


সমৃদ্ধ দত্ত: ইস্পাহানে মাটির নীচে? নাকি পিকাক্স পাহাড়ের নীচে? যার আসল নাম কুহ-ই-কোলাং গাজ-লা পাহাড়। জাগ্রোজ পর্বতশ্রেণির অন্যতম এই পিকাক্স পাহাড়ের নীচে আছে বলেই সন্দেহ। কিন্তু নিশ্চিত বলা যায় না। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইস্পাহানের বাঙ্কারে আমেরিকা মিসাইল নিক্ষেপ করেছিল। তিনটি স্তর ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু ১২ দিনের সেই আক্রমণ ইরান চুপ করে সহ্য করেছে। সামান্য কিছু মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে প্রত্যাঘাত করেছিল তেহরান। কিন্তু সেসব ইজরায়েল কিংবা আমেরিকার কাছে কিছুই নয়। ইরান কিন্তু এমন একটি মনোভাব নিয়ে নীরব হয়ে বসেছিল, যেন তাদের এর বেশি কিছু করার ক্ষমতাই নেই। কিন্তু আমেরিকা, ইজরায়েল, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন, রাষ্ট্রসংঘের নিউক্লিয়ার ওয়াচডগ। এই তাবৎ অংশই নিশ্চিত যে, ওই আক্রমণে কোনো ক্ষতি হয়নি। ইরান তাদের ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম কোথাও একটা সরিয়ে ফেলেছে আবার। ২০০ কেজি এনরিচড ইউরেনিয়াম এখনও হয়তো আছে ইস্পাহানেই। বাকি অংশ সম্ভবত পিকাক্স পাহাড়ের নীচে গোপন বাঙ্কারে আছে। পাহাড়ের নীচে কতটা গভীর যে সেই গোপন ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার! দুনিয়ার কেউ জানে না।
আমেরিকা এবং ইজরায়েলের একাধিক লক্ষ্য ইরানের যুদ্ধে। কিন্তু আসল লক্ষ্য হল এই ইউরেনিয়ামের সন্ধান পাওয়া। এই ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের ৬০ শতাংশ এনরিচড! অর্থাৎ ঘনত্ব ৬০ শতাংশ। পশ্চিমি দুনিয়া কী সন্দেহ করে? তারা সন্দেহ করে যে, ইরান গোপনে সকলের অলক্ষে ধীরে ধীরে ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার তৈরি করে ৯০ শতাংশ ঘনত্ব সংবলিত ইউরেনিয়াম মজুত করবে। ৯০ শতাংশ হয়ে গেলে কী হবে? অন্তত ১০টি পরমাণু বোমা! ঠিক সেটাই ইরানের টার্গেট। আর আমেরিকা ও ইজরায়েল কিছুতেই এটা হতে দেবে না। ইরান লাগাতার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আমেরিকা ও ইজরায়েল রাষ্ট্রসংঘকে বলেছে, ইরান মিথ্যা বলছে। ইজরায়েলের ভয় সবথেকে বেশি নাকের ডগায় ইরান পরমাণু বোমা তৈরির ব্যবস্থা পাকা করছে, আর সেটা ইজরায়েল বসে বসে দেখবে? একবার ইরান ওই লক্ষ্য পূরণ করে ফেললে, ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন, লেবাননের উপর একচ্ছত্র দাপটের সমাপ্তি ঘটবে। কারণ এই দুই পক্ষের বন্ধু ইরানের ইসলামিক শাসন তথা ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড। যারা লেবানন হিজবুল্লা ও প্যালেস্তাইনের হামাসের বন্ধু।
কখনো বলা হয়েছে ইরানের ইসলামিক শাসনের সমাপ্তি ঘটানোর কথা। ঠিক যেভাবে এই ইসলামিক শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল রাজতন্ত্র খতম করে ১৯৭৮ সালের গণবিদ্রোহে। যে বিদ্রোহের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন আয়াতোল্লা খোমেইনি এবং তাঁর অন্যতম প্রিয় শিষ্য আলি খামেনেই। যিনি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল ও আমেরিকার আক্রমণে নিহত হলেন। আবার কখনো বলা হয়েছে, ইরানের পরমাণু প্রোগ্রাম বন্ধ করাই লক্ষ্য। লিখিতভাবে ইরানকে মুচলেকা দিতে হবে। আবার কখনো বলা হচ্ছে, ইরানকে জিরো ইউরেনিয়াম মজুত ঘোষণা করতে হবে। আর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা পরীক্ষা করবে। সেই অনুমতি দিতে হবে ইরানকে। ইরান রাজি হয়নি। এরকম নানারকম কারণে ইরানকে আক্রমণ করা হয়েছে বলে আমেরিকা ও ইজরায়েল যতই প্রচার করুক, আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞ ও কূটনৈতিক মহল জানে যে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্রকৃত লক্ষ্য হল, ইরানের ৪৪০ কেজি গোপন ইউরেনিয়াম খুঁজে বের করা। সেই সন্ধান পেয়ে সতর্কতার সঙ্গে সেই মজুতকে ইরানের বাইরে নিয়ে আসা। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? কঠিন। কেন কঠিন? কারণ ইরানের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডারে পৌঁছতে গেলে পদাতিক সেনাবাহিনীকে ঢুকতে হবে ইরানে। যেটা মোটেই সহজ নয়।
সবথেকে বড়ো সংকট হল, ইরানের ঠিক কোথায় আছে ইউরেনিয়াম সে কথা জানা যাচ্ছে না। আর দ্বিতীয়ত, এমন নয় তো যে, ইরান ইতিমধ্যেই ৯০ শতাংশ এনরিচড ইউরেনিয়াম মজুত করে ফেলেছে? এবং একটি দু’টি পরমাণু ওয়ারহেড নেই তো? বস্তুত আমেরিকা ও ইজরায়েলের দুই বিখ্যাত স্পাই সংস্থা সিআইএ এবং মোসাদকে দুর্ধর্ষ ভাবা হয়েছে, ইরানের ক্ষেত্রে সেটা কিন্তু প্রমাণিত হচ্ছে না। কারণ, যুদ্ধের কয়েকদিনের মধ্যে একটি স্কুলে আমেরিকার মিসাইল হানায় বিপুল সংখ্যক শিশু ও নারীর মৃত্যু হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ওটা ভুল একটা বড়ো ভুল। কারণ ইজরায়েলের স্পাই সংস্থার নেটওয়ার্কে বলা হয়েছিল ওটা একটা পরিত্যক্ত ভবন, যেখানে ইরানের সেনাবাহিনী আছে। সম্পূর্ণ ভুল তথ্য।
ইরান কিছুতেই স্বীকার করবে না যে, তাদের কাছে ইউরেনিয়াম আছে। আমরা শত চেষ্টা করলেও না। অতএব ওরা অ্যাটাক করার আগে আমরাই অ্যাটাক করব। বললেন, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। তিনি ওয়াশিংটনে এসেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওভাল অফিসের সংলগ্ন অ্যান্টি চেম্বারে ট্রাম্পের সামনে ব্ল্যাক স্যুট পরে নেতানিয়াহু বসেছিলেন। ট্রাম্প ইন্টারকম কানে লাগিয়ে অফিসার অব স্পেশাল ডিউটিকে বললেন, কানেক্ট হিয়ার জেডি।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স চলে এলেন। নেতানিয়াহু, ট্রাম্প ও ভান্সের মধ্যে যা কথা হল, সেটা থেকে স্পষ্ট যে, আমেরিকা ও ইজরায়েল যুদ্ধে যাচ্ছেই। তবে একটু সময় লাগবে। কারণ মিডল ইস্টে পর্যাপ্ত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নেই। আর ৪০ হাজার মতো আমেরিকান সেনা আছে বটে, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার তাবৎ সেনাবেসে যথাযথ ফাইটার জেট নেই।
১৬ ফেব্রুয়ারি। অ্যালার্ট করা হল ইরানকে ঘিরে থাকা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে থাকা মার্কিন সেনা ঘাঁটিগুলিতে। কাতারের আল উদেইদ এয়ারবেস, কুয়েতের আল সালেম এয়ারবেস, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আল দাফরা এয়ারবেস, বাহরিনের ইউ এস ফিফথ ফ্লিট হেডকোয়ার্টার, জর্ডন ইউএস বেস, রিয়াধ এয়ারবেস। এই যে তালিকাগুলি দেওয়া হল, এগুলিতে আমেরিকান বাহিনী ঘাঁটি করেছে, তাদের সতর্ক এবং প্রস্তুত থাকতে বলা হল। অথচ এই ঘাঁটিগুলি নিজেরা প্রস্তুত হবে কী, তাদের উপর লাগাতার মিসাইল নিক্ষেপ করেছে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর।
যুদ্ধ তাহলে হচ্ছেই। নেতানিয়াহু নিশ্চিন্তে চলে গেলেন। তিনদিন পর। ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওয়াশিংটন। ডোনাল্ড ট্রাম্প সিচ্যুয়েশন রুমে। ট্রাম্প তাঁর চিফ মিলিটারি অ্যাডভাইসর জেনারেল ড্যান কাইনকে জিজ্ঞাসা করলেন, কতদিন চলতে পারে কনফ্লিক্ট? যদি আমরা অ্যাটাক করি?
