Bartaman Logo
১৫ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দু’টি হামলায় প্রধানমন্ত্রীর দু’রকম প্রতিক্রিয়া কেন?

সংখ্যাগুরুর ধর্মই যদি অপরাধের গুরুত্ব ও গভীরতা বিচারের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে তাহলে ভারতীয় সংবিধানের আত্মাই খতম হতে বাধ্য। ২০৪৭ সালে ‘সবকা সাথ’ শুধু কথার কথা হয়েই থেকে যাবে। কারণ জুতোটা প্রধান বিচারপতির কুর্সি পর্যন্ত না পৌঁছলেও আমাদের ১৪০ কোটি ভারতবাসীর মুখের উপরে সজোরে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবেই চিহ্নিত হবে।

দু’টি হামলায় প্রধানমন্ত্রীর দু’রকম প্রতিক্রিয়া কেন?
  • ১২ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: একই দিনের ঘটনা। একটি ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহযোদ্ধারা বিবৃতির বন্যা বইয়ে দিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে কাঠগড়ায় তুললেন। রাজধর্ম মনে করালেন। আর অন্যটিতে দেশের প্রধান বিচারপতিকে ফোন করেই ছেড়ে দিলেন। তাঁর এলেবেলে প্রতিক্রিয়ায় সেই ঝাঁঝ দেখা গেল না, প্রতিক্রিয়াও কেমন যেন দায়সারা। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র কোনও আগুনে মন্তব্যও চোখে পড়ল না! গেরুয়া শিবিরের কাছে সবিনয় প্রশ্ন, এমন হয় কেন? উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে কিছু ঘটলে কেন্দ্রের শাসক সেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। ওড়িশায় গণধর্ষণের রেকর্ড হয়েছে গত আট মাসে। কই কোনও আন্দোলন নেই তো! ক’টার তদন্ত করেছে এনআইএ, সিবিআই? কিন্তু বাংলায় পান থেকে চুন খসলেই বিজেপি’র মাথায় আগুন চেপে বসে! এভাবে রাজনৈতিক প্রয়োজন বুঝে শাসকের অপরাধকে দেখার, বিচার করার এবং তোপ দাগার ভাষায় তারতম্য হলে বিপন্ন হয় আইনের শাসন! দেশজুড়ে ডামাডোল তৈরি হওয়াই যার নিট ফল।

Advertisement

৬ অক্টোবর। বেলা গড়াতেই দু’টি ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়ে বাংলা থেকে দিল্লি দেশের সর্বত্র। সুপ্রিম কোর্টের ১ নম্বর কক্ষে দিনের প্রথম মামলা শুনছিলেন প্রধান বিচারপতি গাভাই। অতর্কিতেই আদালতের গ্যালারি থেকে প্রবীণ এক আইনজীবী জুতো খুলে বিচারপতির দিকে ছুড়ে দেন। প্রধান বিচারপতি গাভাইয়ের অপরাধ, তিনি খাজুরাহোর 
মন্দিরে বিষ্ণুমূর্তি পুনরায় নির্মাণ ও স্থাপন তথা প্রতিষ্ঠার আবেদন খারিজ করেছিলেন এবং মামলাকারীদের বলেন, ‘যান ভগবানকে গিয়েই জিজ্ঞেস করুন, আপনাদের দেবতাকে নিজের জন্য কিছু করতে বলুন’। এতেই সনাতনীরা ক্ষুব্ধ হন। আদালত কক্ষে তাঁকে লক্ষ্য করে ছোড়া জুতোটি বিচারপতির আসন পর্যন্ত পৌঁছয়নি। নিরাপত্তারক্ষীরা তৎক্ষণাৎ হামলাকারীকে আটকে দেন এবং আদালত কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যান। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ওই ঘটনা আঘাত করে আমাদের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শিকড়ে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এবং যেটুকু জেনেছি ওই ব্যক্তিকে ছাড়া হয়েছে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপে এবং নিশ্চিতভাবে ‘হিন্দুবাদী’ সরকারের বদান্যতায়। কিন্তু এরকম করা যায়? ধর্ম দেখে দেখে বিচার সম্ভব! 
