Bartaman Logo
২৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তৃণমূলের ভাঙন: লাভ কোন দলের?

ভেঙে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। শেষপর্যন্ত কতজন বিধায়ক ও সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকবেন, তা নিয়েই চলছে চর্চা। সংখ্যার বিভ্রান্তি কিছুদিনের মধ্যেই দূর হয়ে যাবে।

তৃণমূলের ভাঙন: লাভ কোন দলের?
  • ১৩ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ভেঙে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। শেষপর্যন্ত কতজন বিধায়ক ও সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকবেন, তা নিয়েই চলছে চর্চা। সংখ্যার বিভ্রান্তি কিছুদিনের মধ্যেই দূর হয়ে যাবে। কিন্তু, গবেষণার বিষয় হল, তৃণমূলের এই ভাঙনের ফায়দা কোন দল তুলবে? বিজেপি, কংগ্রেস নাকি ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা সিপিএম! এর মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসে যেতে পারেন বলে বাজারে জোর প্রচার। সেটা শুনেই প্রদেশ কংগ্রেসের কেউ কেউ তীব্র বিরোধিতা করেছেন। মমতা কংগ্রেসে ফিরবেন কি না, সেটা তিনিই জানেন। তবে, তিনি ফিরতে চাইলে প্রদেশ নেতৃত্বের আপত্তিকে হাইকমান্ড পাত্তা দেবে না। কারণ বাংলায় কংগ্রেসের মুরোদ কী, সেটা হাইকমান্ড খুব ভালোই জানে। 

Advertisement

বিজ্ঞান শিখিয়েছে, কোনো স্থানই শূন্য থাকতে পারে না। রাজনীতিতেও এই কথাটা খাটে। ছাব্বিশের নির্বাচনে তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসন পেলেও ভোট পেয়েছে প্রায় সওয়া দু’কোটি। এই বিপুল জনসমর্থন সত্ত্বেও ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই ছন্নছাড়া তৃণমূল। নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় তৃণমূলের নেতা, কর্মীরা মার খাচ্ছেন। এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। বিষয়টি পরিকল্পিত নাকি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, তা বলা কঠিন। তবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অশান্তি বন্ধ করতে রাস্তায় নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও আইন হাতে তুলে না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারপরেও মারধর, ভাঙচুর চলেছে। গলায় একটা গেরুয়া কাপড় আর কপালে টিপ থাকলেই মিলছে মারধর ও হুজ্জুতি করার লাইসেন্স। একটা নতুন সরকারের জন্য এটা মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন নয়। উন্নয়নের প্রাথমিক শর্তই হল শান্তি প্রতিষ্ঠা।
রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কর্মীদের উপর হামলা হচ্ছে। কিন্তু আক্রান্তরা দলের বিধায়ক বা সাংসদদের পাশে পাচ্ছেন না। অথচ অধিকাংশ বিধায়ক নিজেদের ‘আসল তৃণমূলী’ এবং বিরোধী দল বলে দাবি করছেন। কিন্তু, বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছেন না। কারণ তাঁরা বিজেপিকে চটাতে চান না। আসলে তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়ক এবং সাংসদ ‘ডুড’ ও তামাক দুই-ই খেতে চাইছেন।
এখন প্রশ্ন হল, তৃণমূলকে যে সওয়া দু’কোটি ভোটার ভোট দিয়েছেন তাঁরা কোন দিকে যাবেন? এঁরা কি ‘ভালো তৃণমূল’ এবং ‘মমতা তৃণমূলে’ বিভক্ত হয়ে যাবেন, নাকি অন্য কোনো দলের দিকে পা বাড়াবেন?
৪ মে’র পর থেকে এখনও পর্যন্ত বাংলায় যে ‘খেলা’ হয়েছে, তাতে বিজেপি অনেকটাই এগিয়ে। একদিকে বিপুল জনাদেশ। তার উপর তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়ক বিজেপির অঙ্গুলি হেলনে চলছেন। সাংসদরা আরও এগিয়ে রয়েছেন। ২০ জন সাংসদ নাকি লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এনডিএকে তাঁরা সমর্থন করবেন। একে ‘আত্মসমর্পণ’ করা ছাড়া আর কী বলা চলে? 
