Bartaman Logo
১২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নীরব দর্শক শুধু ভোটার ও কর্মীরা

ভোটার ও কর্মীরা এখন নীরব দর্শক। তৃণমূলের বিদ্রোহের কারণ ও রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা। বিস্তারিত পড়ুন।

নীরব দর্শক শুধু ভোটার ও কর্মীরা
  • ১২ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: তোলপাড় হয়ে গেল এসআইআর নিয়ে। ভোটাররা বুঝতে পারল যে, ভোটার হওয়া কতটা মূল্যবান। কোটি কোটি মানুষ ফর্ম পূরণ করেছে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম আছে কি না, যদি একই ঠিকানায় নাম না থাকে তাহলে কী হবে, যদি পরিবারের সকলের নাম পাওয়া না যায়, তাহলে কী হবে— এসব নিয়ে চরম উদ্বেগে কাটিয়েছে বঙ্গবাসী। কেউ স্বস্তি পেয়েছে, যখন চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম স্থান পেয়েছে। যেন এক বিজয়ীর সন্তোষ। আর যাদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রইল না, তাদের মধ্যে নেমে এল গভীর হতাশা। চরম আশঙ্কা। বেনাগরিক হওয়ার আতঙ্ক। তারপর ভোট হল। ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছিল। ২৭ লক্ষ ভোট দিতে পারেনি বিচারাধীন অবস্থায় থেকে যাওয়ার কারণে। বাংলায় মোট ভোটার কতজন? ৬ কোটি ৮২ লক্ষ ৫১ হাজার। দুই দফার ভোটে কতজন ভোট দিয়েছে? ৬ কোটি ৩২ লক্ষ ৫৮ হাজার। 

Advertisement

যতদিন ভোট আসেনি, ততদিন পর্যন্ত প্রতিটি ভোটার ভেবেছে তাদের গুরুত্ব একটি গণতন্ত্রে কতটা তৎপর্যপূর্ণ। প্রবাস থেকে মানুষ এসে ভোট দিয়েছে। অসুস্থ মানুষ ভোট দিয়েছে। প্রাচীন ভোটার ভোট দিয়েছে। নবীন ভোটার ভোট দিয়েছে। 
হঠাৎ দেখা যাচ্ছে, সেইসব ভোটারের হাতে ছিল একটিই মাত্র দিন। ভোট দেওয়ার। তারপর থেকে 
তারা নিছক এবং নীরব দর্শকের ভূমিকায়। একই অবস্থা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নীচুতলার কর্মী নেতাদেরও। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে যে প্রচার করেছিল, হঠাৎ দেখতে পাচ্ছে সেই কারণটাই সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটছে। আর যা ঘটছে, তার কোনোটাই আর তাদের হাতে নেই। যা ঘটছে উপরতলায় ঘটছে। যার নিয়ন্ত্রণ আর ভোটার বা কর্মীদের হাতে নেই। তাদের কাজটা ছিল শুধু ভোট দেওয়া। এবার আর তাদের মতামতেরও মূল্য নেই। 
যে প্রার্থীকে যে প্রতীক ও মতাদর্শে সাধারণ ভোটার ভোট দিয়েছিল, জয়ের পরই সেই প্রার্থী হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা বিদ্রোহ করবেন। ভোটার ও নেতাকর্মীদের দেড় মাসের পরিশ্রম, ঘাম, আঘাত, প্রচার, সব ভুলে গিয়ে অন্য পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাঁদের জয়ের পিছনে কারিগর সমষ্টি। কিন্তু  সম্পূর্ণ বিপরীত পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একক। 
তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি, কাটমানি কালচার, সিন্ডিকেট, দাদাগিরি, স্বজনপোষণ ২০২৬ সালের 
৫ মে প্রকাশিত হয়েছে এমন নয়। এই অভিযোগে বিরোধীপক্ষ বিজেপি অথবা সিপিএম লাগাতার 
প্রচার করে গিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল দুর্নীতির পাঁকে। বহু তৃণমূল 
নেতাকর্মী নিজেরাই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। বিরক্ত হয়েছেন। বিদ্রোহও করেছেন। 
কিন্তু এতদিন পর এই কারণগুলিকেই বিদ্রোহের কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া বিদ্রোহী বিধায়ক ও এমপিরা। বিদ্রোহ ও দলত্যাগ তাঁরা করতেই পারেন। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের যতই মিডিয়ার সাক্ষাৎকারে বোঝানোর চেষ্টা হোক না কেন, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনও পর্যন্ত কেন একটি বড়ো অংশের মানুষই প্রশ্ন তুলছে? কারণ, এই সিদ্ধান্ত হতচকিত করে দিয়েছে তাদের। 
