৪ মে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত, তিন দশকের বেশিরভাগ সময়টা এরাজ্য ছিল কংগ্রেসের শাসনে। ১৯৭৭-২০১১ রাইটার্স বিল্ডিংস দখলে রেখেছিল বামফ্রন্ট। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব টানা ৩৪ বছরের সিপিএম-শাহির পতন
নিশ্চিত করে। এবার ৪ মে বাংলার মানুষ সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে বিরোধী বেঞ্চে বসার নিদান দিয়েছে।
মানুষের ভোটে ক্ষমতাসীন হয়েছে বিজেপি। অর্থাৎ বাংলা অবশেষে গেরুয়া শাসন আহ্বান করল এবং প্রায় পাঁচ দশক বাদে রাজ্যে গদিয়ান হল ডবল ইঞ্জিন সরকার।
৯ মে ব্রিগেডে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী পদে বৃত হন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সঙ্গে শপথ নেন আরো পাঁচ মন্ত্রী—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডু। তাঁদের দপ্তরগুলি আগেই বণ্টন করা হয়েছিল এবং তাঁরা কাজও শুরু করেছেন তেড়েফুঁড়ে। কিন্তু পূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে গড়িমসি চলছিল। জোর জল্পনা ছিল কারা মন্ত্রিত্ব পাবেন তা নিয়ে। এই জল্পনার অবসান হয় ১ জুন। সেদিন আরো ৩৫ জন মন্ত্রী পদে শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন পূর্ণমন্ত্রী, তিনজন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী। কিছুটা বিলম্বে মন্ত্রিসভা সংখ্যার পূর্ণতা পেলেও দপ্তর বা দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে তৈরি হয় নতুন জল্পনা। অবশেষে সেই জল্পনারও অবসান হল নয় দিন পর, বুধবার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজের হাতে রেখেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর—স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক, ভূমি ও ভূমি সংস্কার, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, বিদ্যুৎ, তথ্য ও সংস্কৃতি, কর্মিবর্গ প্রভৃতি। অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে স্বপন দাশগুপ্তকে। শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হলেন তাপস রায়। তথ্য-প্রযুক্তিসহ শিল্প বিষয়ক একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী করা হয়েছে কল্যাণ চক্রবর্তীকে। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন দিলীপ ঘোষ। পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী করা হয়েছে অগ্নিমিত্রা পালকে। উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের মন্ত্রী হলেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। স্কুলশিক্ষার দায়িত্বে আনা হয়েছে দীপক বর্মনকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হলেন শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। পূর্ত এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি (পিএইচই) বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অজয় পোদ্দারকে। কৃষিমন্ত্রী হলেন দুধকুমার মণ্ডল। পরিবহণ ও শ্রম দপ্তরের দায়িত্বে এলেন অর্জুন সিং। খাদ্যমন্ত্রী করা হয়েছে অশোক কীর্তনিয়াকে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের দায়িত্ব পেয়েছেন নিশীথ অধিকারী। ক্রীড়া ও যুবকল্যাণের দায়িত্ব পেয়েছেন ইন্দ্রনীল খাঁ। নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণে আনা হয়েছে মালতী রাভা রায়কে। আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু উন্নয়নের মন্ত্রী হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু। অন্য দপ্তরগুলিও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রয়োজন মতো সাজিয়ে নিয়েছেন।
দপ্তর বণ্টন ঝুলে থাকায়, বস্তুত মাসাধিককাল রাজ্যের প্রায় পুরো দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল মুখ্যমন্ত্রীর একার কাঁধে। এবার বিভাগীয় মন্ত্রীরা নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে পাওয়ায় তাঁর সেই ভার লাঘব হয়েছে। দপ্তরগুলিতেও কাজের সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই ধরে নিতে হবে। এবার আর কালবিলম্ব না করে গোটা রাজ্য সরকারকেই সুসমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজে নেমে পড়তে হবে। অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের পাশাপাশি কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ও দেখতে চায় রাজ্যবাসী। গত পাঁচ দশকে বাংলা যে নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে গিয়েছে তার বড়ো কারণ কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের অভাব। ‘রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনা’ আর ‘কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণ’—এসব জনপ্রিয় অভিযোগের উদ্গাতা সিপিএম নেতা জ্যোতি বসু। তাঁর দলীয় সতীর্থ ও উত্তরসূরি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও ওই শিবের গীত ছাড়তে পারেননি। অভিযোগটিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যবাসী এবার এই নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির অবসান কামনা করে। বাংলা যাতে ভারতসভায় শ্রেষ্ঠ আসনটি ফিরে পেতে পারে রাজ্যবাসী তার আন্তরিক প্রয়াস দেখতে চায় শুধু। কেননা, গত অর্ধ শতকের ভ্রান্ত রাজনীতি বাংলার গরিমাকে শুধু ধুলোয় মিশিয়ে দেয়নি, ওই সঙ্গে ‘উপহার’ দিয়েছে রাজনীতির সীমাহীন দুর্বৃত্তায়ন, অর্থায়ন। রাজ্যের নয়া কান্ডারি কি রাহুমুক্তি ঘটাতে পারবেন? বিষয়টিকে তিনি যেন চ্যালেঞ্জ হিসাবেই গ্রহণ করেন গোড়া থেকে—এই আকাঙ্ক্ষা আমাদের সকলের।