তবে, বিধায়ক, সাংসদরা ডিগবাজি খেলেও ভোটাররা সাধারণত খুব দ্রুত অবস্থান বদলান না। বরং ইতিহাস বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে উলটোটা ঘটে। বিধায়ক বা সাংসদ দল পালটালে ভোটাররা তাঁদের উপর রুষ্ট হন। ভোটাররা মনে করেন, যাঁকে তাঁরা ভোট দিয়ে জিতিয়েছেন তিনি ব্যক্তি স্বার্থে তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাই অনেকে বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলবিরোধী আইনের সংশোধনী আবশ্যক হয়ে পড়েছে। কোনো বিধায়ক বা সাংসদ দল বদল করতে চাইলে করুন। কিন্তু, তার আগে তাঁদের বিধায়ক ও সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা বাধ্যতামূলক করা হোক। এই সংশোধনী আনলেই বন্ধ হয়ে যাবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ‘ঘোড়া’ কেনাবেচা। তা না হলে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘোড়া কেনা দিল্লির শাসক দলের কাছে জলভাত। 
বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা এনডিএকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এক দেশ এক ভোট, মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করানোয় বাধা রইল না। তা বলে তৃণমূলের সাংসদকে যাঁরা জিতিয়েছেন তাঁরা ২০২৯ সালে বিজেপিকে ভোট দেবেন, এমন ভাবাটা বোধহয় বোকামিই হবে। 
সরকার যত ভালো কাজই করুক না কেন, কিছু মানুষ তার বিরোধিতা করবেই। এটাই গণতন্ত্র। মানুষের চাওয়া-পাওয়া ও আদর্শ ভিন্ন ভিন্ন। তাই সরকার-বিরোধী মানুষের সংখ্যাই বেশি। ফলে বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার যত উন্নয়নই করুক, বিজেপিকে সবাই সমর্থন করবে না। বিরোধিতা থাকবেই।
এই মুহূর্তে হকার উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। বিহারের মতো এরাজ্যেও বুলডোজারের দাপট বাড়ছে। বিভিন্ন স্টেশন চত্বরে রেলের জায়গায় গজিয়ে ওঠা দোকান ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে। ৪০/৫০ বছরের দোকান বুলডোজার নামিয়ে সাফ করে দিচ্ছে। শুধু স্টেশন চত্বর নয়, হাসপাতাল এলাকাতেও চলছে উচ্ছেদ অভিযান। পুনর্বাসন বা আয়ের বিকল্প ব্যবস্থা না করেই গরিব হকারদের উচ্ছেদের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছে সিপিএম। মিছিল, মিটিংয়ে লোকজনও হচ্ছে। হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদ করছে কংগ্রেসও। তবে, উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে সিপিএম। কেবল মাঠে নেই প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল। যাঁরা ‘প্রকৃত তৃণমূল’ বলে দাবি করছেন তাঁরা আসলে ‘ভালো তৃণমূল’ হয়ে গিয়েছেন। সরকারের সব কাজই তাঁদের ভালো লাগছে। 
যাঁরা সিপিএমের মিছিলে হাঁটেন তাঁরা কি নির্বাচনে বামেদের ভোট দেন? এই প্রশ্নটা আগেও উঠেছে। এখনও উঠছে। ওঠার কারণ আছে। ছাব্বিশের নির্বাচনে সিপিএম বেশ কিছু হাতে গরম ইস্যু পেয়েছিল। ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল, আর জি কর প্রভৃতি ইস্যু তাদেরই তৈরি করা। তাই নির্বাচনে ফায়দা তোলার আশায় এবার বেশ কিছু লড়াকু ও ঝকঝকে মুখকে প্রার্থী করেছিল সিপিএম। তা সত্ত্বেও দাগ কাটতে পারেনি। একমাত্র ত্রিমুখী লড়াইয়ের সৌজন্যে জিতেছে ডোমকল। কিন্তু, একুশের চেয়ে বামেদের প্রাপ্ত ভোটের হার কমেছে। অনেকে বলছেন, এরজন্য দায়ী সিপিএমের ‘উনিশে রাম একুশে বাম’ থিওরি।