বিদ্রোহের অধিকার এমপি এবং বিধায়কদের অবশ্যই আছে। কিন্তু লক্ষ্য করলে  দেখা যাচ্ছে, হাজারো মিডিয়া প্রশ্ন করছে যে, ভোটের ফল প্রকাশের পর যখন দল পরাজিত হল, ঠিক তখনই কেন আপনাদের এই সিদ্ধান্ত? এত বছর ধরে যখন দল সাফল্য ও ক্ষমতার শিখরে ছিল, তখন কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি? যারা ভোটার ও কর্মী তাদেরও কিন্তু কমবেশি এই একই প্রশ্ন। অথচ এই দুটি প্রশ্নের সরাসরি, স্পষ্ট, প্রত্যক্ষ উত্তর কোনো বিদ্রোহী দিচ্ছেন না। অন্য যুক্তিতর্কের দিকে চলে যাচ্ছেন তাঁরা। আর তার ফলে, এই দুই প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যাচ্ছে। তাই অন্য একটি প্রশ্ন উঠে আসছে। এই যে নীতি, মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জেনেও কেন বিদ্রোহীরা অটল তাঁদের সিদ্ধান্তে? মূল কারণ কী? এই প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তর নেই মানে কিন্তু প্রশ্নগুলি অন্তর্হিত হয়ে যায় না। তাঁদের রাজনৈতিক জীবনজুড়ে এই প্রশ্নগুলি তাড়া করে বেড়াবে। 
শুভেন্দু অধিকারী দলবদল করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে তিনি তৃণমূলের ক্ষমতায় থাকার শীর্ষ সময়ে দলবদল করেছেন। সুতরাং এমনও হতে পারত যে, বিজেপি হয়তো কোনোদিন ক্ষমতায় এলই না। কিন্তু সেই ঝুঁকি শুভেন্দুবাবু নিয়েছেন। সেই সাহস দেখিয়েছেন। আর সাফল্য পেয়েছেন। শুভেন্দুবাবুর মতো সাংগঠনিক যোগ্যতা ও সাহস কোনোটাই যে বিদ্রোহীদের ঩নেই সেটা প্রমাণিত। আর এটা সবথেকে বেশি জানেন শুভেন্দুবাবুই। 
কিন্তু আজ বিদ্রোহীরা যে কারণগুলি দেখাচ্ছেন বিদ্রোহের যুক্তি হিসেবে, সেই কারণগুলি প্রত্যেক বঙ্গবাসী অবশ্যই মেনে নিচ্ছে। তবে তার সঙ্গেই একটাই প্রশ্ন বারংবার উড়ে আসছে রাজনৈতিক বাতাসে যে, এখন কেন? আগে কেন নয়? 
এটা নিছক তৃণমূলের সমস্যা ভেবে বিজেপি ভোটার এবং কর্মী সমর্থকরা যদি নির্মল আনন্দ ও উল্লাস অনুভব করে যে, তৃণমূল তো ভেঙে ছত্রখান, তাহলে সেটি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে অন্যায় হবে না। কিন্তু বিপদ তাদেরও। তাদের সমস্যাও যে থাকছে না, তেমন নয়। কারণ, এই বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক ও এমপিদের বিরুদ্ধেই বিজেপি নেতাকর্মী, সমর্থকরা ভোটের আগে ও ভোটপর্বে চরম বিরুদ্ধাচারণ করেছে। প্রচার করেছে। আজ তারা দেখছে সেইসব তৃণমূল বিধায়ক, এমপিরা হঠাৎ বিজেপির নতুন সরকার সম্পর্কে নরম। আর বিজেপি সর্বোচ্চ নেতৃত্বও এদের সঙ্গে বৈঠক করছে। অর্থাৎ এই বিদ্রোহী তৃণমূল জনপ্রতিনিধিরা কিন্তু বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আর ব্রাত্য নন। তাঁদের সমর্থন নিতে প্রস্তুত বিজেপি। যদিও তাঁদের সরাসরি বিজেপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। 
এর ফলে বিজেপি ভোটার, নেতা, কর্মীরা এক মহা বিপদে পড়েছে। তারা ভরসা করে আর কোনো তৃণমূল নেতা অথবা এমপি, বিধায়কের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কথা বলতে পারবে না। কারণ আজ একজন ভোটার অথবা সমর্থক হয়তো তৃণমূলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে কিছু বলল, আগামী কাল সে দেখবে ওই নেতা বিজেপির ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছেন। সুতরাং বিজেপি ভোটার ও সমর্থকদেরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। যাকে তাকে আর ডিম ছোড়াও বিপজ্জনক। কারণ, কে বলতে পারে, আজ যাকে ডিম ছোড়া হচ্ছে, আগামী বছর সে এই এলাকারই বিজেপি নেতা হয়ে যাবে না! 
