নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা। তার পর অকথ্য অত্যাচার। এমনকি মৃত্যুও! ওড়িশা থেকে মহারাষ্ট্র—একের পর এক ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যে এভাবেই চলছে বাংলা ভাষাভাষীদের উপর আক্রমণ। শনিবার আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উদযাপনের মঞ্চ থেকে এই প্রসঙ্গ টেনেই কেন্দ্রের মোদি সরকার তথা বিজেপির বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাফ বলে দিলেন, ‘যে কোনো ভাষার উপর আঘাত এলে আমরা রুখে দাঁড়াব। কিন্তু দয়া করে আমাদের ভাষাকে অসম্মান করবেন না। অনেক জায়গায় শুধু বাংলায় কথা বলার কারণে অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। কিন্তু কেন? দেশটা তো ভারতবর্ষ।’ দেশপ্রিয় পার্কে ভাষা শহিদ স্মারকে শ্রদ্ধা জানানোর পর এই ভাষাতেই বিজেপিকে তোপ দাগেন তিনি।
২০২৫-এর জুলাই মাসের ঘটনা। বাংলা ভাষায় কথা বললে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করার ফরমান জারি করেছিল খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। মূলত তারপর থেকেই একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যে অত্যাচার নেমে আসে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর। তখন থেকে এই ইস্যুতে রাজপথে নেমে সোচ্চার হন মমতা। আক্রান্তদের পাশাপাশি ভিন রাজ্যে কর্মরতদের বাংলায় ফিরিয়ে আনার সমস্ত ব্যবস্থা করেন তিনি। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের পুনেতে পুরুলিয়ার সুখেন মাহাতকে খুনের ঘটনা ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যে মানুষের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে আরও একবার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এদিকে, অন্যান্য একাধিক রাজ্যে এসআইআর চললেও বাংলার জন্য পৃথক নিয়ম বলবৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। সবটাই আসলে বাংলার যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত বলে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে এসেছেন মমতা স্বয়ং। এদিন সেই প্রসঙ্গ টেনেও ভাষা দিবসের মঞ্চ থেকে গেরুয়া শিবিরকে চড়া সুরে আক্রমণ করেন মমতা। তাঁর হুংকার, ‘মনে রাখবেন, বাংলার কোনো অপমান আমরা মেনে নেব না। বাংলার মানুষকে তাঁদের ভোটাধিকার থেকে, সংস্কৃতি এবং ভাষার সম্মান থেকে বঞ্চিত করার এত ইচ্ছা কীসের? আপনারা কি চান, বাংলা হারিয়ে যাক? নাকি গায়ের জোরে বাংলা দখল করতে চান? মাছ-মাংসের উপর ফতোয়া চাপিয়ে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস বদলে দিতে চান? আপনারা কি মনে করেন বাংলার মানুষের অধিকার কেড়ে নেবেন? জেনে রাখুন, আমরা কেবল দেশের মানুষ, মাটি এবং মায়ের কাছে মাথা নত করি। দিল্লির লাড্ডুর কাছে নয়।’ বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে না জেনে বাংলা দখলের ‘লোভ’-কে গেরুয়া শিবিরের ‘হ্যাংলামি’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি।
শুধু তাই নয়, ‘অমর একুশে’র মঞ্চ সাক্ষী থাকল বেনজির সৌজন্যের। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী নেতা নগেন্দ্র রায় তথা অনন্ত মহারাজের হাতে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভা ভোটের মুখে বিজেপির রাজ্যসভার এই সাংসদকে সম্মান প্রদান শাসক দলের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এছাড়া নচিকেতা চক্রবর্তী, ইমন চক্রবর্তী, শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘বঙ্গবিভূষণ’ এবং রাজ্যের ভূমিসচিব বিবেক কুমার, মনোময় ভট্টাচার্য, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, রূপঙ্কর বাগচী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অদিতি মুন্সি ও ফুটবলার সমরেশ চৌধুরীকে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেন মমতা।