Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

নিরামিষ কেন খাবেন, খেলে কী উপকার হবে

মাছ-মাংস ত্যাগ করে নিরামিষাশী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? নিরামিষ খাবারের উপকারিতা অনেক, সন্দেহ নেই। তবে খাদ্যাভ্যাসের এই হঠাত্‍ বদলের আগে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হওয়া জরুরি। নিরামিষ জাতীয় খাবার একধরনের সুষম খাদ্য।

নিরামিষ কেন খাবেন, খেলে কী উপকার হবে
  • ২৭ এপ্রিল, ২০২৫ ১৬:০৪
Prefer us on Google

নিরামিষ খাবারে দীর্ঘ জীবনলাভ থেকে কোন কোন রোগ প্রতিরোধ করা যায়? লিখেছেন পুষ্টিবিদ অরিত্র খাঁ।

Advertisement

 

অরিত্র খাঁ: মাছ-মাংস ত্যাগ করে নিরামিষাশী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? নিরামিষ খাবারের উপকারিতা অনেক, সন্দেহ নেই। তবে খাদ্যাভ্যাসের এই হঠাত্‍ বদলের আগে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হওয়া জরুরি। নিরামিষ জাতীয় খাবার একধরনের সুষম খাদ্য। এর মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণে উদ্ভিজ্জ তন্তু, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ফলিক অ্যাসিড, ম্যাগনেশিয়াম, সম্পৃক্ত স্নেহ পদার্থ ও প্রচুর পরিমাণে উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক পদার্থ। এই কারণে নিরামিষভোজী মানুষের উচ্চ কোলেস্টেরলজনিত বা নিম্ন রক্তচাপজনিত রোগ সাধারণত দেখা যায় না। এমনকী এই ধরনের মানুষদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে। নিরামিষজাতীয় খাবার বেশ সহজপাচ্য। রান্না করা সহজ, সাশ্রয়ীও বটে। এই কারণেই নিরামিষ আহার শুধু সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং পরিবেশের দিক থেকেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমিষ খাবারের সঙ্গে নিরামিষ খাবারের তুলনা করলে দেখা যায়, আমিষ খাবারে কোনও ফাইবার থাকে না। কিন্তু নিরামিষ খাবারে ডায়েটরি ফাইবার পাওয়া যায়। আবার ডায়েটরি ফাইবারকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। জলে দ্রবীভূত ডায়েটরি ফাইবার এবং জলে অদ্রবীভূত ডায়েটরি ফাইবার। এবার একনজরে দেখে নেওয়া যাক নিরামিষ খাবারের উপকারিতাগুলি কী কী— 
দীর্ঘমেয়াদি জীবনকাল
আয়ুকে দীর্ঘায়িত করার অনেক পদ্ধতি রয়েছে যার মধ্যে নিরামিষ ভোজন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। আপনি যত বেশি ফল বা সবুজ শাকসব্জি আপনার নিত্যদিনের খাদ্য তালিকায় রাখবেন, আপনার শরীরে তত কম রাসায়নিক ও বিষাক্ত পদার্থের প্রভাব তৈরি হবে। এটাই আপনাকে বহুকাল যাবৎ সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে সহায়তা করবে।
কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায়
প্রাণিজ ফ্যাটে শরীরের সেভাবে কোনও উপকার হয় না। কোলেস্টেরলের প্রায় সবটাই তৈরি হয় প্রাণিজ ফ্যাট থেকে। কারণ, উদ্ভিজ্জ ফ্যাটে কোনও রকম কোলেস্টেরল থাকে না। যদিও কোলেস্টেরল মানুষের কোষের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়, তবু শুধু নিরামিষ খাবারের ওপর বেঁচে থাকলে শরীরের বিশেষ কোনও ক্ষতি হয় না। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সর্বভুক মানুষের তুলনায় নিরামিষাশী মানুষের দেহে কোলেস্টেরলের পরিমাণ অনেক কম থাকে। ফলে তাঁদের দেহে স্নেহ পদার্থের মাত্রাও অনেকটাই কম থাকে।
স্থূলত্ব ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় 
