Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

মাটির নীচের ফল-সব্জি কেন খাবেন? কতটা খাবেন?

খাদ্যের প্রধান উৎস মাটি। শুধু উপর নয়, মাটির নীচেও রয়েছে বহু ফসলের সূতিকাগার। আলু, পেঁয়াজ, রসুন থেকে শুরু করে নানা সব্জি ও ফলের জোগান পাই মাটি থেকেই।

মাটির নীচের ফল-সব্জি কেন খাবেন? কতটা খাবেন?
  • ২৭ এপ্রিল, ২০২৫ ১৭:০৪
Prefer us on Google

খাদ্যের প্রধান উৎস মাটি। শুধু উপর নয়, মাটির নীচেও রয়েছে বহু ফসলের সূতিকাগার। আলু, পেঁয়াজ, রসুন থেকে শুরু করে নানা সব্জি ও ফলের জোগান পাই মাটি থেকেই। প্রকৃতি আমাদের যে সব খাবার সামগ্রী দিয়েছে তার গুণাগুণ বহুবিধ। কোনওটির সাহায্যে রোগ নিরাময় হয়, কোনওটি আবার কাজে লাগে প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে। মাটির নীচে জন্মানো বেশকিছু ফসল একইসঙ্গে স্বাস্থ্যরক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনেরও সহায়ক। বৈদিক ঋষিরা বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতিজাত ফসলের প্রভাবশক্তি আমাদের চিত্তবৃত্তিকেও প্রভাবিত করে। ঋতুভেদে মৃত্তিকাজাত সব্জি ও ফলের উপকারিতার কথা লিখলেন তরুণ চক্রবর্তী।

Advertisement

 

মানুষ যখন অরণ্যচারী ছিল, প্রকৃতির অকৃপণ দান— গাছ, পাতা, লতা-গুল্ম, ফুল, ফল, মূল আর বুনো জানোয়ারের মাংসই ছিল তার আহার্য। অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, ক্রমে সেইসব সামগ্রীর উপকারিতা ও অপকারিতার বাছবিচার করেই মানুষ সেগুলি গ্রহণ করতে থাকে। সভ্যতার অগ্রগমনের সঙ্গে সঙ্গে এক একটি উদ্ভিদের ফুল, ফল, কাণ্ড, ছাল, মূল সব কিছুরই নানা গুণাগুণ আবিষ্কৃত হতে থাকে। সেই অনুসন্ধান আজও বহমান। প্রকৃতি থেকে পাওয়া এইসব সামগ্রীর সাহায্যে আমাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি ছাড়াও নানা ব্যাধির যেভাবে উপশম হয়, তার জুড়ি মেলা ভার। কেন না এগুলির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন প্রায়শই থাকে না, পুষ্টির দিক থেকেও খুবই মূল্যবান। 
মাটির ওপরে যেমন, মাটির নীচেও প্রকৃতিদেবী আমাদের আহার্য আর রোগ নিরাময়ের অজস্র উপাদান সাজিয়ে রেখেছেন। এগুলির কোনওটি আবার আমাদের প্রসাধন সামগ্রী তৈরির উপাদান হিসেবে খুবই কার্যকর। মাটির নীচে জন্মানো বা ভূজন্মা যেসব সব্জি আমরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করি, সেগুলির উপকারিতা ও উপযোগিতার কিছু কথাই এ নিবন্ধের উপজীব্য। 
বর্ণাশ্রমের কালে রাজ্যরক্ষার কাজে ব্রাহ্মণের পরেই ছিল ক্ষত্রিয়ের স্থান। বীরপুরুষ হিসেবেই গণ্য হতেন তাঁরা। এই ক্ষত্রিয়দের আহার্য সামগ্রীর মধ্যে সুকন্দক বা পেঁয়াজ ও রসুন ছিল অন্যতম। ক্ষাত্রধর্মে দীক্ষিত ব্যক্তিমাত্রই তাঁদের ক্ষাত্রশক্তি জাগ্রত করা এবং তা বজায় রাখার জন্য পেঁয়াজ ও রসুনের মতো মূল জাতীয় শস্যকেই সবচেয়ে উপযোগী বলে মনে করতেন। 
বৈদিক ঋষিরাও বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতিগত প্রভাবশক্তি আমাদের প্রবৃত্তিকেও প্রভাবিত করে। উপবর্হণ সংহিতায় বিষয়টির ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। বৈদিক যুগের পরবর্তীকালে চরক-সুশ্রুতের মতো পণ্ডিতকুল এইসব বিষয় নিয়ে যে অনুশীলন করে গেছেন, সেগুলি আজও আয়ুর্বেদ চিকিৎসার পথ প্রদর্শক। এঁরা সবাই বলেছেন, উদ্ভিদের ফল থেকে যে খাদ্যগুণ মেলে, আমাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে সেটিই হল সবচেয়ে বড় শক্তি। মাটি, জল আর বায়ু এবং সূর্যালোক সেই শক্তির ভাঁড়ার পূর্ণ করে রাখে। 
মাটি থেকে আমরা কেবল মূল্যবান খনিজ পদার্থই আহরণ করি না। মাটি খুঁড়ে আহরণ করি আরও মূল্যবান আমাদের কিছু আহার্যও। সাধারণভাবে মাটির নীচে জন্মানো শস্যের মূলকে কন্দ বলা হয়ে থাকে। আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, মুলো, রাঙালু, শাঁকালু, বিট, গাজর, ওল, কচু, চীনে বাদাম— এসবই মাটির নীচে জন্মায়। মাটি থেকে তুলে এইসব গাছের কন্দগুলি ব্যবহার করি। আমাদের এই আহার্যগুলির প্রত্যেকটির যেমন উপকারিতা আছে, তেমনই আবার সকলের পক্ষে সব কিছু গ্রহণযোগ্যও নয়। চিকিৎসকরা এক একজনের প্রয়োজন অনুযায়ী, এগুলিকে কতটা খেতে পারবেন, তাও নির্দিষ্ট করে দেন। 
আলু
প্রথমেই আলুর কথায় আসা যাক। ভোজ্য কন্দ হিসেবে বিশ্বের নানা দেশে আলুর ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে যেমন কয়েকরকমের আলু উৎপন্ন হয়, এগুলির উপকারিতাও নানাবিধ। তবে বিশেষ বিশেষ শারীরিক অবস্থায় চিকিৎসকরা এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কথাও বলে থাকেন। 
দামে সস্তা ও বিশেষ বিশেষ খাদ্যগুণসম্পন্ন আলু আমাদের প্রায় সকলেরই নিত্য দিনের প্রধান একটি আহার্য বলা যেতে পারে। এর মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, মিনারেল আর ভিটামিন। এগুলি আমাদের নানা রোগ প্রতিরোধ করে শরীরকে সুস্থ রাখার পক্ষে সহায়ক। শুধু রান্না করা খাবার হিসেবেই নয়, ক্ষত নিরাময় থেকে রূপচর্চা পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে আলু ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 
বিশ্বে প্রায় দুশোরকম আলুর চাষ হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও মোটামুটি সাত রকমের আলু পাওয়া যায়। বাংলার বাজারে ‘জ্যোতি’ আর ‘চন্দ্রমুখী’ এই দু’ধরনের আলুর চলই বেশি। তবে সাধারণত যে ধরনের আলু সবচেয়ে বেশি খাই আমরা তার নাম ‘রাসেল আলু’। সাদা রঙের এই আলুর খোসা হয় বাদামি। ছোট, বড়, মাঝারি— তিন রকম আকারের হয় এই আলু। ভাজা, সিদ্ধ, ঝোল, ঝাল হিসেবেই আলু খাই আমরা। 
সাদা আলুর ভিতর ও উপরিভাগ দুইই সাদা। এতে সুগারের পরিমাণ কম থাকে। এ আলু সিদ্ধ, ভাজা, তরকারি এবং স্যালাড হিসেবেও খাওয়া যায়। 
হলুদ আলু আকারে খুব ছোট, বড় বা মাঝারি হতে পারে। এটি সাধারণত মাখনের মতো নরম হয় এবং আগুনে ঝলসে কিংবা ঝাঁঝরিতে ভেজে খাওয়া যায়। একইভাবে অর্থাৎ রোস্ট ও গ্রিল করে খাওয়া যায় বেগুনি আলু। এর খোসা ও ভেতরের অংশ সবই বেগুনি রঙের। 
