বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: আজ, দেশজুড়ে উদযাপন করা হচ্ছে স্বাধীনতা দিবস। লালকেল্লা থেকে পাড়ার রাস্তা, সর্বত্রই উৎসবের আমেজ। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পার হয়ে গেলেও চরম অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ভারতের প্রথম অস্ত্র আইনে দণ্ডিতা নারী বিপ্লবী দুকড়িবালা দেবীর গ্রাম ‘ঝাউপাড়া’। বিপ্লবীদের কাছে যিনি শ্রদ্ধার ‘মাসিমা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি রাজ্য বা কেন্দ্র, কোনো সরকারের পক্ষ থেকেই আজও যোগ্য সম্মান জানানো হয়নি বলে ক্ষোভে ফুঁসছে গ্রামবাসীরা। ক্ষুব্ধ তাঁর পরিবারও।
নলহাটির ব্রাহ্মণী নদীর তীরে অবস্থিত এই ঝাউপাড়া গ্রাম। ১৮৮৭সালের ২১ জুলাই এই গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন দুকড়িবালা দেবী। বোনপো নিবারণচন্দ্র ঘটকের সূত্রে বিপ্লবী আন্দোলনের ছোঁয়া পান তিনি। বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষের মতো বিপ্লবীদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের ভিটেকেই বানিয়েছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা। মাস্টারদা সূর্যসেন থেকে শুরু করে ক্ষুদিরাম বসু, বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ বিপ্লবীরা এই বাড়িতে আত্মগোপন করে থেকেছেন।
ইতিহাসের পাতায় ১৯১৪সালের ঐতিহাসিক ‘রডা কোম্পানির অস্ত্র লুট’ কাণ্ড ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক নতুন মোড় দিয়েছিল। চুরি হওয়া ৫০টি মাওজার পিস্তল ও কার্তুজের একটি বড় অংশ ব্রিটিশদের নজর এড়িয়ে অনুকুলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও নিবারণ ঘটকের মাধ্যমে এসে পৌঁছায় নলহাটির ‘মাসিমা’র কাছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ির উঠানে থাকা খড়ের পালুইয়ে সেসব অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন দুকড়িবালা দেবী।
১৯১৭সালের ৭জানুয়ারি ভোররাতে পুলিশবাহিনী তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে। সেদিন রাতারাতি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পাশের সুরধনী মোল্লানির বাড়িতে অস্ত্র পাচার করলেও গ্রামের এক বাসিন্দার বিশ্বাসঘাতকতায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান দুকড়িবালা। এরপর ১৯১৭ সালের ৮মার্চ অস্ত্র আইনে তাঁর দু’বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। পরাধীন ভারতের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী, যিনি সরাসরি অস্ত্র আইনে দণ্ডিত হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে যান। জেলে অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করেও ব্রিটিশ পুলিশের কাছে কোনো বিপ্লবীর নাম মুখ ফুটে উচ্চারণ করেননি তিনি। পরবর্তীতে ১৯৭০সালের ২৮ এপ্রিল ৮৩বছর বয়সে নিজ গ্রামেই পরলোকগমন করেন তিনি।
এত বড় এক ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও আজ বড়ই করুণ চিত্র ঝাউপাড়া গ্রামের। গতবছর নলহাটি-১ পঞ্চায়েত সমিতির সামনে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপিত হলেও এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের তরফে স্বাধীনতা দিবসে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের আয়োজন করা হলেও স্থায়ী কোনো উন্নয়ন মেলেনি গ্রামে। আজও বর্ষায় গৃহবন্দি হয়ে থাকতে হয় গ্রামবাসীদের।
তাঁর ৭১ বছর বয়সি নাতি পার্থসারথি চক্রবর্তী ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, ঠাকুমার দেওয়া জমিতে গড়ে ওঠা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো বড় স্মৃতিচিহ্ন নেই। ব্রাহ্মণী নদীর ওপর ঠাকুমার নামে একটি পাকা সেতুর দাবি আমরা বছরের পর বছর ধরে জানিয়ে আসছি। পূর্বতন সরকারের আমলে নদীর উপর কজওয়ে করে দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই কজওয়ের অবস্থাও খারাপ। বর্ষা এলে গোটা গ্রামের মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। দেশের জন্য ঠাকুমা এত বড় ত্যাগ স্বীকার করলেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এই গ্রাম চরম উপেক্ষিত থেকে গেল। কেউ খোঁজ পর্যন্ত রাখেনি। তবে এবার ১৫ আগস্টের দুপুরে বাড়ির উঠানে থাকা ঠাকুমার আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাতে বিজেপি নেতারা আসবেন বলেছেন।
আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে দেশ যখন বীর শহিদ ও বিপ্লবীদের স্মরণ করছে, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়, দেশের প্রথম নারী অস্ত্র দণ্ডিতা বিপ্লবীর গ্রাম কি এভাবেই নদী আর প্রশাসনের অবহেলার সাঁকোতে আটকে থাকবে, নাকি মিলবে যোগ্য সম্মান?