২০১৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও তৃণমূলকে হারাতে পারেনি সিপিএম। তাই তৃণমূলকে হটাতে বিজেপির উপর ভরসা করেছিল। চালানো হয়েছিল ‘উনিশে রাম একুশে বাম’ হুইস্পারিং ক্যাম্পেন। উনিশের ভোটে বিপুল সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি। তারপর নির্বাচনের মুখে বহু বিজেপি সমর্থককে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘আমি সিপিএম। কিন্তু, মমতাকে হারাতে ভোট দেব বিজেপিকে। আগে তৃণমূলকে হটাব। তারপর আমরা ক্ষমতায় আসব।’ তাদের প্রথম লক্ষ্যপূরণ হয়েছে। 
এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় লক্ষ্যপূরণের স্বপ্ন দেখছে সিপিএম। শুরু করেছে হকার উচ্ছেদ বিরোধী মিটিং, মিছিল। কিন্তু, এসব করে খুব একটা লাভ হবে না। সিপিএম তখনই শক্তিশালী হবে যখন তারা রামে যাওয়া ভোট বামে ফেরাতে পারবে। বিজেপিকে ভাঙতে না পারলে বাংলায় সিপিএমও  এসইউসির মতো মাঠে থাকবে, লড়াই করবে। কিন্তু পার্টির বংশবিস্তার হবে না। কারণ যাঁরা ডানপন্থী রাজনীতি করেন তাঁরা বামেদের ভোট দেন না। সেই জন্যই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে সিপিএমের কোনো লাভ হয়নি। কংগ্রেস সমর্থকরা সিপিএমকে ভোট দেয়নি। সেই একই অঙ্কে তৃণমূলের ভাঙনের লাভ সিপিএম ঘরে তুলতে পারবে না।
কংগ্রেস থেকেই তৃণমূলের জন্ম। যে উদ্দেশ্য নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়েছিলেন তা সফল হয়েছে। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান তিনি ঘটিয়েছিলেন। পরিস্থিতি পালটে গিয়েছে। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি। সেই লক্ষ্যপূরণের জন্য দু’টি দল এক হলে বা জোট করলে উভয়েরই লাভ। 
দলের ছন্নছাড়া দশা দেখে তৃণমূলের কেউ রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন, কেউ রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন। ইতিমধ্যেই মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর-২ ব্লকের তালিবপুর পঞ্চায়েতের ১১জন, সালার পঞ্চায়েতের আটজন, লালগোলা ব্লকের ময়া পঞ্চায়েতের সাতজন তৃণমূল সদস্য কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। তৃণমূলে ডামাডোল চলতে থাকলে এই তালিকা আরও লম্বা হবে। 
প্রায় ৫০ বছর পশ্চিমবঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে কংগ্রেস। গুরুত্ব ফিরে পেতে সিপিএমের মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে জোট করতেও পিছপা হয়নি। লাভ হয়নি দেখে নিয়েছিল ‘একলা চলো’ নীতি। তাতে শূন্য থেকে দুই হয়েছে। কিন্তু, নবান্ন অনেক দূর। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাশে পেলে কংগ্রেসের লাভ ষোলোআনার জায়গায় আঠারোআনা। এরাজ্যে কংগ্রেসের মরা গাঙে জোয়ার না এলেও স্রোত বইতে শুরু করবে। একইসঙ্গে লাভ হবে মমতারও। তাই উভয়ের লক্ষ্য ‘মিশন-২০২৯’ হলে এই সত্যিটা দু’পক্ষকেই মানতে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