আঙুলের মতো সরু ও লম্বাটে এক ধরনের আলুর নাম দেওয়া হয়েছে ফিঙ্গারলিং আলু। সাদা, হলুদ, লাল ও বেগুনি— এই চার রঙেরই হতে পারে এমন আলু। এর খোসা খুব পাতলা। চিপস বা ভাজা হিসেবে এ আলু খাওয়া যায়। 
এক ধরনের আলু হয় খুব ছোট ছোট। আলুর দম বানাতে এ আলু খুব উপযোগী। তবে তরকারি বা ভাজা হিসেবেও খাওয়া যায়। লাল আলু, রাঙা আলু বা মিষ্টি আলু যেমন কাঁচা বা স্যালাড হিসেবে খাই আমরা, পিঠে বা পায়েসের মতো খাবার তৈরিতেও এটি ব্যবহার করা যায়। অনেকে সিদ্ধ করেও খেয়ে থাকেন। 
গুণাগুণ:
আলুতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি থাকায় আমাদের শরীরের পক্ষে এটি বেশ পুষ্টিকর ও প্রয়োজনীয় খাদ্য। ক্যালোরি ছাড়াও আলুতে থাকে সোডিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সেলেনিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, জিঙ্ক, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার, সুগার, প্রোটিন, থায়ামিন, নায়াসিন, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড, কোলাইন, বেটাইন, রিবোফ্লাবিন, ভিটামিন-এ, বি-৬, বি-১২, সি, ডি, কে এবং ই। 
আলুতে থাকা প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও কার্বোহাইড্রেট পুষ্টিসাধনে বিশেষ সহায়ক।
গুণাগুণ:
এক নজরে দেখা যেতে পারে এর উপকারিতা। তবে প্রথমেই মনে রাখা ভালো, সাধারণত আমরা খোসা ছাড়িয়েই আলু ব্যবহার করি বটে, কিন্তু তাতে এর পুষ্টি মাত্রা অনেকটাই কমে যায়। আলুর গায়ে লেগে থাকা মাটি, বালি ইত্যাদি ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে খোসা সুদ্ধ আলু রান্না করে খেলে কিন্তু অনেক উপকারিতা। খোসা সমেত আলু মাইক্রোওয়েভে বেক করে খেলেও এর পুষ্টিকর উপাদানগুলি নষ্ট হয় না। তবে অতিরিক্ত সময় ধরে ফোটালে বা রান্না করলে এমন সব উপাদান আর থাকে না। 
 রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকরা কম সোডিয়াম এবং বেশি পটাশিয়ামযুক্ত খাবার খেতে বলেন। এ দুটি পদার্থই আছে আলুতে। 
 হার্ট বা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার কোলেস্টেরলকে। ফাইবার, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন বি ও সি থাকায় আলু সেই কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। 
 আমাদের শরীরে ডিএনএ তৈরিতে সাহায্যকারী ফোলেট থাকে আলুতে। যেসব কোষ ক্যান্সারের কারণ হতে পারে, আলু খেলে সেগুলি নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া আলুতে ফাইবার থাকায় তা কোলন ক্যান্সারের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারে। 
 হাড় মজবুত রাখার উপযোগী আয়রন, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও জিঙ্ক— এইসবকটি উপাদানই আলুর মধ্যে থাকে। আমাদের শরীরের গঠন শক্ত রাখতে এগুলি সাহায্য করে। আবার এতে ফসফরাস থাকায় তা অস্টিওপোরাসিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। 
 সঠিক পরিমাণে ফাইবার থাকায় আলু খেলে হজমের ক্ষমতা বাড়ে। আমাদের পাচনতন্ত্রও সঠিকভাবে চলে। 
 হজম ও পাচনতন্ত্রের ক্ষমতা বজায় থাকলে শরীরে জলের মাত্রাও ঠিক থাকে। তাই দেখা যাচ্ছে আলু, কিডনিতে স্টোন হওয়া রোধ করতে সক্ষম। 
 ভিটামিন সি থাকার দরুন আলু দাঁতের নানা সমস্যা দূর করতে সহায়ক। এক টুকরো আলু দিয়ে রোজ দাঁত মাজলে দাঁত ও মাড়ির উপকার হয়। তবে ব্রাশ দিয়েও দাঁত মাজতে হবে তা না হলে দাঁতের ফাঁকে জমে যাওয়া খাবারের টুকরো দূর হবে না। 
 আলু সিদ্ধ করে খেলে পেটের অসুখ, আমাশয় ও বদহজমের সমস্যা থেকে অনেক সময় অব্যাহতি পাওয়া যায়। 
 আলুতে যে পরিমাণ ফাইবার ও অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট থাকে, তা শরীরের ইলেকট্রোলাইসিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে গা-হাত-পা ফুলে যাওয়া বা শরীরের ফোলাভাব আলু খেলে দূর হয়। 
 কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম ও গ্লুকোজের মতো উপাদান থাকে আলুতে। আলু খেলে তাই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যোন্নতি হয়। 
 সঠিক পরিমাণ পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালশিয়াম আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে। ফলে স্নায়ু সচল থাকে। এই স্নায়ুতন্ত্রই প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রক্ষা করে। আমাদের মানসিক ও শারীরবৃত্তীয় কাজের সমন্বয় ঘটায়। 
 আলু বিশেষ করে মিষ্টি আলু বা রাঙা আলু ভিটামিন ‘এ’ এবং অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ। তাই এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। 
 খুবই সামান্য পরিমাণ ফ্যাট থাকায় প্রতিদিন অল্প পরিমাণ আলু খেলে ওজন বাড়ে না। তবে সিদ্ধ আলুই ভালো সবচেয়ে। ভাজার সঙ্গে তেল মিশে থাকে বলে তা মেদবহুল মানুষ বা ডায়াবেটিকদের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়। আলুতে গ্লাইসেমিকের মাত্রা বেশি থাকায় ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তবে রাঙা আলুর ক্ষেত্রে তা অনেক কম। অতিরিক্ত কোনও কিছুই ভালো নয়, আলুও তাই। প্রতি একশো গ্রাম আলুতে ক্যালোরি থাকে একশো তেরো। এছাড়া থাকে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট। বেশি আলু খেলে তাই ওজনও বেড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটি উপায় কিছুটা সহায়ক হয়। আলু কাটার পর বেশ কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে রেখে তারপর রান্না করলে আলুর স্টার্চ বেরিয়ে যায়। ফলে শরীরে বেশি কার্বোহাইড্রেট যেতে পারে না। 
কোনওরকম রোগে ভোগার পর কোষ্ঠকাঠিন্য ও সেইসঙ্গে শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিলে আলুর সাহায্যে তা দূর করার কয়েকটি নিদানের কথা বলে গেছেন আয়ুর্বেদাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, 
১) একশো গ্রামের মতো আলু ভাতে দিয়ে বা জলে সিদ্ধ করে, তারপর ছাল ছাড়িয়ে পরিমাণ মতো নুন মিশিয়ে, দিনে দু’বার ভাত বা রুটির সঙ্গে অথবা জলখাবারের সঙ্গে খেতে হবে। 
