Bartaman Logo
১৪ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এখনও মুখে কুলুপ!

ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু ইরান-আমেরিকার সংঘাতের ফল। প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। বিস্তারিত পড়ুন।

এখনও মুখে কুলুপ!
  • ১৪ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

যুদ্ধ চলেছে আমেরিকা-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের। তার বলি হচ্ছেন ভারতীয় নাবিকরা! এ যেন রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়-এর মতো ঘটনা। চার মাস আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম এশিয়ায় এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তার জেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে গোটা বিশ্ব। এই সংঘর্ষের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি হল, দুই মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের হস্তক্ষেপে চোরাগোপ্তা হামলা চললেও অন্তত কাগজে-কলমে দু’পক্ষের মধ্যে এখন নাকি যুদ্ধ বিরতি চলছে। কিন্তু এই ‘যুদ্ধবিরতির’ তেমন কোনো প্রভাব নেই হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশের সমুদ্র অঞ্চলে! যুদ্ধের শুরুতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ইরান। কারণ, এই প্রণালী তাদের সম্পত্তি। শুরুতে কোনো দেশের পণ্যবাহী জাহাজ সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তাকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়া হয়েছে। এখন কার্যত আমেরিকার ‘অবরোধ’ শুরু হয়েছে গোটা উপকূলবর্তী এলাকায়। শাস্তির বিধান সেই একই। অবরোধ উপেক্ষা করলে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে পণ্যবাহী জাহাজ। এই ‘দাদাগিরি’র নিট ফল হল, ৮ থেকে ১১ জুন— এই চারদিনে অবরোধ উপেক্ষা করার অভিযোগে তিনটি ভারতীয় জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই হামলায় তিনজন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁদের যুদ্ধের সঙ্গে কোনোই সম্পর্ক নেই। হরমুজের পাশে ওমান উপকূলের এই হামলার ঘটনায় একাধিক নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। এই নিয়ে গত চারমাসে মোট সাতজন নাবিকের মৃত্যু হল, যা সর্বাধিক। হরমুজ প্রণালী, ওমান উপসাগর ও তার আশপাশের সমুদ্র অঞ্চলে অসংখ্য জাহাজে অন্তত ১৮ হাজার ভারতীয় নাবিক কর্মরত রয়েছেন। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে গত কয়েকমাস ধরে জাহাজ আটকে থাকায় এই হাজার হাজার নাবিকের জীবন প্রাণান্তকর হয়ে উঠেছে। এমনকি যুদ্ধের বলি হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কায় তাঁদের দিনের পর দিন কাটানোর কথাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। 

Advertisement

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভারতীয় নাবিকদের হত্যাকাণ্ডের দায় ইরানের উপর চাপিয়েছেন। শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ভারতীয় জাহাজে আমেরিকা হামলা করেনি, করেছে ইরান। এই কাজ সমর্থনযোগ্য নয়। অথচ তাঁর নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড চারদিনে তিনটি ভারতীয় জাহাজে হামলা চালানোর কথা গর্বের সঙ্গে জানিয়েছেন! তাদের সাফ কথা, সমুদ্রপথে যে ‘অবরোধ’ চলছে, তা মানা হয়নি বলেই এই কাজ করা হয়েছে। সতর্ক করা সত্ত্বেও অবরোধ লঙ্ঘনের অপরাধ করেছে ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজগুলি। ইরান থেকে কোনো জাহাজ ঢুকতে বা বেরতে দেবে না বলে আমেরিকা হরমুজ-সহ বিস্তীর্ণ সমুদ্র অঞ্চলে অবরোধ শুরু করেছে। এই অবরোধ চলবে। সামরিক কমান্ডের এই বিবৃতিতে পরিষ্কার, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি সঠিক নয়। তিনি ভারতীয়দের চোখে ‘ভালো’ সাজার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অজস্র প্রশ্ন আছে। যেভাবে গত বুধবার ওমান উপসাগরে এমটি সেত্তেবেলো নামে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে মার্কিন সেনা তাকে জলদস্যুতার নামান্তর বলেও মনে করছেন অনেকে। 
এই ঘটনা নিয়ে অবাক করার মতো বিষয় হল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই নিয়ে মুখ বন্ধ রেখেছেন। যা দেখে বিরোধীরা কটাক্ষ করে বলছে, খুনীদের মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করার মতো সাহস ও শক্তি কি প্রধানমন্ত্রীর নেই! এই জঘন্যতম ঘটনা নিয়েও প্রধানমন্ত্রী আপস করছেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। গোটা ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী চুপ থাকলেও বিদেশমন্ত্রক ভারতে নিযুক্ত আমেরিকার প্রতিনিধিকে দু’বার ডেকে পাঠিয়ে এই হামলার ব্যাখ্যা চেয়েছে। বিদেশমন্ত্রকের জারি করা বিবৃতিতে এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও হামলাকারী হিসাবে আমেরিকার নাম উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চাপে থাকা মোদি সরকার কি ট্রাম্পকে খুশি করতেই এই নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন? অনেকের মতে, জাতীয় স্বার্থেই তিন নাবিকের মৃত্যু নিয়ে আরও কঠোর ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল প্রধানমন্ত্রীর। সেই দৃঢ়তা দেখাতে পারলেন না মোদি। যা ভারতবাসীর কাছে খুবই দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। কারণ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এমন প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা শুধু বিপজ্জনকই নয়, এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মোদি যুগের ১২ বছরের সাফল্য তুলে ধরতে যখন সরকার ব্যস্ত তখন এমন একটি উদ্বেগজনক ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ভারতমাতার সন্তান ওই অসামরিক নাবিকদের রক্ষা করতে পারলেন না মোদি। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর যাতে না ঘটে তার জন্য আপসকামী মানসিকতা দূর করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি উঠেছে। সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে থাকা ভারতীয় নাবিকদের যথাযথ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রশ্নে সরকারি তরফে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