Bartaman Logo
২৮ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ কেন করা হয়?

মহালয়ার ভোরে বৈদিক মন্ত্রোচারণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তিল-জল নিবেদন করা হয়। অর্থাৎ তর্পণ করা হয়। এই শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘তৃপ’ (তৃপ্ত করা) থেকে।

পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ কেন করা হয়?
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

সংবাদদাতা, বহরমপুর: মহালয়ার ভোরে বৈদিক মন্ত্রোচারণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তিল-জল নিবেদন করা হয়। অর্থাৎ তর্পণ করা হয়। এই শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘তৃপ’ (তৃপ্ত করা) থেকে। পিতৃপক্ষের শেষ দিন অর্থাৎ মহালয়ার ভোরে পূর্বপুরুষের আত্মারা পৃথিবীর সব থেকে কাছাকাছি আসে বলেই ধারণা রয়েছে। 

Advertisement

পিতৃতর্পণ সন্মন্ধীয় রামায়ন ও মহাভারতে দু’টি পৃথক কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে। রামায়ণে রামচন্দ্র স্বস্ত্রীক বিহারের গয়ায় ফলগু নদীতে পিতৃতর্পণ করতে এসেছিলেন। তখন থেকেই মর্ত্যে পিতৃতর্পণের প্রচলন বলে ধরে নেওয়া হয়। আবার মহাভারতে কর্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর স্বর্গপ্রাপ্তী হলে সেখানে তাঁকে স্বর্ণ, ধনরত্ন খেতে দেওয়া হয়। ধনরত্ন কেন? কর্ণের প্রশ্নের জবাবে দেবরাজ ইন্দ্র বলেন, আপনি মর্ত্যে দু’হাতে ধনরত্ন বিলিয়েছেন। কিন্তু পূর্বপুরুষকে জল দান করেননি। মহাবীর কর্ণ নিজের পিতৃ পরিচয় জানতেন না। তাই দেবরাজ ইন্দ্র কর্ণকে একপক্ষ কালের জন্য মর্ত্যে পাঠান, পিতৃতর্পণের জন্য। একপক্ষ কাল কর্ণ পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেন। অন্য মতে, সেই একপক্ষ কালকে পিতৃপক্ষ হিসেবে ধরা হয়।
যদিও জ্যোতিষ শাস্ত্রমতে সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ শুরু হয়। মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষ শেষ হয়ে দেবীপক্ষের শুরু হয়। আর এদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ পূর্বপুরুষদের আত্মার তৃপ্তিতে গঙ্গায় তর্পণ করেন। জল, তিল (পরিবর্তে ধান, যব), চন্দন, ফুল তুলসিপাতা(বিষ্ণু) দিয়ে তর্পণ করা হয়। যাঁদের কাছাকাছি গঙ্গা নেই, তাঁরা স্থানীয় নদীতে বা পুকুরেও তর্পণ করেন। এভাবেই হাজার হাজার বছর ধরে পিতৃপক্ষ ও দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণে পিতৃতর্পণ চলে আসছে। শুধু পুরুষরা নয়, মহিলাদের তর্পণেও কোনও বাধা নেই। শাস্ত্রমতে অবিবাহিতরাও পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে পারে।
মুর্শিদাবাদ জেলার উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে গঙ্গার শাখানদী ভাগীরথী। ফরাক্কা থেকে পলাশীর প্রান্তর, গঙ্গার দু’পাড়ে পুণ্যার্থীদের ঢল উপচে পড়ে। জেলার বাইরে বীরভূম, ঝাড়খণ্ড, বিহার থেকেও বহু পুণ্যার্থী বহরমপুরে আসেন তর্পণ সারতে। সূর্যদ্বয়ের আগে থেকে ভাগীরথীর বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি দখল করে পুরহিতের দল জজমানের অপেক্ষায় থাকেন। একদলের শেষ হয়। ফের শুরু হয় আর এক দলের। দেবীপক্ষ শুরুর আগে পর্যন্ত তিথি অনুসআরে গঙ্গা বক্ষে পিতৃতর্পণ চলে।
জ্যোতিষবিদ শুকদেব আচার্য বলেন, মহালয়ার সকালে অতৃপ্ত আত্মারা পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসে বংশধরদের হাত থেকে জল গ্রহণের জন্য। বহু পরিবার তর্পণ করে না। যাঁরা তর্পণ করেন, তাঁদের নিজের পিতৃমাতৃ কুল সহ আত্মীয়, পরিজন, বন্ধুবান্ধব সহ সমস্ত জীবকুলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা উচিত। প্রতিবছর বহরমপুর কলেজ ঘাটে জজমানদের তর্পণ করান প্রদ্যুৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রদ্যুৎবাবু তর্পণের কোশাকুশি সহ সমস্ত সরঞ্জাম নিয়েই ঘাটে আসেন। তিনি বলেন, সব জজমান তর্পণের উপাচার আনতে পারেন না। আমার জজমান অন্য পুরহিতের কাছেও যান না। বহরমপুরের কলেজঘাঁট, ব্রিজের ঘাঁট, জগন্নাথ ঘাঁট, রাধারঘাঁট, খগড়া শ্মশানঘাঁট এলাকায় সব থেকে বেশি ভিড় জমে। বীরভূমের রামপুরহাটের বাসিন্দা অভিজিৎ মণ্ডল বলেন, বাবার মৃত্যুর পর ৭ বছর ধরে বহরমপুরে এসে তর্পণ করি। খুব তৃপ্তি পাই।

সম্পর্কিত সংবাদ