২) আলু গাছের নরম ডগা ও পাতা, পঞ্চাশ গ্রাম আন্দাজ নিয়ে অল্প ভাপিয়ে, জলটা নিংড়ে নিতে হবে। এরপর তা ভেজে অথবা আলু, বেগুন সহযোগে তরকারি রান্না করে একবেলা বা দু’বেলাই খেতে হবে। 
৩) মসুর অথবা ছোলার ডালে কচি আলুশাক পঁচিশ থেকে তিরিশ গ্রাম পরিমাণ দিয়ে রান্না করে, পরিমাণ মতো ডাল খেতে হবে। এই পদ্ধতির যে কোনও একটি একবেলা, প্রয়োজনে দু’বেলা কিছুদিন ধরে খাওয়া উচিত। উপকার পাওয়া গেলে আর নিয়মিত খাওয়ারও প্রয়োজন নেই। আলু বা আলুশাকের লোকায়ত এমন ব্যবহার আজ হয়তো অনেকেরই জানা নেই। 
আয়ুর্বেদে বলা আছে, আলু খেলে যাঁদের অম্বল হয়, বা যাঁরা অম্লপিত্তে ভুগছেন, অথবা যাঁদের ডায়াবেটিস বা মধুমেহ আছে, তাঁরা ডালে আলু শাক দিয়ে খেতে পারেন। 
স্নায়বিক দুর্বলতা দূর করতে আলু সিদ্ধ করার পর ছাল ছাড়িয়ে নুন দিয়ে একবারে একশো গ্রামের মতো খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া একশো গ্রাম সিদ্ধ আলু, কয়েক টুকরো গাজর আর পেঁয়াজের কুচি দিয়ে স্টু তৈরি করে প্রতিদিন একবার খালি পেটে, কিংবা কিছুদিন (দু’-তিন মাস অন্তত) জলখাবারের সঙ্গে খেতে হবে। 
অরুচি হলে আলু গাছের কচিপাতা ও নরম ডগা একশো গ্রামের মতো নিয়ে ভেজে, সপ্তাহখানেক ধরে দুপুরের খাবারের সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে। 
কোনও জায়গা পুড়ে গেলে, তা যদি অল্প হয়, তাহলে আলু থেঁতো করে ভালোভাবে বেটে সেখানে প্রলেপ দিলে ক্ষতস্থানের উপশম হয়। বিশেষ করে আমাদের গ্রাম বাংলায় আজও এই পদ্ধতিটি অনেকেই অনুসরণ করে থাকেন। আলুর রস ক্ষতস্থানের জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করে। পোড়া জায়গায় আলুর খোসা লাগালেও জ্বলুনি কমে। 
আমাদের ত্বক বা চামড়ার বিভিন্ন সমস্যায় আলুর উপকারিতা প্রমাণিত সত্য। 
১) নানারকম পুষ্টিকর উপাদান থাকায় আলু বাটার রস নিয়মিত মুখের উপরিভাগে লাগালে বয়সের ছাপ বা চামড়ার কোঁচকানো ভাব (রিংকল) দূর হয়। 
 দু’ টুকরো আলু রোজ চোখের ওপরে ও নীচে কিছুক্ষণ ধরে লাগিয়ে রেখে তারপর ধুয়ে ফেললে চোখের তলায় কালি পড়া বা ফোলাভাব মিলিয়ে যায়। এটি কয়েকদিন নিয়মিত করতে হবে। 
 প্রখর রোদে চামড়ার পোড়া দাগও তুলে দিতে পারে আলু। এক্ষেত্রে আলু ভালো করে ধুয়ে তারপর থেঁতো করে তার রস মুখে বা যেখানে ট্যান কিংবা সানবার্ন হয়েছে, সেখানে লাগিয়ে রাখলে পোড়াভাব চলে যায়। 
 চামড়ার কালো ছোপ দূর করতে হলে, একটু বেসন ও মধুর সঙ্গে কয়েক ফোঁটা আলুর রস মিশিয়ে নির্দিষ্ট জায়গাগুলিতে লাগিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। কিছুক্ষণ পর তা ধুয়ে ফেললেই হবে। 
 মুখমণ্ডলের ত্বকের শুকনো খসখসে ভাব খুব ভালোভাবে দূর করতে পারে আলু। এক টুকরো আলুর রস একটু দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে প্রতিদিন মুখের ওপর লাগাতে পারলে তা চামড়ার মরা কোষগুলি তুলে দেয়। ফলে মুখশ্রীও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। 
 আলুতে ক্যাটেকোলেস নামে একটি পদার্থ থাকে। জামা-কাপড়ে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেললে যেমন পরিষ্কার হয়। তেমনই আলুর আছে ত্বক পরিষ্কার করার বিশেষ ক্ষমতা। ডিটোরজেন্টের মতোই কাজ করে আমাদের চামড়ার ক্ষেত্রে। কেবল মুখশ্রী নয় ত্বকের শ্রীও ফেরে আলুর রস লাগালে। ত্বক সুন্দর ও মসৃণ হয় আলুর ভেতরের প্রাকৃতিক ওই উপাদানে। 
 ভিটামিন, মিনারেল ও পটাশিয়াম একসঙ্গে আমাদের ত্বকের কোলোজেন তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা নেয়। কোলোজেনই শক্ত করে বেঁধে রাখে কোষগুলিকে। ফলে বয়সের ছাপ পড়ে না মুখে। আলুতে এই উপাদানগুলি থাকায় আমাদের চামড়া যেমন তা টান টান করে রাখতে পারে সেইসঙ্গে ত্বকের লাবণ্যও বাড়ে। 
 আলুতে ভিটামিন বি, সি ও জিঙ্ক, নিয়াসিন আর আয়রন থাকায় চুল পড়া ও খুশকির সমস্যা দূর করতে পারে। নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করতে পারে আলু ছেঁচা রস। আবার আলুর খোসায় যে স্টার্চ থাকে তা চুল পাকা কমায়। 
শাঁকালু
চিরহরিৎ লতা জাতীয় একটি সব্জি হল শাঁকালু। এটিরও মূলকেই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। কেউ একে বলে কেশর আলু, কেউ শাঁখা আলু, কেউ বা শাঁক আলু বা শাঁকালুও। এটি সব্জি বা ফল দু’ভাবেই খাই। খুব রসালো, কচকচে ও মিষ্টি এই কন্দটির খোসা ছাড়িয়ে কাঁচাই খাওয়া যায়। কেউ খান রান্না করে। শাঁকালু গাছের পাতা এবং শুঁটিতেও যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টি উপাদান থাকে। এগুলিও রান্না করে খাওয়া যায়। 
গুণাগুণ:
শাঁকালুতে আমাদের শরীরের পক্ষে প্রয়োজনীয় স্টার্চ ছাড়াও বেশ কয়েকটি ভিটামিন থাকে, থাকে মিনারেলও। যেমন, ক্যালোরি, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন সি ও ই, ফোলেট, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজ। এছাড়া অল্প পরিমাণে ভিটামিন বি-৬, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড, জিঙ্ক, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস এবং কপারও থাকে। কম ক্যালোরি ও বেশি ফাইবার থাকায় এটি মেদ কমাতে সাহায্য করে। খাবার হিসেবে যেমন এটি পেট ভরায়, জলের চাহিদাও মেটায়। শাঁকালুর ভেতর গুরুত্বপূর্ণ ওইসব উপাদান থাকায় শাঁকালু খেলে ডায়াবেটিস এবং স্মৃতিভ্রংশতার মতো মারাত্মক অসুখের সম্ভাবনা কমে। নিয়মিত খেলে শাঁকালুর ফাইবার আমাদের ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল বাড়িয়ে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। এর ভিতর যে পটাশিয়াম থাকে তা রক্তচাপ কমিয়ে দিয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোক থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে। শাঁকালু কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে হজমশক্তি বাড়ায়। 