দ্বিতীয় ঘটনাটিও প্রায় একই সময়কার। এ রাজ্যের উত্তরবঙ্গের। বর্ষণ বিধ্বস্ত নাগরাকাটায় দুর্গতদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আক্রান্ত হলেন উত্তর মালদহের এমপি খগেন মুর্মু। আশপাশের জনপ্রতিনিধিরা না গিয়ে উত্তর মালদহের খগেনবাবু গেলেন কেন, তাঁর সঙ্গে লোকলস্কর কম ছিল কেন, সেই প্রশ্নে যাচ্ছি না। যে কোনও আক্রমণ কিংবা দুষ্কৃতী কার্যকলাপই ধিক্কারযোগ্য। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠোরতম শাস্তি প্রাপ্য। এক্ষেত্রে জনরোষের সাফাই আমি অন্তত মানতে রাজি নই। বিশেষ করে আক্রান্ত যদি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হন তাহলে তো কথাই নেই। কোন দল কিংবা রং ওই ঘটনার পিছনে, তা এখনও প্রমাণিত না হলেও পরদিনই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু খগেনবাবুকে দেখতে নার্সিংহোমে ছুটে গিয়েছিলেন। আমরাও তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। ইতিমধ্যেই ওই ঘটনায় গ্রেফতারও হয়েছে। এফআইআরও করা হয়েছে। এরপরও রাজ্য প্রশাসন সব চেপে গিয়েছে, এই কথা আর বলা যায় কি? 
কিন্তু এরই উল্টোপিঠে বিচারের মন্দিরে স্বয়ং দেশের প্রধান বিচারপতিকে লক্ষ্য করে জুতো ছোড়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগটুকু দায়ের করা হয়েছে না হয়নি? যতদূর খবর, প্রধান বিচারপতির নির্দেশেই অভিযুক্ত আইনজীবীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত থাকে শীর্ষ আদালত। দিল্লি পুলিশ আদালত চত্বরে রাকেশ কিশোরকে নাম কা ওয়াস্তে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওইটুকুই। তারপরও ওই আই‌নজীবী যখন প্রকাশ্যে বলেন, ওই ঘটনার জন্য তিনি একচুলও অনুতপ্ত নন তখনই মনে কু ডাকে। তাঁকে ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হল? গণতন্ত্রে সব পথ ও মতের সমান গুরুত্ব। সেই অর্থে সনাতনীদেরও আমি সম্মান করি। কিন্তু সম্মান করেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, সংখ্যাগুরুর ধর্মই যদি অপরাধের গুরুত্ব ও গভীরতা বিচারের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে তাহলে ভারতীয় সংবিধানের আত্মাই খতম হতে বাধ্য। ২০৪৭ সালে ‘সবকা সাথ’ শুধু কথার কথা হয়েই থেকে যাবে। কারণ জুতোটা প্রধান বিচারপতির কুর্সি পর্যন্ত না পৌঁছলেও আমাদের ১৪০ কোটি ভারতবাসীর মুখের উপরে সজোরে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবেই চিহ্নিত হবে। আমরা আহত হয়েছি শুধু নয়, দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ আদালতের ন্যায়ের গরিমাও বিপন্ন হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে ভয় দেখানো এবং বলপূর্বক তাঁকে লাইনে আনার এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের বক্তব্য কোথায়! ব্যবস্থাই বা কী নেওয়া হল? তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পরও কোন স্পর্ধায় অভিযুক্ত আইনজীবী বলেন, তিনি কোনও ভুল করেননি। তাঁর প্রতিবাদে তিনি অবিচল!
