কেন শুধু মহালয়ার দিনই তর্পণ
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী: কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সপ্তদশতম দিন। রথ-বিপর্যয়ের মুখে কর্ণ। চাকা বসে গিয়েছে মাটিতে। সামনে অস্ত্রসম্ভারে সজ্জিত অর্জুনের রথ। সারথি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। অসহায় কর্ণ প্রাণপণে রথের চাকা তোলার চেষ্টা করছেন। কিছুতেই পারছেন না। কর্ণকে তাক করে ‘অঞ্জলিক বাণ’ ছুড়বেন কি না ইতস্ততবোধ করছেন অর্জুন। আর তখনই অর্জুনের মগজধোলাই শুরু করলেন শ্রীকৃষ্ণ। দীর্ঘক্ষণ ধর্ম-অধর্মের পাঠ শিখিয়ে শেষে বললেন—‘এত ভাবছো কেন পার্থ? কর্ণকে হত্যা করার এটাই তোমার কাছে অন্তিম সুযোগ। আমি বলছি, তুমি ওর মস্তকে এমনভাবে তির নিক্ষেপ করো, যাতে আর রথে উঠতে না পারে।’ অক্ষয় তূণী (জাদুকরী তির রাখার পাত্র) থেকে অর্জুন তুলে নিলেন ‘অঞ্জলিক’। তিন হাত চার আঙুল লম্বা একটি লৌহদণ্ড। সেটি ধনুকে লাগিয়ে বললেন, ‘আমি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে তপস্যা ও যজ্ঞ করে থাকি, যদি আমি ন্যায়ের পথে থাকি, তবে এই অস্ত্র আমার শত্রুনাশ করুক।’ শ্রীকৃষ্ণ আবারও অর্জনকে উসকে দিলেন—‘দেরি করো না পার্থ।’ কর্ণের মাথা লক্ষ্য করে ‘অঞ্জলিক’ ছুড়েই দিলেন অর্জুন। কর্ণ শুধু নীরবে শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে। মুখে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। মুহূর্তের মধ্যেই কর্ণের মস্তিস্ক ছিঁড়ে ‘অঞ্জলিক’ গিয়ে বিঁধল কুরুক্ষেত্রের মাটিতে। কর্ণের দেহটা পড়ে গেল রথের পাশে। তাঁর শরীর থেকে একটা জ্যোতি বেরিয়ে গিয়ে মিশে গেল সূর্যের সঙ্গে। শেষ হল মহাভারতের একটি অভিশপ্ত জীবনের অধ্যায়। 

Advertisement

ধরাধামে সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর, বীর পুরুষ ছাড়াও যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত অঙ্গরাজের পরিচয় ছিল ‘দাতা কর্ণ’ হিসাবে। প্রচুর দান-খয়রাতির মধ্যে রাজকীয় জীবন অতিবাহিত করেছেন। তাঁর কাছে কেউ কিছু চেয়ে বিমুখ হননি কখনো। সোনা-দানা, মণিমাণিক্য যে যা চেয়েছেন, অকাতরে বিলিয়েছেন কর্ণ। এমনকি, নিজের জীবনের সবচেয়ে বড়ো সুরক্ষা কবচকুণ্ডলও তিনি অবলীলায় দান করে দিয়েছেন। মর্ত্যলোকে এই দান-ধ্যানের কারণে পরম বৈষ্ণব আচার্য যমরাজের খাতায় কর্ণের পুণ্যার্জনের তালিকা হয়েছে দীর্ঘ। মৃত্যুর পর তাই তিনি স্বর্গলোকে আরোহণ করলেন। কর্ণকে বীরের সম্মানে আপ্যায়ন করলেন দেবরাজ ইন্দ্র। থালা সাজিয়ে এল ‘খাবার’। কিন্তু, থালায় কী সব দেখছেন কর্ণ! পাতে তো একতিলও অন্ন নেই। সামান্য জলও নেই। রয়েছে শুধু হিরে-সোনাদানা-মণিমাণিক্য।