শাঁকালুর জলীয় পদার্থের সঙ্গে মিশে থাকে ভিটামিন সি, আমাদের শরীরে অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট হিসেবে যা কাজ করে। আবার এর ভিতরে ইনুলিন নামে যে পদার্থ থাকে, তা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর জীবাণু কমিয়ে উপকারী জীবাণুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। 
অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ভিটামিন সি ও ই, সেলেনিয়াম এবং বেটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় শাঁকালু আমাদের শরীরের ফ্রি র‌্যাডিক্যালসগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এই ফ্রি র‌্যাডিক্যালস কোষের ক্ষতি করে ক্যান্সার রোগ ডেকে আনে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, দিনে সাতাশ গ্রামের বেশি শাঁকালু খেলে কোলন ক্যান্সারের সম্ভাবনা পঞ্চাশ শতাংশ কমে যায়। শাঁকালুর ডায়েটারি ফাইবার এই উপকার করে। শাঁকালু আমাদের শরীরে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক রাখতেও সহায়ক ভূমিকা নেয়। ফলে নিয়মিত শাঁকালু খেলে শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমে যায়। 
অনেকটা শঙ্খের মতো দেখতে বলে সমতলে যা শাঁকালু নামে পরিচিত, পাহাড়ি এলাকার মানুষ তাকে ঠান্ডা আলু বলে থাকেন। সমতলের চেয়ে পাহাড়ি এলাকাতেই শাঁকালুর ফলন বেশি হয়। বিশেষ করে এতে রোগ-পোকার বালাই থাকে না বলে, ফলনও হয় একর প্রতি চোদ্দো থেকে পনেরো টনের মতো। শাঁকালুর গায়ে হাত দিলে ঠান্ডা বোধ হয় বলে চাকমারা একে ‘জুড়ো আলু’ বলে থাকেন। চাকমা ভাষায় ‘জুড়ো’ মানে ঠান্ডা। এককালে পাহাড়ি মানুষদের কেউ কেউ ভাতের বিকল্প হিসেবে শাঁকালু খেতেন। অনেকে শুঁটকি মাছের সঙ্গে শাঁকালু রান্না করে খান। 
পেঁয়াজ 
প্রাচীনকালে যা ছিল ‘পলাণ্ডু’, আধুনিক যুগে তার নাম হল পেঁয়াজ। এটি জন্মায় প্রায় সব দেশেই এবং তা বেশ কয়েকরকমের। এমন দেশ নেই বললেই চলে, যেখানে পেঁয়াজ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। কাঁচা থেকে শুরু করে শুকনো, ভাজা, তরকারি, আচার ইত্যাদি নানাভাবে পেঁয়াজ খেয়ে থাকি। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় ভারত ও চীনদেশে। ভারতে পেঁয়াজের চাষ সবচেয়ে বেশি হয় মহারাষ্ট্রের নাসিকে। এছাড়া দক্ষিণ ভারত, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও গুজরাতেও পেঁয়াজের চাষ হয় ভালোই। 
আমাদের দেশের সুপ্রাচীন ধন্বন্তরি নিঘণ্টু ও রাজনিঘণ্টুতে পলাণ্ডু, শ্বেতকন্দ পলাণ্ডু, রাজ পলাণ্ডু, ক্ষীর পলাণ্ডু ইত্যাদি নামের উল্লেখ আছে। এ থেকেই বোঝা যায়, কতকাল থেকে চলে আসছে এই আনাজটির ব্যবহার। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলিতে মানুষের খাদ্যের মৌলিক একটি উপাদান এই পেঁয়াজ এবং প্রায় সব রান্নাতেই এর ব্যবহার আছে। 
বাজারে সাধারণত লাল ও সাদা রঙের পেঁয়াজ পাওয়া যায়। এগুলির আকার বড় ও ছোট দু’ ধরনেরই। আর এক ধরনের ছোট ছোট পেঁয়াজও পাওয়া যায়। একে কেউ বলে ছাঁচি পেঁয়াজ, কেউ বা মড়ি পেঁয়াজ। এর স্বাদ বেশ ঝাঁজালো। এগুলি জন্মায়ও গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে। পেঁয়াজের স্বাদ মিষ্টি কিংবা তেতোও হয়।
গুণাগুণ: 
প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, সালফার, মিনারেল, ফাইবার, রিবোফ্লাবিন ছাড়াও ভিটামিন বি ও সি থাকায়, পেঁয়াজ পুষ্টিগুণে বিশেষ সমৃদ্ধ। এছাড়াও পেঁয়াজে থাকে থায়ামিন, ন্যায়াসিন, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড, আয়রন, ফোলেট, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, দস্তা, জল ও ফ্লুয়োরাইড। এ থেকেই বোঝা যায় পেঁয়াজ কতখানি উপকারী। 
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, পেঁয়াজ বায়ুনাশক ও বলকারক, কফ নিঃসারক, প্রস্রাবকারক, উত্তেজক প্রভৃতি। এটি অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি বায়োটিক, অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল ও কারমিনেটিভ গুণসম্পন্ন বলে আধুনিককালের গবেষণায় দেখা গেছে। পেঁয়াজ আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকেও সক্রিয় রাখে। পেঁয়াজ খেলে সাধারণত কারও অ্যালার্জি হয় না। 
 নিয়মিত পেঁয়াজ খেলে শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। ফলে হার্টের অসুখের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। এই সব্জিটি খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে শরীর সতেজ রাখে। 
 পেঁয়াজে কুয়েরসিটিন নামে একটি যৌগ থাকে। একইসঙ্গে এটি ক্যান্সার প্রতিরোধ ও উচ্চ রক্তচাপ কমানোর সহায়ক। এছাড়া এই যৌগটি শরীরে ইনসুলিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে সুগারকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। 
 পেঁয়াজ জ্বরের প্রকোপ কমায়। জ্বরে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে, পাতলা করে কাটা পেঁয়াজ কপালে রাখলে, কিছুক্ষণের মধ্যে তাপমাত্রা নেমে যায়। 
 ইনসমনিয়া বা অনিদ্রায় যাঁরা কষ্ট পান তাঁরা পেঁয়াজ খেলে বিশেষ উপকার পাবেন। 
 সর্দি-কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা হলে পেঁয়াজের রস ও মধু মিশিয়ে এক চামচ করে দিনে দু’-তিনবার খেলে রোগের উপশম হয়। 
 সামান্য পুড়ে গেলে ক্ষতস্থানে এক টুকরো পেঁয়াজ কিছুক্ষণ রেখে দিলে জ্বালা কমে, ক্ষতও সারে। এ কথা আগেও বলা হয়েছে। 
 কাঁচা পেঁয়াজ নিয়মিত খেলে হজমের সমস্যা দূর হয়। যদিও গ্যাস্ট্রাইটিসের রোগীদের এটি খাওয়া চলে না। 
 পেঁয়াজে কার্মিনেটিভ, অ্যান্টি মাইক্রোবায়াল, অ্যান্টিসেপটিক ও অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় পদার্থ থাকায়, শরীরের কোথাও সংক্রমণ হলে এগুলি তা দূর করে। কয়েকদিন পেঁয়াজ খেলে এক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়। 
 পোকা-মাকড়ের কামড়ে, রোদে পোড়া ভাব, ব্রণ বা ফুসকুড়ি দূর করতে পেঁয়াজের রস উপকারী। 
 অস্টিওপোরোসিসের মতো হাড়ের কঠিন রোগে পেঁয়াজ বিশেষ ফলদায়ী। 
 চুল পড়া রোধ করে চুল গজাতেও সাহায্য করে পেঁয়াজ। 