তৃণমূলের সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া, দলের অস্তিত্ব সংকট। দল সম্পর্কে বহু পুরানো কর্মী সমর্থক ভোটারের মোহভঙ্গ ইত্যাদি কারণে সবথেকে বড়ো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে তৃণমূলের ভোটাররা। ৪১ শতাংশ ভোটার যারা দেড় মাস আগেই প্রিয় দলকে ভোট দিয়েছে, তারা জানেই না যে, আগামী দিনে তারা কী করবে? তাদের দল থাকবে? যদি থাকে কাদের হাতে থাকবে? দল কি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাবে? এসব সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। যারা কিছুদিন আগেই ভোট দিয়েছে, তারা রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুই জানে না। তৃণমূল অথবা বিজেপি, দল কোনদিকে যাবে, কে কোথায় যোগ দেবে, কাকে কোন দল নেবে বা নেবে না এসব নিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ভোটার ও সাধারণ কর্মী সমর্থক। 
ভোটাররা সারাদিন টিভি, মোবাইলের সামনে বসে থাকে। আর দেখে কলকাতা অথবা দিল্লিতে কী হচ্ছে। নিউজ দেখে, সাক্ষাৎকার দেখে, আলোচনা দেখে তারা একে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করে। যে নেতারা পাড়ায় এসেছিলেন ভোট চাইতে, তাঁরা আর কেউ পাড়ায় এসে বলেন না যে,আমি এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, আপনাদের মতামত চাইতে এসেছি। দলের নীচুতলার নেতাকর্মীদের কোনো দলই প্রশ্ন করে না যে, তোমাদের কী মত? আমাদের কী করা উচিত? ভোটাররা ভোট দেওয়ার  পর নিছক দর্শক। নীরব দর্শক! 
বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, সেটি রাজনীতির পরিসরের একটি স্থায়ী ক্ষতি করে দিচ্ছে। সেটি হল, আগামী দিনে কোনো দলে রাজনীতিকরা একে অন্যকে আর বিশ্বাস করবে না। মন খুলে মনের কথা আর বলা বিপজ্জনক। কারণ কে যে কখন কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে সেটা বোঝা যাবে না। নেতা তাঁর দলের কাউকে আর বিশ্বস্ত মনে করবেন না। কর্মীরা নেতাকে আর বিশ্বস্ত মনে করবে না। সবথেকে ক্ষতি ভোটারদের। তাদের বিশ্বাসের ভিত নড়ে যাবে। আজ যে দলকে, যে প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছি মতাদর্শ ও নীতির ভিত্তিতে, সেই দল অথবা নেতা আগামী কাল যে বিপরীত ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না কে বলতে পারে!
নতুন সরকার ও তাদের চালিকাশক্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের কাছে অনেকেই নানারকম দাবি, প্রত্যাশা, আবেদন করছে। স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, দুর্নীতিহীন প্রশাসন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতি ইত্যাদি। কিন্তু একইসঙ্গে বঙ্গবাসীর নিবেদন,  আগামী দিনে একটি বিশ্বাসযোগ্য, নীতি ও মূল্যবোধের রাজনীতি কি ফেরানো সম্ভব? যাতে রাজনীতিকে বিশ্বাস করা যায়!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