হিন্দুশাস্ত্র মতে, তুমি নরলোকে যে পরিমাণ সম্পদ দান করবে, তার সহস্রগুণ বেশি ফিরে পাবে স্বর্গলোকে। কর্ণের কাছেও পুণ্যার্জনের ফল হিসাবে প্রচুর স্বর্ণ, মণিমাণিক্য সহ বিপুল পরিমাণ ধন-দৌলত আসতে থাকে। কর্ণের চতুর্দিকে ঠাসা বৈভব! কোনো কিছুরই অভাব নেই। অথচ, পাচ্ছেন না দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন আর জল। ক’দিন যেতে না যেতেই অস্থির হয়ে ওঠেন কর্ণ। অসম্ভব খিদের জ্বালা আর তৃষ্ণার্ত হয়ে তিনি ছুটলেন যমরাজের কাছে। রাগত সুরে বললেন, ‘প্রভু, এ আপনার কেমন বিচার!’ কর্ণের প্রশ্নের মুখে পড়ে যমরাজ বেশ বিব্রতবোধ করলেন। জবাব দিতে  গিয়ে বললেন, ‘আমার কিছু করণীয় নেই। বিধান বলে, মর্ত্যলোকে মানুষ যা দান করে, পরলোকে এসে তার চেয়ে কয়েক সহস্রগুণ বেশি ফিরে পায়। তুমি সেখানে যা কর্ম করেছো সেটাই এখানেও পাবে।’ 
কর্ণ নতমস্তকে যমরাজকে বলেন, ‘প্রভু, আমি তো মর্তে দানের বিষয়ে  কোনো ত্রুটি রাখিনি। আমার সব ধনসম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছি। এমনকি, আমার সুরক্ষাকবচও অন্যের হাতে তুলে দিয়েছি। তা হলে কেন আমি আপনার এখানে এসে দু’মুঠো খাবার ও জল থেকে বঞ্চিত থাকব? যমরাজ শান্ত গলায় বললেন, ‘তুমি সত্যিই দাতা। প্রচুর ধনসম্পদ দান করেছো, এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু, তুমি উদারহস্তে এতকিছু দান করলেও মর্তে কোনোদিন কাউকে অন্নদান করোনি। তৃষ্ণার্তকে একফোঁটা জলও দাওনি। সে কারণে তুমি এখানে বঞ্চিত খাদ্য ও পানীয় থেকে।’ কর্ণ মাথা নীচু করে বললেন, ‘প্রভু, আমি আর পারছি না। খিদের জ্বালায় ছটফট করছি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আপনি এর একটা বিহিত করুন। ফিরিয়ে নিন স্বর্গ-লোকের ধনসম্পদ। আমার কিচ্ছুটি চাই না। আপনি শুধু আমাকে সামান্য খাদ্য আর কয়েক ফোঁটা জল দিন।’ যমরাজ বললেন, ‘আমি নিরুপায় কর্ণ। ঈশ্বরের বিধান বদলানোর ক্ষমতা আমার নেই। আমি তাঁর দাসানুদাস মাত্র।’ কর্ণ করজোড়ে বললেন, ‘প্রভু, আমি না জেনে অপরাধ করে ফেলেছি। অন্ন-জলদান যে মর্তে এত মহোত্তম দান, এটা আমার জানা ছিল না। তা ছাড়া আমার বাবা-মা কে, তাই তো জানতাম না। আমার এই অনিচ্ছাকৃত অপরাধ ক্ষমা করুন।’
কর্ণের এমন অসহায় অবস্থা দেখে খানিক সদয় হলেন যমরাজ। পরামর্শ দিলেন এই বলে—‘বেশ, একটা সুযোগ তোমাকে দিচ্ছি। তুমি একপক্ষ কাল স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যলোকে ফিরে যাও। সেখানে গিয়ে অকাতরে অন্ন-জল দান করে আবার ফিরে এসো।’ কর্ণ আর সময় নষ্ট করলেন না। যমরাজের পরামর্শ মেনে তিনি পনেরো দিনের জন্য চলে এলেন নরলোকে। অকাতরে দান করে গেলেন অন্ন আর জল। পনেরো দিন পর স্বর্গে ফিরে গিয়ে দেখেন তাঁর জন্য সাজানো ভূরিভূরি আহার। সঙ্গে অবশ্যই পানীয় জল। তা দেখে খুশিতে আত্মহারা কর্ণ। 
আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা—এই পনেরো দিন ছিল কর্ণের দ্বিতীয় দফার নরলোকে বাস। যা আমাদের হিন্দুশাস্ত্র মতে পিতৃপক্ষ। কর্ণ স্বর্গলোকে ফিরে যান অমাবস্যা তিথিতে। সেটিই আসলে মহালয় বা মহালয়া। তবে, এখানে একটা প্রশ্ন সবার মনে উঁকি মারে, সেটা হল অমাবস্যা মানে তো আমরা অন্ধকার বুঝি। তা হলে মহালয়া বা মহান আলোর সঙ্গে অমাবস্যার সম্পর্ক বেমানান নয় কি? শাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেন, পিতৃপক্ষের অবসানে, অমাবস্যার অন্ধকার পেরিয়ে আমরা দেবীপক্ষে আগমন করি। আনন্দ-উৎসবের প্রস্তুতি শুরু করে দিই। এই মহালগ্ন আমাদের জীবনে আসলে ‘মহালয়া’। দেবী দুর্গাই হলেন আমাদের সেই মহান আশ্রয় বা আলয়। যিনি মর্তের যাবতীয় আঁধার থেকে আমাদের আলোকে উত্তরণের পথ দেখান। 
যাই হোক, মহাভারতের এই কর্ণ-আখ্যান মেনে আমাদের হিন্দুশাস্ত্রে ‘তর্পণ’-এর বিধান তৈরি হয়েছে। ‘তর্পণ’ কথার অর্থ তৃপ্ত করা। শাস্ত্রে কথিত, কর্ণের দ্বিতীয় দফায় ১৫ দিনের মর্ত্যলোকে আগমনের সময় আমাদের পূর্বপুরুষরাও প্রেতলোক ছেড়ে নেমে আসেন মর্তের কাছাকাছি। আশায় থাকেন তাঁদের উত্তরসূরিদের হাতে অর্ঘ্য-জল গ্রহণ করবেন। কিন্তু প্রেতলোক আর মহালয়া—দু’টি বৈপরীত্য শব্দের মধ্যে কিন্তু মরণের  কোনো অমোঘ ছায়া নেই। বরং রয়েছে উত্তরপুরুষ আর পূর্বপুরুষদের অমরত্ব বন্ধনের আকাঙ্ক্ষা। 
কিন্তু, আমরা যদি কর্ণ-অ্যাখ্যান মানি, তা হলে কেন শুধু মহালয়ার দিনই তর্পণ করতে হবে? শাস্ত্রজ্ঞরা বলেন, মহালয়ার দিন তর্পণ করার এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত এই পনেরো দিনের যে কোনো একটি দিন তর্পণ করা শাস্ত্রবিধি সম্মত। মনে করা হয়, ভাদ্র মাসের অমাবস্যাতে প্রেতপুরী প্রেতশূন্য হয়ে পড়ে। ওই সময় পূর্বপুরুষরা অর্ঘ্যজল পাওয়ার আশায় নীচের দিকে নেমে আসেন। তাই, এই ১৫ দিনের শেষদিন মহালয়ার এতবেশি মাহাত্ম্য। আর সেই মাহাত্ম্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট গলায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র গীতি আলেখ্য পাঠ। শিশির ভেজা ভোরে ‘তব অচিন্ত্য রূপ চরিত মহিমা...’ কিংবা দেবীর সেই শ্বাশ্বত অভয়বাণী ‘ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি। তদা তদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্‌’—হৃদয়ে ধারণ করে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে পূর্বপুরুষদের সঙ্গে অমরত্ব বন্ধন স্থাপন করার মধ্যে আধ্যাত্মিক এক অনুভূতি তৈরি করে। মহালয়ার দিন তর্পণের মূল তাৎপর্য ঠিক এখানেই। তার মানে এটা বলা যেতেই পারে, বাণীকুমার, পঙ্কজ ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ—এই ত্রয়ীর অক্ষয় সৃষ্টি আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত হওয়ার পর থেকে তর্পণের গুরুত্ব প্রশ্নাতীতভাবে বেড়েছে। এখন তো মহালয়া আর তর্পণ যেন সমার্থক। 