পেঁয়াজের মধ্যে যে ডায়াটারি সালফার নামের খনিজ পদার্থটি থাকে, তা চুল গজাতে সাহায্য করে। দু’ সপ্তাহ ধরে দিনে দু’বার চুলের গোড়ায় পেঁয়াজের রস ঘষে ঘষে লাগালে, চুল গজানো শুরু হয়। তবে সকলেরই জানা, নির্দিষ্ট একটা বয়সের পর কিংবা টাক পড়লে চুল গজানো সম্ভব নয়। পেঁয়াজের রস চুলের গোড়ায় সংক্রমণ দূর করে, ক্ষতিকর ফ্রি র‌্যাডিকেলও হাঠিয়ে দেয়। এই ফ্রি র‌্যাডিকেল চুলের ফলিকল নষ্ট করে, ফলে চুল পাতলা হয়ে যায়। 
জুসারে পেঁয়াজ থেকে রস বের করে চুলের মধ্যে ম্যাসাজ করে লাগানো যায়। কুড়ি মিনিট রেখে ধুয়ে ফেললেই হবে। পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ দূর করতে সামান্য একটু এসেনসিয়াল অয়েল মেশানো যেতে পারে। 
রসুন 
পেঁয়াজের পরই আসে রসুনের কথা। রান্নার মশলা এবং ভেষজ ওষুধ হিসেবে এর ব্যবহারও চলে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। নানারকম আচার ও মুখরোচক খাবার তৈরিতেও রসুন ব্যবহৃত হয়ে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব পনেরোশো শতকেও চীন ও ভারতে রক্ত পাতলা করার জন্য রসুনের ব্যবহার ছিল। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস, যাঁকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয়, তিনি সারভাইক্যাল ক্যান্সারের চিকিৎসায় রসুন ব্যবহার করেছিলেন। বিখ্যাত ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর জানিয়েছিলেন, রসুনের অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের কথা।
গুণাগুণ: 
 আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন কাঁচা রসুন খেলে শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল কমে যায়। এর ফলে হার্ট ভালো থাকে। আবার রক্তচাপও নিয়ন্ত্রিত হয়। 
 রসুনে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র‌্যাডিক্যালস ঠেকিয়ে দেয়। বিপাকীয় ক্রিয়া ও পরিবেশ দূষণের ফলেই তৈরি হয় ফ্রি র‌্যাডিকেলস। পুষ্টিবিদরা পূর্ণবয়স্কদের রসুনের দু’-তিনটি কোয়া খেতে বলছেন। রোজ সকালে এক কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খেলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। 
 ভেষজ গুণের জন্য কাঁচা রসুনই বেশি উপকারী। কাটলে বা রান্না করলে এর ভেতরে থাকা অ্যালিনেজ নামে একটি উৎসেচক নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। 
 রসুনে প্রচুর আমিষ বা পুষ্টিকর উপাদান, ক্যালশিয়াম ও সামান্য ভিটামিন সি থাকে। সর্দিকাশিতে পথ্য হিসেবে এটি খুব উপকারী। 
 রসুন একাধারে কৃমিনাশক, শ্বাসকষ্ট ও হাইপারটেনশন কমায়, শ্বাসনালীর কফ বের করে দেয়, হাড়ের নানারোগ সারায় এবং চুল পেকে যাওয়া কমায়। 
রসুনের ব্যবহার বহুবিধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকদের চিকিৎসায় সালফার কম পড়লে রসুন ব্যবহার করা হতো, যাতে গ্যাংগ্রিন না হয়। আমাদের দেশের হিন্দি বলয়ে ‘লাসুন কি ক্ষীর’ জাতীয় মিষ্টি কয়েকটি খাবার তৈরিতে রসুন দেওয়া হয়। 
কর্পূরের সঙ্গে পোড়া রসুন মেশালে মশা, মাছি, পোকামাকড়ের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। রসুন থেঁতো করে জলে মিশিয়ে তা দিয়ে ঘর মুছলেও পোকামাকড় কমে। পায়ের পাতায় কড়া হলে রসুন আধখানা করে কেটে সেই জায়গায় রেখে লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে বন্ধ করে রাখতে হয়। কয়েকদিন এমনভাবে রাখলে কড়া সেরে যায়। সকালে ও বিকেলে এক কোয়া করে রসুন কয়েকদিন খেলে আমাশয় রোগ সারে। রসুনের মধ্যে অ্যালাইল সালফাইড থাকায় এই কন্দটির সবরকম জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষমতা আছে। সর্ষের তেলে রসুন ভেজে সেই তেল মালিশ করলে বাতের ব্যথার উপশম হয়। যক্ষা রোগের নিরাময়ে প্রতিদিন এক কোয়া করে রসুন অল্প গরম দুধে মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা। রসুন, মাছ বা কাঁচা দুধের সঙ্গে খেতে নিষেধ করা হয়েছে। এতে রক্ত দূষিত হয়। হিপোক্রেটিস রোগ প্রতিরোধে বনৌষধির মধ্যে সর্বোচ্চস্থান দিয়েছেন রসুনকে। 
এককালে ইউরোপীয়দের বিশ্বাস ছিল, রসুন বা রসুনের মালা ঘরের সামনে ঝুলিয়ে রাখলে ভ্যাম্পায়ার বা রক্তচোষা বাদুড়রা আসতে পারে না। 
আদা 
রান্নায় ব্যবহৃত অন্যতম প্রধান মসলা আদা বা আদ্রকও একটি উদ্ভিদমূল। আদা ব্যবহৃত হয় আচার সহ নানা খাদ্য সামগ্রী ও সুগন্ধ তৈরির উপাদান হিসেবে। এটি আবার ভেষজ একটি ওষুধও বটে। এশিয়া থেকে ইউরোপে প্রথম যেসব মশলা রপ্তানি করা হয়েছিল, আদা তার অন্যতম। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের মানুষ আদা ব্যবহার করতেন। বৈদিক যুগে আদাকে বলা হতো মাংসভক্ষক। অর্থাৎ আদার রসে মাংস নিজে জীর্ণ হয়, ফলে সেই খাদ্য সুপাচ্যও হয়। 
গুণাগুণ:
রোগ প্রতিকারে আয়ুর্বেদে আদার বেশ কয়েকটি উপকারের কথা বলা হয়েছে। যেমন, আদার রস আর মধু মিশিয়ে খেলে জ্বর, সর্দি ও গা-হাত ব্যথার উপশম হয়। কাশি ও হাঁপানিও এতে উপশম হয়। 
 দুপুরের খাওয়ার আগে সৈন্ধব লবণ দিয়ে এক টুকরো আদা চিবিয়ে খেলে খিদে বাড়ে, বিস্বাদ কমে, জিভের জড়তা কাটে, কফও উঠে যায়। 
 অরুচি হলে সিকি কাপ জলে দু’ চামচ আদার রস আর অল্প একটু নুন মিশিয়ে দশ-পনেরো মিনিট মুখে পুরে রাখতে হয়। তারপর তা ফেলে দিলে ক্রমে খাওয়ার রুচি ফিরে আসে। 
 কথায় বলে ‘আদা জল খেয়ে লাগা’। আদা আসলে খিদে কমায়, মেদ ঝরায়। সকালে খালি পেটে আদা আর তুলসীপাতার রস খাওয়ার চল বহুদিনের। এতে বাতের সমস্যাও কমে যায়। 
 প্রতিদিন তিন থেকে চার গ্রাম আদা খেলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। কমে হৃদ রোগের ঝুঁকিও। 
 আদার মধ্যে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকায় এটি শরীরে রক্ত চলাচল ঠিক রাখে, বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত হতে দেয় না। 
 আদার রস শরীর ঠান্ডা করে। বদহজম, গ্যাস, অম্বল, বুক জ্বালা ও বমিভাব কাটাতে সাহায্য করে। 
 আদা দেওয়া চা খেলে অনেক সময় মাথা ধরা ছেড়ে যায়। 
 আদা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষগুলি ধ্বংস করে দিতে পারে। 
