Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পুরো সুবিধা মিলবে?

পুরো সুবিধা মিলবে?
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগে যখন গোটা দেশ উত্তাল, বিহারে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়াকে কেন্দ্র করে যখন বিরোধীরা একজোট হয়ে পথে নেমেছে, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধরার নামে যখন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এ দেশের বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা করার অভিযোগে তোলপাড় প্রতিবাদ চলছে, ঠিক তখনই জিএসটিতে বিপুল ছাড়ের কথা সরকারি তরফে ঘোষণা করে আম জনতার ‘নয়নের মণি’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি হাততালি কুড়িয়েছে স্বাস্থ্যবিমা ও জীবনবিমা জিএসটি-মুক্ত করার ঘোষণায়। অনেক টালবাহানার শেষে দীর্ঘ আট বছর পর জীবনধারায় দুই নিত্যসঙ্গী স্বাস্থ্যবিমা ও জীবনবিমায় জিএসটির হার ১৮ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে আসায় আনন্দে উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করার কথা গরিব-মধ্যবিত্তের। কিন্তু জনতার বিশ্বাসে, এই শূন্য আসলে ঠিক ততটা শূন্য নয়! বিমার পাটিগণিত আর বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা মানলে বলতে হয়, সরকারের ঘোষণার পর প্রিমিয়ামের অঙ্ক সামান্যই কমতে পারে। এমনকী কোনও কোনও ক্ষেত্রে বেড়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। এই আশঙ্কা শুধু স্বাস্থ্যবিমা, জীবনবিমার ক্ষেত্রে নয়, ওষুধ থেকে ভোগ্যপণ্য—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঘোষিত ছাড়ের পুরো সুবিধা মিলবে কি না— তা নিয়েও। ঘুরিয়ে বললে, জিএসটিতে বিপুল ছাড়ের ঘোষণা বড়মাপের বেসরকারি সংস্থার মুনাফা বাড়াতে পরোক্ষে সাহায্য করবে না তো? তবু সরকারি ঘোষণায় মানুষ আশাবাদী। 

Advertisement

ধরা যাক, বর্তমান নিয়মে ১৮ শতাংশ জিএসটি ধরে কোনও গ্রাহককে বিমার প্রিমিয়াম দিতে হয় বছরে ১১৮ (১০০ প্লাস ১৮) টাকা। নতুন ঘোষণায় জিএসটি মুক্ত হলে প্রিমিয়াম হওয়া উচিত ১০০ টাকা। কিন্তু তা আদৌ হবে কি? কারণ এই একই হারে ১০০ টাকা প্রিমিয়ামে বিমা সংস্থার জিএসটি দিতে হয় ৬ টাকা ৩০ পয়সা। সরকার গ্রাহকের জিএসটি মকুব করলেও বিমা সংস্থার জিএসটিতে ছাড় দেয়নি। ফলে গ্রাহককে আসলে প্রিমিয়াম দিতে হবে ১০৬ টাকা ৩০ পয়সা। তার মানে, প্রকৃত ছাড় মিলল ১১ টাকা ৭০ পয়সা (১১৮ মাইনাস ৬.৩০ টাকা)। কারণ কোনও সংস্থাই নিজের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ (এ ক্ষেত্রে ৬.৩০ টাকা) দেবে না। পাটিগণিতের এই সহজ অঙ্ক কমবেশি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আশঙ্কার জায়গা হল, এই সুযোগে প্রিমিয়ামের অঙ্ক আরও খানিকটা বাড়িয়ে দেওয়া হতে পারে! সেটা হলে কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর পদক্ষেপ করবে, এমনটা আশা করা বোধহয় মরীচিকা মাত্র। বরং সাধারণ অভিজ্ঞতা বলছে, শাসকের নির্বাচনী তহবিলে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের একাংশ ‘ছাড়’ পেয়ে যাবেন না তো? ফলে জিএসটি ছাড়ের জন্য গেরুয়া শাসককে প্রায় ‘অবতার’ বানিয়ে যে প্রচার শুরু করেছে বিজেপি—তাতে বিস্তর জল মেশানো আছে। সব মিলিয়ে তাই শেয়ার বাজারেও হেলদোল সেভাবে দেখা গেল না। মোদি-শাহদের ঘোষণায় খুব বেশি আস্থা রাখেনি সেনসেক্স, নিফটি। 
জিএসটির হার কমানোর ঘোষণা করে অর্থমন্ত্রক জানিয়েছে, এর ফলে কেন্দ্রের নিট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণে পরিষেবা ক্ষেত্রের অর্থ বরাদ্দে কাটছাঁট করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে একটি মহল। আবার সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ছোট ও মাঝারি শিল্পে উৎসাহ ভাতা, কৃষি ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে উৎসাহ ভাতা, ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কোপ পড়তে পারে। অর্থাৎ, পরোক্ষে গরিব-মধ্যবিত্তের রোজগারে হাত পড়তে পারে। সরকারের ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে পারে রাজ্যগুলি। যেমন, জিএসটির নতুন হার চালু হলে পশ্চিমবঙ্গ, কেরলের মতো রাজ্যগুলির বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হবে। ২০১৭ সালে জিএসটি চালুর পর রাজ্যগুলির ক্ষতিপূরণ মেটাতে ‘সেস’ আদায়ের ক্ষমতা ছিল। সেই মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬-এর ৩১ মার্চ। তার মধ্যেই জিএসটি হার কমে যাওয়ায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। যথারীতি কেন্দ্র এ ব্যাপারে নীরব। সব মিলিয়ে তাই জিএসটি কমায় আম জনতা যতটা আর্থিক সুরাহা পাবে বলে প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তবে ততটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবু নাকের বদলে নরুন মিলেছে, এটা ভেবেই আপাতত একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে হবে। একথা ঠিক, কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে জিএসটির বোঝা বাড়িয়েছিল তাতে করের উপর কর দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের উপর চাপ বেড়েছিল। পণ্য ও পরিষেবার উপর করের বোঝা কমলে উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় হয়তো পণ্যের চাহিদা বাড়বে। ভারতের অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার যদি সত্যিই আম জনতার স্বার্থে জিএসটি লাঘবের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তাহলে এই সুবিধা যতটা সম্ভব ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তাই জিএসটি ছাড়ের পুরো সুবিধাটা সত্যিই আম জনতা পাচ্ছে কি না তা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