গীতি আলেখ্য নির্মাণ, সম্প্রচার ঘিরে কাটাছেঁড়া, নানা বিতর্কের পর শেষমেশ ১৯৩৭ সাল থেকে মহালয়ার ভোরকেই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচারিত করার আদর্শ সময় বেছে নেন বাণীকুমার। এই সময়ের আগেও বিধি মেনে তর্পণ হতো। তবে, আজকের মতো শুধুমাত্র মহালয়ার দিন গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ভিড় হতো এমনটা নয়। প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা, এই পক্ষকালের যে কোনো দিন তর্পণ করতেন বাংলার মানুষ। এমনকি, মহালয়ার ভোরে পাকাপাকিভাবে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচারিত হওয়ার পরও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। সময়টা আনুমানিক ১৯৫৭ সাল। কলকাতা হাইকোর্টের তরফে একটি স্পেশাল নোটিস জারি করা হতো তর্পণে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের উদ্দেশে। ওই নোটিসে এক থেকে দু’ঘণ্টার একটি মধ্যাহ্নকালীন ছুটি মঞ্জুর করার কথা ঘোষণা করা হতো। হাইকোর্টের কর্মী, আইনজীবীরা যে যাঁর সুবিধা মতো যে কোনো একটি দিন ধুতি পরে, গলায় গামছা নিয়ে গঙ্গার ঘাটে সেরে আসতেন তর্পণ। 
তবে, এই পনেরো দিন ছাড়াও বছরের প্রতিটি দিনই তর্পণের বিধান রয়েছে হিন্দুধর্মের একাধিক শাস্ত্রে। যে কেউ চাইলে রোজই তর্পণ করতে পারেন। অতীতে বহু মানুষ প্রতিদিন স্নানের সময় পূর্বপুরুষদের জল দিতেন। তা হলে মহালয়ায় তর্পণের বিশেষত্ব কোথায়? বিশেষত্ব মূলত দু’টি কারণে। প্রথমত এই দিনে কেবল পূর্বপুরুষ নয়, আত্মীয়-স্বজন, চেনা-পরিচিত, স্বল্পপরিচিত, অপরিচিত, বন্ধু-বান্ধব সহ প্রেতলোকে ঠাঁই পাওয়া সবার উদ্দেশেই জলদান করা যায়। গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম অকৃতদার ছিলেন। তিনি বিয়ে-থা করেননি। স্বভাবতই সন্তানাদি ছিল না তাঁর। তা হলে কি তিনি জল পাবেন না? তর্পণ পাওয়ার অধিকার নেই? সেই ভীষ্মের জন্য তর্পণেরও বিশেষ বিধি ও মন্ত্র রয়েছে আমাদের হিন্দুশাস্ত্রে। এর মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে ‘সর্বভূত হিতায়’ বা সর্বজনীন কল্যাণ কামনার বার্তা, ভারতের বহুত্ববাদের আধার। স্বামীজির বেদান্ত দর্শনের সঙ্গেও এই ভাবনার নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণের নরেন মনে করতেন, সমগ্র জগৎ একসূত্রে গাঁথা এবং প্রতিটি জীবের কল্যাণ কামনা করাই একজন আধ্যাত্মিক মানুষের পালনীয় প্রধান কর্তব্য।
দ্বিতীয়ত, মহালয়ার দিন তর্পণের সঙ্গে মিশে রয়েছে সূক্ষ্মজগতের রহস্য। এটা সম্পূর্ণ অনুভূতি ও উপলব্ধির বিষয়। আমরা প্রায় সকলেই তর্পণ করে ভাবি, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে নিবেদন করা অর্ঘ্য-জল তাঁরা পেলেন তো? তাৎক্ষণিক আত্মবিশ্বাসপূর্ণ একটা জবাবও আমরা পেয়ে যাই। দেবী দুর্গার আগমনের মহালগ্নে যে কোনো শুভকাজ সফলই হয়। তাই  অনেক শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন, নিত্যপূজা, নিত্যতর্পণ ও নিত্যপ্রার্থনার চেয়ে অনেক বেশি আলাদা মহালয়ার তর্পণের পরের এই অনুভূতি। মনের ভিতর একটা প্রশান্তি নেমে আসে। জাগতিক কোনো কিছুর সঙ্গে তার তুলনা হয় না। এই তৃপ্তিবোধেই রয়েছে মহালয়ার তর্পণের মাহাত্ম্য, সার্থকতা।