 আদার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন আমাদের ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য বজায় রাখার সহায়ক। 
মুলো
মূলের নামেই যার পরিচয়, সংহিতাকারদের বর্ণিত সেই মূলকং আমাদের ভাষায় মুলা বা মুলো। হিন্দিভাষীরা বলেন, মুলি। আহার্য ও ভেষজ হিসেবে মুলোর ব্যবহার যে বহুকাল থেকে চলে আসছে সে কথা বলা বাহুল্য। শীতকালীন এই সব্জিটি রোমানদের শাসনকালের আগে থেকেই এশিয়ার দেশগুলিতে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাজারে সহজলভ্য এবং দামেও সস্তা এই কন্দটি কিন্তু বহুগুণান্বিত।
গুণাগুণ 
 মুলো রক্ত শুদ্ধ করে এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ায়। ন্যাবা বা জন্ডিসের রোগীদের পক্ষে মুলো খুব উপকারী। কাঁচা বা সিদ্ধ দু’ভাবেই খাওয়া যেতে পারে। 
 মুলো খেলে আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকে। ফলে শরীরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজমও অব্যাহত থাকে। 
 প্রচুর পরিমাণে জল ও ফাইবার থাকায় মুলো আমাদের শরীরে জলের মাত্রা ঠিক রাখে, মূত্রের পরিমাণ বাড়ায়, মূত্র ত্যাগের সময় কোনওরকম প্রদাহ থেকে মুক্তি দেয়, কিডনি সুস্থ রাখে। এছাড়া শরীরের ওজন কমাতেও এটি সাহায্য করে। 
 এতে কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার থাকায় এই সব্জিটি পাইলস নিরাময়ে সহায়ক। 
 মুলোর মধ্যে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন স্নায়বিক চাপ কমিয়ে দেয়। 
 গলব্লাডার, যকৃতের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখতে মুলো সাহায্য করে। 
 এর জলীয় পদার্থ শরীরের আদ্রতা বজায় রাখে। 
 ভিটামিন সি থাকায় এটি শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ক্যান্সারের কোষ তৈরিতে বাধা দেয়, ঠান্ডা লাগার হাত থেকেও বাঁচায়। 
 মুলো এক ধরনের অ্যান্টিসেপ্টিকও। ক্ষতস্থানে মুলোর রস লাগালে ব্যথা কমে। 
 কাঁচা মুলো পাতলা করে কেটে লাগালে ব্রণ কমে। কাঁচা মুলো বেটে ফেসপ্যাক ও ক্লিনজার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। 
 কাঁচা মুলো খেলে জ্বর কমে। 
 এটি পেট ব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করে। 
 কচি মুলো দিয়ে স্যালাড করে খেলে খিদে বাড়ে। 
বাজারে লাল ও সাদা দু’ধরনের মুলো পাওয়া যায়। পুষ্টির দিক থেকে দুটোই সমান। মুলো শাকের গুণ আবার আরও বেশি। এ শাক ভেজে বা রান্না করে খাওয়া যায়। 
আয়ুর্বেদশাস্ত্রে, কচি মুলো শুকিয়ে রেখে, সেটিকেই ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। মাঘ মাসে মুলো খাওয়া যে নিষেধ, তার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ওই সময় সূর্যকিরণে মুলোর রসে বিবর্তন ঘটে। শরীরের পক্ষে তা হিতকর নয়। বলা হয়েছে, কচি মুলো ত্রিদোষনাশক, পাকা মুলো তার বিপরীত। আয়ুর্বেদশাস্ত্রে বর্ণিত কয়েকটি মুষ্টিযোগের কথা বলা যেতে পারে। 
 শুকনো মুলো কুড়ি গ্রাম চার কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে, সেই ক্বাথ দু’বেলা খেলে, কফজ শোথ বা ফুলো রোগের উপশম হয়। অ্যালার্জি দূর করতেও এটি সহায়ক। 
 খাদ্যনালীতে কোনও উত্তেজক পদার্থের ছোঁয়া লাগলে হিক্কার উদ্রেক হয়। যাঁদের হার্টের অসুখ আছে, তাঁদের এর সঙ্গে শ্বাসের টানও দেখা দিতে পারে। এর নিরাময়ে পাঁচ থেকে সাত গ্রাম শুকনো মুলো দু’ কাপ জলে সিদ্ধ করে, এক কাপ মতো হলে, তা ছেঁকে নিয়ে পাঁচ-ছ’বার একটু করে খেতে হবে। 
 আমাশয় দূর করতে চার কাপ জলে দশ গ্রাম মুলো সিদ্ধ করে, এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে দিনে চার-পাঁচবার খেতে হবে। দু’-একদিন এমন করে খেলেই আরোগ্য হবে। 
৪) মূত্রথলিতে স্টোন বা পাথুরি হলে, মুলোশাক বেটে রস করে সেটি একটু গরম করে নিতে হবে। এরপর প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে তিন-চার চামচ করে খেতে হবে। 
৫) মুলোর বীজ পাঁচ-সাত গ্রাম জলে বেটে গায়ে চন্দনের মতো লাগালে, ছুলির দাগ মিলিয়ে যায়। 
বিট
 আয়ুর্বেদশাস্ত্রে বলা হয়েছে, বিট স্বাদে মধুর, স্বভাবে বলকারক, কফ নিঃসারক, পুষ্টিকর এবং মৃদু বিরেচক গুণসম্পন্ন। বিট, বিটের পাতা ও বীজ রোগ প্রতিকারে কাজে লাগানো যায়।
গুণাগুণ: 
 বিট অপুষ্টি দূর করে। শিশুদের রোজ এক টুকরো করে কাঁচা বিট খাওয়ালে তাঁদের শরীর পুষ্ট হয়। বয়স্ক মানুষ পঁচিশ থেকে তিরিশ গ্রাম কাঁচা বিটের খোসা ছাড়িয়ে কুচি কুচি করে কেটে স্যালাড হিসেবে দু’বেলাই ভাত বা রুটির সঙ্গে খেতে পারেন। এতে শরীর ভালো থাকে। 
 প্রচুর আয়রন থাকায় বিট অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা দূর করে রক্তের ঘাটতি পূরণের সঙ্গে শরীরে রক্তসঞ্চালনও বাড়ায়। 
 বিটের রস পান করলে উচ্চ রক্তচাপ কমে। এতে যে নাইট্রেট থাকে তা এই কাজটি করে, স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও কমায়। 
 উচ্চ রক্তচাপ, শোথ ও আমবাতের মতো কয়েকটি রোগ হলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়। এক্ষেত্রে পথ্য হিসেবে বিটের তরকারি বা বিট পাতার জুস তৈরি করে খেলে কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। পঁচিশ থেকে তিরিশ গ্রাম বিটপাতা কুঁচি করে কেটে, ভালোভাবে ধুয়ে দু’কাপ জলে সিদ্ধ করতে হবে। পরিমাণটি এক কাপের মতো হলে সেটি ছেঁকে অল্প গরম অবস্থায় খেতে হয়। এতে নুন মেশানো নিষেধ। মূল রোগের চিকিৎসার সঙ্গে আনুষঙ্গিকভাবে এই জুস ব্যবহার করা যায়। 
 বিটে যে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে তা ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক। শরীর থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন হাটাতেও এটি সাহায্য করে। 
 বিট বদহজম, জন্ডিস, পেটের অসুখের সমস্যা দূর করে, যকৃতের কাজও ঠিক রাখে। 
৭) এক গ্লাস বিটের রস খেলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেহের শক্তি বাড়ে। এতে পেশি সবল হয়। 