যাঁরা হার্টের রোগী বা হার্ট সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন তাঁরা যদি নিরামিষ খাবার খান, তাহলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে। মাছ, মাংস, ডিম অতিরিক্ত তেল-মশলা দিয়ে রান্না করলে রি অ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস এবং ফ্রি র‌্যাডিকালস তৈরি হয়। যার ফলে নন কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) অথবা সিনড্রোম এক্সের সমস্যা বাড়ে। যার ফলে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখো যায়। সেইজন্য হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির এই ধরনের খাবার খাওয়া অনুচিত। 
ডায়াবেটিস রোগের ঝুঁকি কমায়
আমিষভোজী মানুষ প্রায়শই রক্তে শর্করার সমস্যায় ভোগেন, কখনও কখনও খাদ্যগ্রহণের পরে তা উচ্চপর্যায়ে চলে যায়। এসব আমিষাশী মানুষ যদি খাবারে নিরামিষ পদ রাখেন তাহলে তাঁদের রক্তে শর্করার পরিমাণ অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে আসে। এর প্রধান কারণ হল সুষম নিরামিষ খাদ্য মানুষের শরীরে যেমন পুষ্টি জোগায় তেমনই রক্তে শর্করা ও ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখে। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে নিরামিষ খাবার। 
ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখে
আপনি যদি সতেজ ও স্বাস্থ্যকর ত্বক চান, তাহলে আপনার উচিত সঠিক ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং প্রচুর পরিমাণে জল পান করা। ফল ও সবুজ সব্জিতে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল এবং যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে। এছাড়া যেহেতু সব্জিতে প্রচুর পরিমাণে জল থাকে, তাই বেশি করে নিরামিষ খেলে আপনার শরীরে এর মধ্যে নিহিত পুষ্টিদ্রব্যগুলো অক্ষত অবস্থায় সরবরাহ হয়ে থাকে। অ্যান্টি অক্সিডেন্টের মধ্যে আপেল, বেগুন, রসুন, লেবু, টমেটো এবং চা থেকে পাওয়া যায় যথাক্রমে কোয়ারসাটিন, ন্যাজোনিন, অ্যালালাইড সালফাইড, হাসপিরিডিন, লাইকোপিন এবং ক্যাটিচিন। এই ফল এবং শাক-সব্জিগুলি ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খুবই উপকারী। 
মানসিক চাপ কমায়
গবেষকদের মতে, আমিষাশী মানুষদের তুলনায় নিরামিষাশী মানুষেরা অনেক বেশি সুখী হন। আমিষাশীদের তুলনায় নিরামিষাশীদের মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি অনেক বেশি থাকে এবং তাঁরা সহজ জীবনযাপন করতে সক্ষম। সতেজ সব্জি গ্রহণে শরীর ও মনে অনেক বেশি সতেজতা বজায় থাকে। যদি এই সব্জি জৈব উপায়ে উৎপাদন করা হয়, তাহলে তা আমাদের শরীরের সতেজতাকে বহুগুণ বাড়াতে পারে। অ্যান্টি ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে সেরোটোনিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাতে ঘুম না হওয়া, ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি হলে অনেকেই সেরোটোনিন জাতীয় ওষুধ খান। সাধারণত ডাক্তারবাবুরা সেরোটোনিনের জন্য এসএসআরআই (সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটরস) এই গ্রুপের ওষুধ দিয়ে থাকেন। সেরোটোনিনকে যদি ঠিক রাখতে হয় তাহলে ডার্ক চকোলেট একটি ভালো উৎস। সেরোটোনিনের জন্য অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড ট্রিপ্টোফান আমরা দুধ থেকে ভালো পাই। যেহেতু দুধের মধ্যে ভালো মেলাটোনিন থাকে সেক্ষেত্রে ভালো ঘুমের জন্য রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস ঠান্ডা দুধ শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী। তবে যাঁদের ল্যাকটোজ জাতীয় খাবারে অসুবিধা আছে তাঁদের পক্ষে কাঁচা দুধ না পান করাই ভালো। 
বিপাকীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি
