


নিজস্ব প্রতিনিধি, মুম্বই: নাচছেন সকলেই। তবে ভঙ্গিটা আলাদা। কেউ ঝুঁকে, কেউ সোজা হয়ে, কেউ বা হাত তুলে। আলপনার ভঙ্গিতে বিন্দু বিন্দু করে দেওয়ালে আঁকা মহিলাদের মাঝে মাঝেই পেল্লাই গাছ। ঠিক যেন প্রকৃতির মাঝে কোনও উৎসব। সেটাই অবশ্য হওয়ার কথা। পাশের নেমপ্লেটেই যে ‘জলসা’ লেখা। নাচ-গান ছাড়া কি আর জলসা হয়!
জুহু চৌপট্টি থেকে কয়েক কদম হেলেদুলে এগলেই বৈকুণ্ঠলাল মেহতা মার্গ। মোড়ের মাথা থেকে আরব সাগর দেখাও যায়। এবার লেফট টার্ন। স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার এটিএম সহ একটা ছোট শাখা। এবার থমকে দাঁড়ান। হ্যাঁ, নৃত্যরত মহিলাদের ছবি দেওয়া দেওয়ালের ওপাশেই যে থাকেন ‘শাহেনশা’। বৃদ্ধ হয়েছেন তো কী, তিনি অমিতাভ বচ্চন। নামটাই যথেষ্ট।
রোমাঞ্চিত আপনি নির্ঘাত হাতের মোবাইল ক্যামেরা চালু করেছেন। জয়া ভাদুড়ি, অভিষেক, ঐশ্বর্য রাইয়ের ঠিকানাও এটা। ছবি না তুলে পারা যায়? আর এখানেই বিপদ। কাঠের পেল্লাই দরজার সামনে দাঁড়ানো সিকিউরিটির বিষনজরে সঙ্গে সঙ্গে আপনি। বিশাল চেহারার অন্তত তিন-চারজন এগিয়ে আসবেনই। বাড়ির মালিকের মতো ব্যারিটোন ভয়েসে না হলেও গম্ভীর গলায় তাঁরা নির্দেশ দেবেন। অবিলম্বে বাড়ির সামনে থেকে সরে যান। এবং ছবি যেন একেবারেই না ওঠে। অনুরোধে কোনও কাজ হবে না বুঝতে আপনার সময় লাগার কথা নয়। তখন এক-দু’পা সরে এসে লুকিয়ে চুরিয়ে সেলফি অন্তত নিতে মন চাইবেই। আর তখনই মিলবে মোবাইল কেড়ে নেওয়ার হুমকি। এবার স্পষ্ট হুমকি, মোবাইলটা কিন্তু নিয়ে নেব!
পরিষ্কার, বাড়ির সামনে অবাঞ্ছিত কেউ দাঁড়াতে তো পারবেই না, ছবি তোলাতেও কঠিনতম নিষেধাজ্ঞা। ব্যতিক্রম অবশ্য রবিবার বিকেলটা। সপ্তাহের সেদিন বন্ধ দরজার সামনেই জমে ভক্তদের ভিড়। মাঝে মাঝে ‘ঈশ্বর’ দর্শনও হয়। উঁচু প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো অমিতাভ হাত নাড়েন। নমস্কারও জানান। গত অক্টোবরে জন্মদিনে তো ভক্তদের উপহারও বিলি করেছিলেন। তা নিতে রাস্তাজুড়ে প্রবল ধাক্কাধাক্কি। কয়েক সেকেন্ড পরে আবার বন্ধ হয়েছিল দরজা। রূপকথার নায়কের মতো উধাও তিনি। ফ্যানদের মনে ততক্ষণে গেঁথে গিয়েছিল চিরকালীন রেশ। শোনা যায়, ১৯৮২ সালে ‘সাত্তে পে সাত্তা’ হিট হওয়ার পর পরিচালক রমেশ সিপ্পি উপহার দিয়েছিলেন এই বাড়ি। শুরুর দিকে নাম রাখা হয়েছিল মনসা। পরে জ্যোতিষীর পরামর্শে তা বদলে হয় ‘জলসা’। তবে ‘মনসা’ নামটা একেবারে হারিয়ে যায়নি। ‘জলসা’র পিছনে আরও একটা প্রপার্টি আছে। সেখানে নাকি মস্ত বড়ো বাগান। তার প্রবেশপথে ‘মনসা’ লেখা। এবং আপনি যদি এদিকেও ছবি তুলতে চান, ফের বরাদ্দ সিকিউরিটির গুঁতো। উঁচু করে ঢেকে দেওয়া পর্দার ওপাশে কী রয়েছে, অনুমানই শুধু সম্ভব। শোনা যায় অমিতাভ এই বাংলো পাওয়ার আগে এখানে আনন্দ, নমক হারাম, চুপকে চুপকে সিনেমার শুটিং হয়েছিল। সবগুলিতেই ছিলেন অ্যাংরি ইয়ংম্যান।
১৯৭৫ সালে শোলে সুপারহিট হওয়ার পর প্রথমবার বাংলো কিনেছিলেন অমিতাভ। সেই ‘প্রতীক্ষা’ বাংলোয় থাকতেন হরিবংশ রাই ও তেজি বচ্চন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পাকাপাকিভাবে ‘জলসা’য় উঠে আসেন বিগ বি। তবে ‘প্রতীক্ষা’ ছাড়েননি। ২০০৭ সালে সেখানেই অভিষেকের বিবাহ হয়। এখন অবশ্য তা মেয়ে শ্বেতাকে দিয়েছেন অমিতাভ। দুই বাংলোর দূরত্ব অবশ্য গাড়িতে মেরেকেটে সাত-আট মিনিট। মজার হল, এই বাড়ি নিয়ে প্রতিবেশীদের তেমন কোনও হেলদোল নেই। পাশের গলিতে চেয়ারে বসে আড্ডা দেওয়া একজন তো বলেই দিলেন, গাড়িতে করে ওঁকে বেরতে দেখি মাঝে মাঝেই। তবে উনিও তাকান না, আমরাও গুরুত্ব দিই না। লাগোয়া বাড়ির বাসিন্দা তো আরও অবিশ্বাস্য মন্তব্য করলেন। কোনটা কার বাড়ি জেনে তাঁর কী লাভ, নিজেকে ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? সত্যি, এটাই মুম্বই। মিলতা হ্যায় ইঁহা সব কুছ, এক মিলতা নেহি দিল। তাবলে এমন আবেগহীন? সত্যি, ইয়ে হ্যায় মুম্বই মেরি জান! -নিজস্ব চিত্র