 বিটের রস খেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে— ব্রণ, বলিরেখা দূর হয়। 
 থাইরয়েড ও ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দূর করতে হলে বিট খাওয়া জরুরি। 
 ক্যালসিয়ামের জোগান দিয়ে বিট হাড় মজবুত করে। নিয়মিত বিট খেলে হাড়ের সমস্যা দূর হয়। 
 বিটের মধ্যে থাকে বিটেইন ও ট্রিপটোফেন— এ দু’টি উপাদান আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে। 
পালং ও বিট একই পরিবারের বলে বাংলায় অনেকে বিটকে বলেন বিট পালং। বিটের পাতা অবশ্য পালং শাকের মতোই বেটে বা রান্না করে খাওয়া যায়। বিট ও বিটের পাতা দুয়েরই উপকারিতা অনেক। 
গাজর
এটি শীতকালীন সব্জি হলেও বাজারে প্রায় সব সময়ই কম বেশি পাওয়া যায়। মাটির নীচে গাজরের প্রধান মূলটিতে প্রচুর খাদ্য সঞ্চিত হওয়ায় মূলটি স্ফীত হয়ে ওঠে। এই মূলে থাকে জল, কার্বোহাইড্রেট, খনিজ লবণ এবং যথেষ্ট পরিমাণে ক্যারোটিন। রাসায়নিক এই পদার্থটি হলুদ রঙের হওয়ায় গাজরের মূলটির রংও হয় হলুদ বা কমলা। প্রাণীদেহে এই ক্যারোটিন থেকে ভিটামিন এ তৈরি হয় বলে সব্জি হিসেবে গাজরের মূল উৎকৃষ্ট। এটি নানারকম খাবার তৈরির উপাদান। গাজর যেমন স্যালাড হিসেবে কাঁচা খাওয়া যায়, তেমনি আবার বানানো যায় স্যুপ, তরকারি, হালুয়া, ভেজিটেবল চপ ইত্যাদি। সুস্বাদু এবং আঁশ বা ফাইবার সমৃদ্ধ এই গাজরের উপকারিতা অনেক।
গুণাগুণ: 
 গাজরে থাকা ক্যারটিনয়েড অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমায়। 
 আমাদের রক্তের প্রধান উপাদান আরবিসিকে গাজর দীর্ঘজীবী করে এবং রক্ত বৃদ্ধি করে। রক্ত শুদ্ধিকরণেরও সহায়ক এই সব্জিটি। 
 ডায়েটরি ফাইবার ও অ্যান্টি অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ গাজর ধমনীর ওপর কোনও আস্তরণ জমতে না দিয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে। ফলে হার্টও সুস্থ থাকে, নিয়মিত গাজর খেলে। 
 যেসব কোলেস্টেরল রক্তে মিশে জমাট বেঁধে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি করে, গাজর সেই কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। 
 এটি অ্যান্টিসেপটিক হিসেবেও কাজ করে। পোড়া বা কাটার ক্ষতস্থানে গাজরের কুঁচো বা সিদ্ধ করা গাজর লাগালে সংক্রমণের ভয় থাকে না। 
 খনিজ লবণ থাকায় এটি দাঁত ও মুখের ভেতর পরিষ্কার রাখে, হাড় মজবুত করতেও সাহায্য করে। 
 গাজর মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলিকে দ্বিগুণ কর্মক্ষম করে আমাদের মেধাশক্তি বাড়ায়। 
 গাজরে থাকা বিটা ক্যারোটিন যেহেতু আমাদের শরীরে ভিটামিন এ-তে পরিণত হয়, তাই এটি খেলে অন্যান্য উপকারের সঙ্গে দৃষ্টিশক্তিও বাড়ে। 
 বিটা ক্যারোটিন ও ভিটামিন সি বাতের ব্যথা কমায়। বিভিন্নরকম রোগের দরুন যাঁদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, গাজরের রস সেবনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা তাঁদের একটি বিষয়ে সচেতন থাকতে বলেন। গাজরের রস অনেক সময় যকৃতে টক্সিক উপাদান তৈরি করে। তাই সকালে ও রাতে খাওয়ার পর এবং ওষুধ খাওয়ার দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর গাজর খাওয়া ভালো। 
সৌন্দর্য রক্ষাতেও গাজরের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্য। ক্যারোটিনয়েড নামে একটি রঞ্জক পদার্থ থাকে গাজরে। এটি আমাদের ত্বকের কোষ পরিষ্কার করে, ত্বককে উজ্জ্বল, আকর্ষণীয় করে তোলে। রোদে পোড়াভাব দূর করতে গাজর বেশ উপযোগী। গাজরের সঙ্গে মধু মিশিয়ে ত্বকের প্রলেপ হিসেবে লাগালে ত্বক উজ্জ্বল হয়। অনেকে মুখশ্রী উজ্জ্বল করতে ফেসিয়ালের উপাদান হিসেবে গাজর ব্যবহার করে থাকেন। এটি চামড়ার কুঁচকে যাওয়া, খসখসে ভাব এবং ব্রণও দূর করতে সক্ষম। 
ওল
পুষ্টিগুণ ও উপকারিতার দিক থেকে ওলকে অনেকে ধন্বন্তরি বলে থাকেন। সাধারণত ফাল্গুন-চৈত্র মাসেই এই ফসলটি ওঠে। যাকে আমরা মাদ্রাজি ওল বলি, সেটি অবশ্য অন্য সময়েও পাওয়া যায়। সারা দেশেই ওল জন্মায়। 
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের অভিমত, এতে আছে কার্বোহাইড্রেট, অল্প পরিমাণে ফ্যাট, প্রোটিন, থায়ামিন, আয়রন, আঁশ, নিকোটিনিক অ্যাসিড, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন এ।
গুণাগুণ: 
 ওলের ডাঁটা ও কচিপাতা দিয়ে তৈরি তরকারি বা ঘণ্ট শরীরের পক্ষে উপকারী। 
 ওলের ডালনা বা ওলসিদ্ধ নিয়মিত খেলে অর্শ থেকে মুক্তি মেলে। 
 মিষ্টি ওল উষ্ণ ও কষা এবং তা শরীরে উষ্ণতা দেয়, ফোঁড়া পাকতে ও ফাটাতে সাহায্য করে। 
 ওল হজমের শক্তি বাড়ায়। এটি বায়ু ও কফ নাশক। ওল খাদ্যে অরুচি দূর করে। 
 বোলতা বা ভীমরুলের হুল ফোটানোর জ্বালার উপশম হয় ওলের ডগার আঠা লাগালে। 
 এর ডাঁটার রস লাগালে দু’ তিন দিনেই হাজা ভালো হয়ে যায়। 
 ছুলি ও দাদ সারাতে হলে সে জায়গায় ঘি মাখিয়ে ওল পোড়া ঘষতে হয়। 
 চুলকানি থাকলে কিংবা যে ওলে গলা চুলকায়, তা অবশ্যই খাওয়া উচিত নয়। তবে আয়ুর্বেদশাস্ত্র মতে, এই বুনো ওল গোদ, শূল ব্যথা ও দাঁতের ব্যথার মহৌষধ। 
 ওল কেটে টুকরো করে মাটির পাত্রে রেখে, মাটি দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে শুকিয়ে নিয়ে তারপর পোড়াতে হবে। সেই ওলপোড়া ছাইয়ের সঙ্গে ঘি মিশিয়ে তা দিয়ে দাঁত মাজলে মুখ ও মাড়ির ক্ষত সেরে যায়। তবে মাটি না লেপে পোড়ালে, হিতে বিপরীত হয় বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। 
 ওল পুড়িয়ে ঝলসে নিয়ে তা ঘি দিয়ে মেখে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। এইভাবে খেলে অর্শ্ব রোগেরও উপশম হয়। 
গাঁ-গঞ্জে একটি প্রবাদ আজও শোনা যায়, ওল, কচু, মান, তিনই সমান। আসলে এগুলিও উপাদেয় পথ্য এবং ওষুধও। 
কচু 
সব্জি হিসেবে নানা ধরনের কচু খেয়ে থাকি। এগুলি হল মুখী কচু, মানকচু, পানিকচু, পঞ্চমুখী কচু, দুধ কচু, শোলা কচু ইত্যাদি। যেসব কচু বনে জঙ্গলে আপনা থেকেই জন্মায়, সেই বুনোকচুর সব জাতই আমাদের খাদ্য নয়। প্রজাতিভেদে কচুর মূল, ডাঁটা, পাতা, লতি সবই মানুষের খাদ্য। কচুর মূলে থাকে প্রচুর পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ভিটামিন। খরিফ মরশুমে মুখী কচুর চাষ হয়। এগুলি সুস্বাদু এবং এতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ এবং আয়রন থাকে।