এটা ঠিক, চিরদিনই গণতন্ত্র চলে সংখ্যাগরিষ্ঠের কথায়। ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সরকার নির্বাচন করেন দেশের নাগরিকরা। কিন্তু আইন-আদালত তা বলে সংখ্যাধিক্যের নির্দেশে চালিত হলে সংবিধানই বিপন্ন হতে বাধ্য। যেদিন অপরাধীরাই সমাজে সংখ্যাগুরু হয়ে যাবে আদালত চলবে কাদের নির্দেশ? আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে না শান্তিভঙ্গকারীদের ফতোয়ায়। বাংলায় রাজনীতির লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষে খগেন মুর্মুর উপর হামলাকে আদিবাসী সমাজের উপর আক্রমণ বলে বাজার গরম করছেন যাঁরা, তাঁরাই এক দলিত প্রধান বিচারপতিকে জুতো ছোড়ার ঘটনায় আশ্চর্যজনকভাবে উদাসীন। এই এলেবেলে মানসিকতা আখেরে এধরনের ঘটনাকে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়। শাসক শ্রেণি যদি নিজের মতো করে আইনকে চালিত করার নেশায় বুঁদ হয় তাহলে সংবিধানের ভিত্তিই  আলগা হতে বাধ্য। জুডিশিয়ারি জখম হলে এগজিকিউটিভ ও লেজিসলেচারও নিরাপদ থাকতে পারে না।
এসব ছাড়িয়ে আরও এক মোক্ষম প্রশ্ন ইতিমধ্যেই আমাদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে যে-ব্যক্তি জুতো ছুড়েছেন, তাঁর নাম ‘রাকেশ কিশোর’ না হয়ে যদি ‘রহিম খান’ হত, তাহলেও কি কেন্দ্রের শাসক দল এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারত! নাকি এতক্ষণে বিষয়টি একেবারে অন্যদিকে গড়াত? শাস্তি না পেয়ে ছাড়া পেতেন ভদ্রলোক? নাকি, রহিম খানের বিরুদ্ধে ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’, ‘পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট’এর মতো জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করা হত! যদি  কাশ্মীরি মুসলিম হতেন, তাহলে তো তাঁর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য হতে পারত কালা কানুন ‘আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (ইউএপিএ)। পাকিস্তানের চর বলেও নিমেষে দেগে দেওয়া হত বিনা দ্বিধায়। যেমনটি হয়েছে লাদাখের প্রতিবাদী সোনাম ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে। তাঁর স্ত্রী হন্যে হয়ে সুপ্রিম কোর্টের দরজায় কড়া নাড়ছেন। কিন্তু স্বামীকে ছাড়াতে পারছেন না। অথচ মহামান্য প্রধান বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্টের কক্ষে জুতো ছুড়েও আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাকেশ কিশোর। এরপরও বলতে হবে, এদেশে আইন সবার জন্য সমান, ‘অন্ধা’ নয়। কোনও বৈষম্য নেই! সব মত ও ধর্মের সমান অধিকার। বিগত একদশক ধরে ধর্মীয় বিভাজন ও মেরুকরণের জোড়া ধাক্কায় আমাদের এই সামাজিক পরিমণ্ডলটা ঘৃণায় এমনই ভরে গিয়েছে যে, তা এখন একটি ফৌজদারি মামলার গতিপ্রকৃতিকে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে অনায়াসে। সেই স্পর্ধা থেকেই তিনি জুতো ছোড়ার সময়ও সর্বোচ্চ আদালতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে পারেন, সনাতনীদের অপমান বরদাস্ত করব না। 
ধর্ম, সম্প্রদায়, জাতপাত দেখে যদি অপরাধের গুরুত্ব এবং বিচারের ব্লুপ্রিন্ট চূড়ান্ত হয় তাহলে বলতেই হবে, মোদিজি কত উন্নয়ন করতে পারবেন জানি না, কিন্তু আগামী দু’দশক পর স্বাধীনতার শতবর্ষের মাহেন্দ্রক্ষণে ধ্বংসের মুখে পড়বে দলিত পুত্র বি আর আম্বেদকরের সংবিধান ও গণতন্ত্রের উচ্চকিত স্তম্ভগুলি। কেউ বাঁচব না আমরা। তখনও নেহরুকে একইভাবে গাল পেড়ে যদি বিজেপি ও আরএসএস পরিত্রাণ পাওয়ার ফন্দি আঁটে, সেটাই হবে শতাব্দীর সেরা প্রহসন! মনে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষতার মন্ত্রই গত ৭৮ বছরে আমাদের আর পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। তাই আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করুন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