জেনারেল কায়েন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ। তিনি জানেন যুদ্ধে কী হতে পারে। বললেন, আমেরিকান সেনাবাহিনীর প্রচুর ক্ষতি ও প্রাণহানি হতে পারে। তবে আমরা অ্যাডভান্টেজ পজিশনে। ট্রাম্প ঘোষণা করলেন নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় যে, আমার জেনারেল বলেছেন, ইরানকে আক্রমণ করা হলে সহজেই জেতা যাবে!
আমেরিকার সেনেট ও হাউসের ইনটেলিজেন্স কমিটির সর্বোচ্চ পদে যাঁরা— সেই গ্যাং অব এইটের বৈঠকে ঠিক হল, অপারেশন হবে। ২৩ ফেব্রুয়ারি টেক্সাস যাওয়ার আগে ট্রাম্প অনুমোদন করে গেলেন, অপারেশন এপিক ফিউরি। ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ান প্লেনে উঠতে উঠতে নিজের সামরিক প্রধানকে হাত নাড়িয়ে বললেন, নোট অ্যাবর্টস! গুড লাক!
ঠিক হল স্টিভ উইটকফ (মূল নেগোশিয়েটর) এবং জেরার্ড কুশনার (ট্রাম্পের জামাই) জেনিভা গেলেন। ইরানের বিদেশমন্ত্রী বললেন, আমাদের তো একই কথা। আমাদের কাছে এত ইউরেনিয়াম নেই। আপনাদের ভুল ধারণা। বারংবার আমরা বলছি। আপনারা বিশ্বাস করেন না। আমাদের গবেষণা, পরীক্ষা, নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ এসব তো চাই। তাই একেবারে ইউরেনিয়াম শূন্য করে দিতে হবে এই দাবি মানা সম্ভব নয়! অন্য শর্ত বলুন।
সেই কথা জানানো হল ট্রাম্পকে। সেই রাতেই আমেরিকা মোতায়েন করল ইজরায়েলে বি টু স্টিলথ বম্বারস। বাঙ্কার বাসস্টিং বম্বস, টোমাহক ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা হবে জাহাজ এবং সাবমেরিন থেকে। আর পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে স্ট্যান্ড বাই করা হল এফ থার্টি ফাইভ এবং এফ এইট্টিন ফাইটার জেট। অপারেশন এপিক ফিউরি রেডি!
কিন্তু ইরানে ফেলার জন্য অতিরিক্ত মূল্যবান অস্ত্র সর্বদা নষ্ট করার অর্থ হয় না। তাই হাতে রাখা হল একঝাঁক ব্যাকআপ। যেগুলি তুলনায় সস্তার। যেমন লুকাস ওয়ান ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন, হিমরাস রকেট সিস্টেম, এম কিউ নানি রিপার ড্রোন।
হঠাৎ ৬ ফেব্রুয়ারি ঝড়ের বেগে হোয়াইট হাউসে ঢুকলেন টাকার কার্লসন। ট্রাম্পের প্রিয়পাত্র। পডকাস্ট সেলিব্রিটি। প্রেসিডেন্টের বিশেষ সচিবের মতোই প্রায়। ট্রাম্পের সব কথায় তিনি সুর মেলান। কিন্তু হঠাৎ এই একটি ব্যাপারে কার্লসন বললেন, প্রেসিডেন্ট, আপনি মনে হয় ইজরায়েলের ফাঁদে আমেরিকাকে জড়াচ্ছেন। এই যুদ্ধ হলে ইজরায়েলের লাভ। আমেরিকার কী লাভ? বরং আমেরিকার সেনা ক্ষয় হবে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট হবে। সব দোষ হবে আমেরিকার। আমরা কী পাব? আমার মনে হয় আপনি বরং নেতানিয়াহুকে বলুন ইরানকে অ্যাটাক করার দরকার নেই। একটা কাজ করা যায়। ইরানে যাতে খামেনেইয়ের শাসনের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ হয়, সেই চেষ্টা করলেই ভালো হবে। অ্যাভয়েড ওয়ার!
ট্রাম্প বললেন, আমি বিবিকে কথা দিয়েছি। বিবি হলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। ট্রাম্প বললেন, অ্যাটাক করতেই হবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইজরায়েল ও আমেরিকা একজোট হয়ে আক্রমণ করল ইরানকে। ঠিক যখন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের তাঁর পরিবারের সদস্যসহ নিহত হলেন, তারপরই আমেরিকা ও ইজরায়েল কিছুটা দিশাহারা হয়ে গেল যে, এবার কী?
