নিরুপমা? স্কুল না গিয়ে যন্তর মন্তরে এসেছে সে। আঙুল তুলে এই পৃথিবীকে বলছে, ‘আমাদেরও ভোট দেওয়ার সময় আসবে। কাউকে ভোট দেব না। সবাই চোর।’ তাঁদের সমাজে মেয়েদের ‘পণবন্দি’ হতে দেখেছিলেন নিরুপমা। খুল্লাম খুল্লা। রায়বাহাদুর তাঁরও দাম ঠিক করেছিল। বাবা রামসুন্দর মিত্র তা হাসিমুখে মেনেও নিয়েছিলেন। সেই পণের টাকা দিতে না পারায় বিয়ের লগ্নে যখন গোলমাল বেঁধে যায়, নিরুপমা কনের সাজে বসে। শূন্য হৃদয়ে। আজ এই মেয়ের ‘দাম’ কে ঠিক করবে? কার আছে এত সাহস? কে বলতে পারবে যে, ‘বাপ যদি পুরা দাম দিত, তো পুরা যত্ন পাইত?’ কে প্রশ্ন করবে ওই ষোড়শীকে? মুখের উপর সে বলে দিচ্ছে, ‘মিত্র বললেই হয় না। মন থেকে মানতেও হয়।’ এরা অদম্য। কী বলা যায় এদের? অপরিণত? বাস্তবজ্ঞানহীন? শুধুই আবেগে চলে? বোধ হয় না। তাহলে বাবা মায়ের নিরাপত্তার ছাতার বাইরে এসে তারা পথে বসে থাকত না। সুখের ঘুম ছেড়ে অজানা-অচেনা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে চাতালে শুয়ে পড়ত না। এই প্রজন্ম বলে, ‘আমি বরাবর আক্রান্তের পক্ষে/বরাবর আমি যুদ্ধশেষের পক্ষে...।’ কিন্তু নাছোড় তারা। আবেগপ্রবণও। কারণ, আবেগ ছাড়া বিপ্লব হয় না। আর, বিপ্লব কোনো ফরমুলা মনে না। এই প্রজন্মের, এই মেয়েদেরও যে ফেলা যায় না কোনো ফরমুলায়। রাজনীতি করতে তারা পথে নামেনি। কিন্তু রাজনীতির দরবারে একটা হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছে। লাঠি চালানেওয়ালা পুলিশের চোখে চোখ রেখে তারা গালি দিতে পারে। ক্ষমা চেয়ে বলতে পারে, ‘আমার বাবা-মাও এর জন্য দায়ী। তারা ভোট দিয়েছিল। তাই আজ এই দিন দেখতে হচ্ছে।’ বলেছিলেন তো নিরুপমাও... ‘আমি কি কেবল টাকার থলি? যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম?’ সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি। মর্যাদাবোধকে রেখেছিলেন দেনা-পাওনার উপরে। সমাজ তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি। এখনও কি পণের বন্দি হতে হয় না মেয়েদের? তাও হয়। প্রাণও যায় কত নিরুপমার। কিন্তু হ্যাঁ, প্রতিবাদ হয়। এই প্রজন্ম আর বাড়ি বা সমাজের অপেক্ষায় থাকে না। টাকার থলি হিসাবে নিজেদের ভাবতে দেয় না। নিজের মুক্তির ব্যবস্থা সে নিজেই করতে জানে। ‘অবাধ্যতার ঢেউ’ তোলে তারা। এটাই জাগরণ। নারীর। নতুন প্রজন্মের। দেশের।
রাতের পর রাত আন্দোলন চলেছে। কিন্তু চুরি হয়নি, শ্লীলতাহানি বা নিগ্রহও নয়। কারা যেন বলে, মেয়েরা খারাপ জামাকাপড়ের পরলে ধর্ষণ হবেই! মেয়েরা রাতে বাইরে থাকলে নিগ্রহ স্বাভাবিক? আজ কোথায় তারা? আসলে আমাদের কনসারভেটিভ সমাজ সব সময় মেয়েদের নিরুপমা করেই রাখতে চেয়েছে। স্বাধীন করেনি। সচেতন করেনি। তাই সেই দায়িত্বটাও তারাই তুলে নিয়েছে কাঁধে। একের পর এক কিশোরী রিল বানিয়েছে। প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছে তাদের সহযোদ্ধা ছেলেদের। বলেছে, এই আন্দোলনে পুরুষের লক্ষ্য ছিল অধিকার, মেয়েদের পোশাক নয়। এরপরও এই আন্দোলনকে জাগরণ বলব না? এরপরও শাসক অবজ্ঞা করবে এই প্রজন্মকে? আজকের মেয়েদের? তারা কিন্তু বলছে, ‘বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে/ তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?’
২৩ দিন অনশনে ছিলেন নেহা বোরা। সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা একটি মেয়ে। কেন এই অনশন? খবরও তো হয়নি সেভাবে। কারণ তিনি সেলিব্রিটি ছিলেন না। শাবানা আজমি তাঁকে বলেছিলেন, সমাজ বদলাবে তোমাদের জীবনে। তোমাদের মৃতদেহে নয়।
সমাজ কিন্তু সত্যি বদলাচ্ছে। আর এই বদল মহিলা সংরক্ষণে আসে না। পরিবর্তন আসে সাম্যবাদে, অধিকারে। করুণায় নয়। আর এই অধিকার! হাতে হাতে আদায়... প্রতিশ্রুতিতে নয়।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র