গুণাগুণ: 
ওল কচুর পুষ্টি ও ঔষধিমূল্য অনেক। ওল কচুর রস, উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে প্রতিষেধক হিসেবে খাওয়ানো হয়। মানকচুর কাণ্ডের নিম্নাংশ মাটির নীচে মোটা কন্দের সৃষ্টি করে। বাতের রোগীকে মানকচু বাটা, এর ডগা ও পাতা খাওয়ানোর প্রথা বাংলায় বহুল প্রচলিত ছিল। রান্না করেও মানকচু খাওয়া যায়। কচু শাকে পর্যাপ্ত আঁশ থাকায়, খাবার হজম হতে তা সাহায্য করে। প্রচুর পরিমাণে ক্যালশিয়াম ও আয়রন থাকায়, কচু খেলে হাড় শক্ত হয়। কচুতে ভালো পরিমাণ আয়োডিনও থাকে। গ্যাস্ট্রিক বা অম্বলের রোগীদের পক্ষে কচু খুব উপকারী। কচুর লতিতে চিনির পরিমাণ কম থাকায় ডায়াবেটিস রোগীরাও এটি খেতে পারেন। 
কচুর মূল উপাদান আয়রন, আমাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক রেখে শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখে। কচু কান, গলার রুক্ষতা বা সুড়সুড়ি দূর করে। কচুতে অক্সালিক অ্যাসিড থাকায় কচু খেলে অনেক সময় গলা চুলকোয়। তবে রান্নার সময় এতে লেবুর রস দিলে তা আর হয় না। কারও অ্যালার্জি থাকলে অবশ্য চিকিৎসকরা তাঁকে কচু খেতে বারণ করেন। কচু দূর করে রক্তাল্পতা, সারাতে পারে ক্ষত এবং রাতকানা রোগ। কচুর ডাঁটায় প্রচুর পরিমাণ জল থাকায়, গরমের দিনে শরীরে জলের ঘাটতি পূরণ করে। আমাশয় রোগেরও এটি প্রতিষেধক। প্রায় দু’ হাজার বছর আগেও কচুর চাষ হতো বলে অনুমান করা হয়। 
চিনে বাদাম 
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রাজিল থেকে আমাদের দেশে প্রথম যে বাদামটি এনে চেনাল পর্তুগিজরা, তার নামের সঙ্গে চীনে বা চীনা শব্দটি যে কেমন করে জুড়ে গেল, তা গবেষণার বিষয়। বেশ কয়েকরকমের বাদামের মধ্যে চীনে বাদামই জন্মায় মাটির নীচে। গ্রামাঞ্চলে অনেকে একে বলে মাঠ কড়াই বলেন। বাংলা ছাড়া দেশের অন্যত্র এ বাদামটি মুঙ্গফলি নামে পরিচিত। 
বহু শাখা প্রশাখার বর্ষজীবী এই চীনে বাদাম গাছের দৈর্ঘ্য হয় হাত দুয়েকের মতো। কাণ্ডের দু’ধারে পাতার বোঁটার গোড়ায় বেরনো দণ্ডের ওপর হলুদ ফুল ফোটে। পরাগ মিলনের পর এক সময় পুষ্পদণ্ডটি মাটি ছোঁয়। তখন ঝুরো মাটি দিয়ে সেটি চাপা দিতে হয়। মাটি দিতে হয় গাছের কাণ্ডের মাঝে মাঝেও। এরপর গুটি হয়ে বাদাম ফলে মাটির নীচেই। বছরে দু’-তিন বার এর চাষ করা যায়।
গুণাগুণ: 
শুধুই বাদাম ভাজা বা মুড়ির সঙ্গে এই ভাজা চীনে বাদাম সবারই প্রিয় খাবার। চীনে বাদামও বহুগুণের আকর। কয়েকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড ও ফলিটের মতো খনিজ পদার্থ থাকে এতে। এছাড়া থাকে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ফসফরাস, ক্লোরিন, জিঙ্ক, আয়রন, কপার এবং ভিটামিন এ, বি, সি, ডি, ই ইত্যাদি। চীনে বাদামের ব্যবহারও তাই বহুবিধ। সুস্বাদু, রুচিকর, বলবর্ধক এই খাদ্যটি আমাদের যথেষ্ট পুষ্টি জোগাতে পারে। 
 কাঁচা বাদাম রাতে জলে ভিজিয়ে রেখে, পর দিন সকালে অল্প পরিমাণে খাওয়া যায়। অনেকে সকালে ব্যায়াম করার পর এইভাবেই চীনে বাদাম খান। 
 বাংলায় শুকনো কড়া বা মাটির খোলায় বালির সঙ্গে গরম করে কাঁচা বাদাম ভেজে খাওয়া তো সুপ্রচলিত। এছাড়া নুন জলে বাদাম ফেলে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নেওয়া যায়। ঠান্ডা হলে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে ভালো করে শুকিয়ে তারপর ভেজে খাওয়া যেতে পারে। 
 চীনে বাদামে আয়োডিন থাকায় থাইরয়েডের রোগীর পক্ষে এটি উপকারী। 
 দিনে দশ-বারোটি করে চীনে বাদাম খেলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে এবং ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে। 
 শরীরের দুর্বলতা দূর করতে আট থেকে দশ গ্রাম ভাজা চীনে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে বেটে নিতে হবে। এরপর এক কাপ দুধ বা জলে ফেলে একটু চিনি বা মিছরি দিয়ে শরবত হিসেবে সকালে ও বিকেলে খাওয়া যেতে পারে। 
৬) চীনে বাদামের শরবত অপুষ্টিও দূর করে। 
 মস্তিষ্কের পুষ্টিবিধান ও কার্যকারিতায় চীনে বাদাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-৩ থাকায় স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। 
 চীনে বাদামের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক। উচ্চ প্রোটিন ও অ্যামাইনো অ্যাসিড সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি বলবর্ধক। 
অন্য বাদামের তুলনায় চীনে বাদাম সস্তা, সহজলভ্য। তবে চিকিৎসকরা বলেন, দশ থেকে কুড়ি গ্রামের বেশি এই বাদাম খাওয়া ঠিক নয়। বেশি খেলে হজমের সমস্যা, অম্বল, বুক জ্বালা, অজীর্ণ, শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রচুর ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট থাকায় মেদও বাড়ে। আবার মেদ কমাতে চাইলে, মধ্যাহ্ন আহারের ঘণ্টাখানেক আগে, কয়েকটি চীনে বাদাম খান। এতে খিদে কিছুটা কমে, ভাতও বেশি খেতে হয় না। এইভাবে এ বাদাম খেলে সুগার কমে, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগও নিয়ন্ত্রণে থাকে। 
চীনে বাদামের তেল দিয়ে রান্নাও করা যায়। পোলাও, চিঁড়ের পোলাও ইত্যাদি রান্নাতেও চীনে বাদাম ব্যবহৃত হয়। ত্বককে মসৃণ ও মোলায়েম রাখার পক্ষে বাদামটি বেশ কার্যকর। কারও অ্যালার্জি থাকলে চীনে বাদাম খাওয়া ঠিক নয়। চীনে বাদাম যেহেতু শরীর গরম করে, তাই বাদাম খেতে খেতে বা খাওয়ার পরই জল খাওয়া উচিত নয়। বাদাম খেলে শরীরে যে তাপ উৎপন্ন হয়, জল খেলে তা ঠান্ডা হয়ে যায়। এতে সর্দিগর্মিও হতে পারে, বাদামে যেহেতু তেল থাকে তাই বাদামের গরম আর জলের ঠান্ডায় খাদ্যনালীতে ফ্যাট জমে কাশিও হয়। 
শরীর সুস্থ রাখতে মৃত্তিকার গর্ভজাত এই সব সব্জিৱ গুণাগুণ হেলাফেলা করার মতো নয়। তাই চিকিত্সকদের সঙ্গে পরামর্শ করে রোজ খাবার পাতে রাখুন মাটির নীচের সব্জি ও ফল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