তারা ধরেই নিয়েছিল এবার ইরান আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ইরান এক আশ্চর্য স্ট্র্যাটেজি নিল। পশ্চিম এশিয়ার যে সব রাষ্ট্র সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত থেকে নিজেদের রক্ষা করে এসেছে, সেই আরব দুনিয়ায় ইরান লাগাতার মিসাইল ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ত্রাহি ত্রাহি রব তুলে দিয়েছে। এই প্রতিটি দেশে রয়েছে আমেরিকার ঘাঁটি। আর সেটাই এদের অপরাধ বলে মনে করছে ইরান।
ইরানকে আক্রমণ করা সহজ ছিল, ১৫ দিন যুদ্ধ করার পর আমেরিকা বিস্ফারিত নেত্রে দেখতে পেল সেই যুদ্ধ সমাপ্ত করা অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ একটাই। ইরানকে প্রবল আক্রমণ করা হবে এ পর্যন্ত ভেবেছিল আমেরিকা। কিন্তু ইরানের প্রত্যাঘাত ও প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারল না কেন আমেরিকা? মার্কিন দেশজুড়ে আপাতত এটাই সবথেকে বড়ো জল্পনা ও চর্চা। এত বড়ো মিস ক্যালকুলেশন কীভাবে হতে পারে? ইরান তাবৎ আরব দুনিয়ায় আক্রমণ করে সর্বাগ্রে জ্বালানি সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর হরমুজ প্রণালী রুদ্ধ করে দিয়েছে। ট্যাঙ্কার ও কমার্শিয়াল জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে ইরান যে নিজে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে সেটার থেকেও বড়ো উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে হচ্ছে যে, প্রত্যেক দেশ বিপদে পড়েছে। এর আগে যেটা হয়েছে, আমেরিকা ইরাককে আক্রমণ করছে, সিরিয়ায় বোমা ফেলছে, আফগানিস্তানকে ধ্বংস করছে, সবই হয়েছে দূরে দূরে। তাই বাকি দুনিয়া সেভাবে যুদ্ধ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এবার অত্যন্ত কৌশলে ইরান এমনভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি জোগানের উপরই বোমা ফেলেছে প্রায় যে, সর্বত্র রান্নার গ্যাস থেকে পেট্রপণ্যের সংকটের পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির ছায়া আকাশে। দুবাই, আবু ধাবি, রিয়াধ, শারজা, দোহা, মাসকট ইত্যাদি স্থানগুলি পৃথিবীর কর্পোরেট ও পর্যটকদের বার্তা দিয়েছে এতকাল যে, এখানে থাকা, ব্যবসা করা, ভ্রমণ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ। ক্রমেই এই জনপদগুলি বিশ্বের সেরা অভিজাত কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ইরান বেছে বেছে এই দেশগুলির প্রতিটি এয়ারপোর্টে বোমা ফেলেছে। অর্থাৎ এই আরব দুনিয়ার আত্মবিশ্বাস ও দম্ভকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যা বড়োসড়ো ক্ষতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের। এশিয়ারও।
ইরানের মতো উদার, আধুনিক, উগ্রতাহীন এক রাষ্ট্রকে আয়াতোল্লা খোমেইনি এবং আয়াতোল্লা খামেনেই সম্পূর্ণ চরিত্রবদল করে এক প্রাচীন সভ্যতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। যা আটকে দিয়েছে ইরানের বিকাশকে। তাই অবশ্যই ইরানবাসীর প্রবল ক্ষোভ ছিল ইসলামিক শাসনের বিরুদ্ধে। এখনও ক্রোধ সর্বত্র। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে জোট বেঁধে সম্পূর্ণ ভুল পথে পা বাড়ালেন। দরকার ছিল আরও অপেক্ষা। এবং ইরানবাসীকে আধুনিক উদার পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণ করা। পুঞ্জীভূত হচ্ছিল ক্ষোভ। যুবক-যুবতী, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছিল রাগ। কিন্তু ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধৈর্যহীনতা সেই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের সম্ভাবনায় জল ঢেলে দিয়েছে। এখন যদি ইরানকে এরকম বিধ্বস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে আমেরিকা ঘোষণা করে দেয় যে, আমাদের জয় হয়েছে, আমরা চললাম। তাহলে আরও ‘ভয়ংকর ইরান’-কে ফেলে রেখে আমেরিকাকে যেতে হবে। এতটা পথ যখন আমেরিকা অগ্রসর হয়েছে, তারপরও যদি সেই ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের সন্ধান না পায় এবং সেগুলি ইরানের ভবিষ্যৎ শাসকদের হাতের নাগালের বাইরে না নিয়ে আসা যায়, তাহলে কিন্তু অন্য ইরানের জন্ম হবে আগামী দিনে। ইরান হবে আরও বিপজ্জনক! আমেরিকা ও ইজরায়েল সে কথা জানে! তাই ঠিক কেন যে তারা ইরান আক্রমণ করেছিল, সেটা নির্ধারণ করাই যেন এখন সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ! ইতিহাস কিন্তু প্রশ্ন করবে আমেরিকাকে, ইরানকে আক্রমণ করেছিলে কেন? লক্ষ্য পূরণ হয়েছে? কী লক্ষ্য পূরণ হল? আমেরিকাকে জবাব দিতে হবে বহুকাল ধরে।