নিরামিষ খাবার সহজপাচ্য এবং এটা আমাদের বিপাক ক্রিয়াকে সর্বোত্তমভাবে বজায় রাখে। নিরামিষভোজী মানুষের ক্ষেত্রে রেস্টিং মেটাবলিজম রেটও অনেক বেশি। এই নিরামিষ খাদ্য যে শুধুমাত্র সহজপাচ্য নয়, এটি শারীরিক ফ্যাট বিপাকেও যথেষ্ট সহায়তা করে।  
চোখের স্বাস্থ্য 
চোখের স্বাস্থ্যের কথা যদি বলা যায়, সেক্ষেত্রে ‘ভিটামিন এ’-এর সুদূরপ্রসারী ভূমিকা আছে নিরামিষ খাবারে। এই ভিটামিনের উৎস রেটিনল বিটা ক্যারোটিন। কুমড়ো, গাজর, বিট, লেবু এই ধরনের সব্জি ও ফল থেকে ভালোরকম বিটা ক্যারোটিন পাওয়া যায়। এছাড়াও লুটেইন এবং জিয়া জ্যান্থিনও চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। সাধারণত কালোজাম, জামরুল থেকে এটা পাওয়া যায়। জামরুলের মধ্যে জ্যাম্বোলাইন থাকার দরুন ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। 
হজমে সহায়তা করে
ফল ও শাকসব্জিতে প্রচুর পরিমাণে তন্তু থাকে, এই উদ্ভিজ্জ তন্তু আমাদের পরিপাক ক্রিয়ায় অনেক সহায়তা করে। শরীরের বিপাক ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য উদ্ভিজ্জ তন্তু হল উৎকৃষ্ট উপাদান। এছাড়াও এই সবুজ সব্জিতে প্রচুর পরিমাণে জল থাকে যা আমাদের দেহে জলের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে। এর ফলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও, বিভিন্ন ফাংশনাল ফুড  যেমন—চিয়াবীজ, ফ্ল্যাক্সবীজ, কুমড়োর বীজ আমাদের শরীরের মধ্যে সুদূরপ্রসারী ডায়েটরি ফাইবারের ভূমিকা নেয়। যার ফলে একদিক থেকে যেমন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে অপরদিকে জলে দ্রবীভূত ডায়েটরি ফাইবার কোলেস্টেরলকে বাইরে বের করে দিতে সাহায্য করে। যার ফলে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল রক্তে জমা হয় না। 
ভাত-ডালের উপকার
‌মা঩ছের মধ্যে যে পরিমাণ অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে সেই সমপরিমাণ অ্যাসিড চাল-ডাল এবং খিচুড়ির মধ্যে পাওয়া যায়। ভাতের মধ্যে খুব ভালো পরিমাণে মিথিওনিন অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং ডালের মধ্যে লাইসিন অ্যামাইনো অ্যাসিড পাওয়া যায়। চাল এবং ডাল মিশিয়ে যে খিচুড়ি তৈরি হয় তা শরীরের পক্ষে খুবই ভালো। 
লিভার ও কিডনির সমস্যায় উপকারী নিরামিষ খাবার
যাঁরা লিভারের সমস্যায় ভুগছেন ব্রাঞ্চড চেন অ্যামাইনো অ্যাসিড তাঁদের জন্য উপকারী। ডাল জাতীয় শস্য, সয়াবিন, বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে এগুলি পাওয়া যায়। অ্যারোমেটিক অ্যামাইনো অ্যাসিড পাওয়া যায় প্রাণিজ উৎস থেকে। মাছ, মাংস, ডিম বেশি পরিমাণে খেলে লিভারের সমস্যায় ভোগার সম্ভাবনা থাকে। কিডনির সমস্যায় নিরামিষ খাবার উপকারী। 
ফল-সব্জি খাওয়ার উপকার 
ফলের মধ্যে ভালো পরিমাণে ডায়েটরি ফাইবার, রাফেজ এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে। পেয়ারার মধ্যে পেকটিন, আপেলের মধ্যে কোয়ারসাটিন, লেবু থেকে হাসপিরিডিন, ক্যাপসিকামের মধ্যে লাইকোপিন, ফুলকপি থেকে সালফোরাফান পাওয়া যায়। এই সমস্ত ফল এবং শাকসব্জি থেকে ভালো রকমের উপকার মেলে।      
অর্থনৈতিক দিক
নিরামিষ খাদ্যের মূল্য আমিষ খাদ্যের তুলনায় অনেকটাই কম, তাই নিত্যনৈমিত্তিকভাবে নিরামিষ খাদ্যগ্রহণ আমাদের অনেকটাই সাশ্রয়, অর্থাৎ নিরামিষ খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে আমরা অর্থসাশ্রয় করতে পারি।
 লেখক কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সাম্মানিক ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ।
অনুলিখন: অনির্বাণ রক্ষিত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